কিশোরগঞ্জের তাড়াইলে আফ্রিকান জায়ান্ট শামুকের উপদ্রবে অতিষ্ঠ হয়ে পড়েছেন বাসিন্দারা। ঘরের দেয়াল থেকে রান্নাঘর, উঠান থেকে শাকসবজির ক্ষেত, সর্বত্র ছড়িয়ে পড়েছে ছোট-বড় অসংখ্য শামুক। দিনের বেলায় দেয়ালে লেগে থাকা এসব শামুক রাত হলেই ঢুকে পড়ছে ঘরের ভেতর। নষ্ট করছে কৃষকের ফসল, বাড়াচ্ছে জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ। ঝাড়ু দিয়ে সরিয়েও মিলছে না মুক্তি, কীটনাশক প্রয়োগেও কাঙ্ক্ষিত ফল না পাওয়ায় দুশ্চিন্তায় দিন কাটছে স্থানীয়দের।
বুধবার (১৪ অক্টোবর) সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকায় দেখা যায়, বাড়ির দেয়াল, উঠান, গাছের গোড়া ও শাকসবজির বাগানে ছড়িয়ে রয়েছে অসংখ্য শামুক। স্থানীয়দের দাবি, রাতের বেলা দলবেঁধে ঘরে ঢুকে পড়ছে এগুলো। সরিয়ে দেওয়ার কিছুক্ষণ পর আবারও ফিরে আসছে। দেশি শামুকের তুলনায় কয়েক গুণ বড় এসব শামুকের বিস্তার ঠেকাতে হিমশিম খাচ্ছেন বাসিন্দারা।
উল্লেখ্য, আফ্রিকান জায়ান্ট শামুক (বৈজ্ঞানিক নাম: Lissachatina fulica) বিশ্বের অন্যতম ক্ষতিকর ও আক্রমণাত্মক স্থলজ শামুক প্রজাতি। পূর্ব আফ্রিকায় উদ্ভূত এই শামুক বর্তমানে বাংলাদেশসহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চলে ছড়িয়ে পড়েছে। দ্রুত বংশবিস্তার, বিস্তৃত খাদ্যাভ্যাস এবং প্রতিকূল পরিবেশেও টিকে থাকার সক্ষমতার কারণে এটি কৃষি, জীববৈচিত্র্য ও জনস্বাস্থ্যের জন্য উদ্বেগের কারণ হয়ে উঠেছে। এ শামুক বিভিন্ন ধরনের শাকসবজি, ফল, চারা ও অন্যান্য উদ্ভিদের পাতা খেয়ে ফসলের ক্ষতি করতে পারে। পাশাপাশি, কিছু পরজীবীর বাহক হিসেবে এটি মানুষের স্বাস্থ্যের জন্যও ঝুঁকি তৈরি করতে পারে। বিশেষ করে শামুকের সংস্পর্শে আসার পর অপরিষ্কার হাতে খাবার গ্রহণ করলে সংক্রমণের আশঙ্কা থাকে।
স্থানীয় গৃহবধূ আকলিমা বেগম বলেন, ঘরের দেয়াল শামুকে ভরে গেছে। ঝাড়ু দিয়ে সরিয়ে দিলেও আবার চলে আসে। রান্নাঘর ও বিছানার আশপাশেও উঠে যাচ্ছে। বাচ্চারা ভয় পায়, দুর্গন্ধও হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে ঘরে বসবাস করাই কঠিন হয়ে পড়বে।
শামুকের আক্রমণ থেকে রেহাই পাচ্ছে না কৃষকের ফসলও। উপজেলার সদর ইউনিয়নের সাচাইল গ্রামের কৃষক আবদুল হাই বলেন, লাউ, পুঁইশাক ও কচুর লতিসহ বিভিন্ন শাকসবজি খেয়ে নষ্ট করে দিচ্ছে শামুক। রাতে টর্চলাইট নিয়ে ক্ষেতে গেলে চারদিকে শামুক দেখা যায়। এভাবে চলতে থাকলে ফসল রক্ষা করা কঠিন হয়ে পড়বে।
এদিকে শামুকের বিস্তার ঘিরে জনস্বাস্থ্য নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। তাড়াইল উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার পরিকল্পনা কর্মকর্তা ডা. অতীশ দাস রাজিব জানান, কিছু প্রজাতির শামুকের মাধ্যমে বহন করা পরজীবী মানুষের শরীরে প্রবেশ করলে মেনিনজাইটিসসহ গুরুতর রোগের ঝুঁকি তৈরি হতে পারে। এ কারণে শামুক খালি হাতে না ধরা এবং স্পর্শ করার পর সাবান দিয়ে ভালোভাবে হাত ধোয়ার পরামর্শ দেন তিনি।
তাড়াইল উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা বিকাশ রায় বলেন, এটি আফ্রিকান জায়ান্ট শামুক হতে পারে। অতিরিক্ত আর্দ্রতা ও বৃষ্টিপাতের কারণে এদের বংশবিস্তার বেড়ে থাকতে পারে। আতঙ্কিত না হয়ে সতর্কতার সঙ্গে শামুক অপসারণের পরামর্শ দেন তিনি।
তিনি আরও জানান, গ্লাভস ব্যবহার করে শামুক সংগ্রহ করে নিরাপদ উপায়ে অপসারণ করতে হবে। আক্রান্ত এলাকায় কীটনাশক প্রয়োগের আগে কৃষি বিভাগের পরামর্শ নেওয়া জরুরি। শামুক দমনে এমন রাসায়নিক ব্যবহার করা যাবে না, যাতে মাটি, ফসল ও পরিবেশের ক্ষতি হয়।
