বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয় (বাউবি) দেশের দ্বিতীয় বৃহত্তম এবং একমাত্র দূরশিক্ষণভিত্তিক বিশেষায়িত পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়। বাংলাদেশের মতো জনবহুল, ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ ও আর্থসামাজিক বৈষম্যপূর্ণ দেশে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করার লক্ষ্যে প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থার পাশাপাশি একটি বিকল্প, নমনীয় ও প্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষাধারা গড়ে তোলার প্রয়োজনীয়তা থেকেই এ বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। ১৯৯২ সালের ২১ অক্টোবর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সরকারের আমলে এই বিশ্ববিদ্যালয় দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় এক নতুন সম্ভাবনার দ্বার উন্মোচন করে।
সবার জন্য শিক্ষা: প্রতিষ্ঠার মৌলিক দর্শন
বাউবির মূল দর্শন হলো ‘সবার জন্য শিক্ষা’ এবং জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ নিশ্চিত করা। বয়স, পেশা, আর্থসামাজিক অবস্থা ও ভৌগোলিক সীমাবদ্ধতা নির্বিশেষে সবার জন্য মানসম্মত শিক্ষা সহজলভ্য করাই এর প্রধান লক্ষ্য। নমনীয় ও প্রযুক্তিনির্ভর দূরশিক্ষার মাধ্যমে শিক্ষাবঞ্চিত ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর শিক্ষার সুযোগ সম্প্রসারণ, কর্মমুখী জ্ঞান ও দক্ষতা বিকাশ এবং শিক্ষা ও কর্মজীবনের মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করে একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক, দক্ষ ও জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গড়ে তোলাই বাউবির মৌলিক অভীষ্ট।
তিন দশকের অগ্রযাত্রা: একাডেমিক ও প্রাতিষ্ঠানিক সম্প্রসারণ
প্রতিষ্ঠার পর থেকে বাউবি ধারাবাহিকভাবে তার একাডেমিক কার্যক্রম সম্প্রসারণ করেছে। স্কুল অব এডুকেশনের অধীনে বিএড প্রোগ্রাম চালুর মাধ্যমে যার যাত্রা শুরু হয়েছিল, সময়ের পরিক্রমায় তা আজ বহুমাত্রিক একাডেমিক কাঠামোয় বিকশিত হয়েছে। বর্তমানে বিশ্ববিদ্যালয়ে ৭টি স্কুলের অধীনে সাধারণ, উচ্চশিক্ষা ও পেশাভিত্তিক বিভিন্ন কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে। স্কুলগুলো হলো:
- স্কুল অব এডুকেশন
- স্কুল অব সোশ্যাল সায়েন্সেস হিউম্যানিটিজ অ্যান্ড ল্যাঙ্গুয়েজস
- ওপেন স্কুল
- স্কুল অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি
- স্কুল অব বিজনেস
- স্কুল অব অ্যাগ্রিকালচার অ্যান্ড রুরাল ডেভেলপমেন্ট
- স্কুল অব ল
এসএসসি, এইচএসসি, স্নাতক (পাস ও সম্মান), স্নাতকোত্তর, এমফিল, পিএইচডি এবং বিভিন্ন পেশাভিত্তিক ডিপ্লোমা ও সার্টিফিকেট কোর্স মিলিয়ে বর্তমানে ৫৫টি একাডেমিক প্রোগ্রামে দূরশিক্ষণ (ODL) ও ব্লেন্ডেড লার্নিং পদ্ধতিতে তিন লাখেরও বেশি শিক্ষার্থী অধ্যয়ন করছেন।
শুধু একাডেমিক ক্ষেত্রেই নয়, অবকাঠামোগত উন্নয়ন ও প্রশাসনিক বিকেন্দ্রীকরণের ক্ষেত্রেও বাউবি অনন্য অগ্রগতি অর্জন করেছে। গাজীপুরের মূল ক্যাম্পাসের পাশাপাশি সারা দেশে রয়েছে ১২টি আঞ্চলিক কেন্দ্র, ৬৩টি উপ-আঞ্চলিক কেন্দ্র এবং প্রায় দেড় হাজার স্টাডি সেন্টার। এই বিস্তৃত নেটওয়ার্ক প্রত্যন্ত অঞ্চলের শিক্ষার্থীদের কাছে শিক্ষা পৌঁছে দিচ্ছে। এমনকি দক্ষিণ কোরিয়া, ইতালি, সৌদি আরবসহ মধ্যপ্রাচ্যের আরও ৪টি দেশে প্রবাসী বাংলাদেশিদের জন্য শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার মাধ্যমে বাউবির আন্তর্জাতিক পরিসরও সম্প্রসারিত হয়েছে।
কারিগরি ও বৃত্তিমূলক শিক্ষায় নতুন দিগন্ত
বর্তমান বিশ্বে দক্ষ মানবসম্পদ হলো অর্থনৈতিক প্রতিযোগিতার অন্যতম প্রধান নির্ধারক। দ্রুত পরিবর্তনশীল শ্রমবাজার ও চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের প্রভাব মোকাবিলায় তাত্ত্বিক শিক্ষার পাশাপাশি ব্যবহারিক জ্ঞান ও প্রযুক্তিগত দক্ষতা অর্জন অত্যন্ত জরুরি। এই বাস্তবতায় বাউবির একাডেমিক কার্যক্রমে ইনস্টিটিউট অব টেকনিক্যাল অ্যান্ড ভোকেশনাল এডুকেশন অ্যান্ড ট্রেনিং (ITVET) যুক্ত করার উদ্যোগ অত্যন্ত সময়োপযোগী। শিল্পপ্রতিষ্ঠান ও শ্রমবাজারের চাহিদার সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে কারিগরি প্রশিক্ষণের মাধ্যমে শিক্ষার্থীদের আত্মকর্মসংস্থানের সুযোগ সম্প্রসারণই এর মূল উদ্দেশ্য।
কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের মূলধারায় সংযুক্তির উদ্যোগ
শিক্ষার বিভিন্ন ধারার শিক্ষার্থীদের জন্য বাস্তবসম্মত সুযোগ সৃষ্টির লক্ষ্যে বাউবির ‘নিশ-৩’ কর্মসূচির আওতায় কওমি মাদ্রাসার শিক্ষার্থীদের জন্য এসএসসি ও এইচএসসি প্রোগ্রাম চালুর উদ্যোগ বিশেষ তাৎপর্য বহন করে। বিশেষজ্ঞদের সহায়তায় প্রণীত এই কারিকুলামের মাধ্যমে ২০২৭ সালের জানুয়ারি মাসে কার্যক্রম শুরু করা সম্ভব হলে তা শিক্ষার বিভিন্ন ধারার মধ্যে সেতুবন্ধন রচনা করবে।
গবেষণা, উদ্ভাবন ও জ্ঞান সৃজনে অগ্রযাত্রা
শিক্ষাদান ও সনদ প্রদানের পাশাপাশি গবেষণা ও জ্ঞান সৃজন বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্যতম মৌলিক দায়িত্ব। কৃষি, বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিশিক্ষাসংশ্লিষ্ট গবেষণাগার এবং দেশি-বিদেশি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে সহযোগিতামূলক সম্পর্ক বাউবির গবেষণা সক্ষমতা বৃদ্ধি করছে। এছাড়া কেন্দ্রীয় জার্নাল ও সাতটি স্কুলের নিজস্ব জার্নালে ডিজিটাল অবজেক্ট আইডেন্টিফায়ার (DOI) ব্যবহারের ব্যবস্থা গবেষণাপত্র শনাক্তকরণ এবং আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে দৃশ্যমানতা বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে।
ডিজিটাল রূপান্তর ও দক্ষতাভিত্তিক আধুনিক শিক্ষা: সময়ের অনিবার্য দাবি
চতুর্থ শিল্পবিপ্লব ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার যুগে বাউবিকে সমন্বিত ডিজিটাল রূপান্তরের দিকে এগিয়ে যেতে হবে। অনলাইন ভর্তি, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী, ই-অ্যাটেনডেন্স, পরীক্ষা ব্যবস্থাপনা এবং প্রশাসনিক কার্যক্রমকে একটি সমন্বিত ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের আওতায় আনা প্রয়োজন। একই সঙ্গে নারী, প্রতিবন্ধী ও কর্মজীবী শিক্ষার্থীদের বিশেষ গুরুত্ব দিয়ে মাইক্রোক্রেডেনশিয়াল ও স্বল্পমেয়াদি দক্ষতা উন্নয়ন কোর্সের সুযোগ সম্প্রসারণ জরুরি। মুদ্রিত পাঠ্যসামগ্রীর পাশাপাশি মোবাইল অ্যাপ ও ক্লাউডভিত্তিক পোর্টালে শিক্ষাসামগ্রী সহজলভ্য করার মাধ্যমে যেকোনো স্থান থেকে নিরবচ্ছিন্ন শিক্ষা নিশ্চিত করা সম্ভব।
প্রয়োজন দক্ষ ও উপযুক্ত শিক্ষক
দূরশিক্ষণ পদ্ধতিতে সফল মেন্টরিং ও নিয়মিত একাডেমিক সহায়তার জন্য শিক্ষকদের আন্তর্জাতিক মানের অনলাইন পেডাগজি, ডিজিটাল টুলস এবং মূল্যায়ন কৌশলের ওপর নিয়মিত প্রশিক্ষণ দেওয়া প্রয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষকদর মাঝে গবেষণা মনস্কতা তৈরিতে প্রণোদনা বাড়াতে হবে।
গবেষণা ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা বৃদ্ধি
আগামী দিনের চ্যালেঞ্জ মোকাবিলায় দেশি-বিদেশি বিশ্ববিদ্যালয় ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে যৌথ কোর্স, গবেষণা, শিক্ষক প্রশিক্ষণ এবং শিক্ষাসামগ্রী বিনিময়ের সুযোগ সম্প্রসারণ বাউবিকে আরও গতিশীল করবে। এই সহযোগিতা কেবল সমঝোতা স্মারকের মধ্যে সীমাবদ্ধ না রেখে যৌথ প্রকল্প ও পরিমাপযোগ্য একাডেমিক ফলাফলের সঙ্গে যুক্ত করতে হবে।
অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রযুক্তিসমৃদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয়: আগامیর রূপকল্প
বাউবির ৩৪ বছরের অগ্রযাত্রা দেশের শিক্ষাব্যবস্থায় বিকল্প শিক্ষাধarার গুরুত্ব প্রমাণ করেছে। বর্তমানের সামনে বাউবির দ্বিমুখী দায়িত্ব রয়েছে—একদিকে বঞ্চিত জনগোষ্ঠীর কাছে শিক্ষা পৌঁছে দেওয়া, অন্যদিকে আন্তর্জাতিক মানের শিক্ষা ও গবেষণা নিশ্চিত করা। এই লক্ষ্যগুলো অর্জিত হলে বাউবি মানবসম্পদ উন্নয়ন, সামাজিক অন্তর্ভুক্তি এবং জ্ঞানভিত্তিক সমাজ গঠনের অন্যতম চালিকাশক্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হবে। সুদূরপ্রসারী পরিকল্পনা, উদ্ভাবনী নেতৃত্ব ও প্রযুক্তির কার্যকর ব্যবহারের মাধ্যমে বাউবি জীবনব্যাপী শিক্ষার সুযোগ সৃষ্টিতে নতুন দৃষ্টান্ত স্থাপন করবে—এটাই আগামীর প্রত্যাশা।
লেখক: উপাচার্য, বাংলাদেশ উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়
ইমেল: srkhan@bou.ac.bd
