সুন্দরবনে জলদস্যুদের দৌরাত্ম্যে আতঙ্কিত গাবুরার মানুষ
সাতক্ষীরার শ্যামনগর উপজেলার গাবুরা ইউনিয়নে সুন্দরবননির্ভর মানুষের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ বাড়িয়েছে জলদস্যুদের তৎপরতা। সুন্দরবনে মাছ, কাঁকড়া ও মধু আহরণ করতে গিয়ে অপহরণ, নির্যাতন ও মুক্তিপণের শিকার হওয়ার আশঙ্কায় বনে যেতে ভয় পাচ্ছেন অনেক জেলে ও বাওয়ালি। তবে মহাজনের কাছ থেকে দাদন নেওয়া এবং পরিবারের ভরণপোষণের তাগিদে জীবনের ঝুঁকি নিয়েই তাঁদের বনে যেতে হচ্ছে। এ পরিস্থিতিতে জলদস্যু দমন ও বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন স্থানীয় বাসিন্দারা।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) গাবুরা ইউনিয়নের ৯ নম্বর সোরা এলাকার দৃষ্টিনন্দন অঞ্চলে চলমান মেগা প্রকল্পের কাজ ও নির্মাণের গুণগত মান পরিদর্শনে যান সাতক্ষীরার জেলা প্রশাসক কওসার আজিজ। পরিদর্শন শেষে ১৭৩ নম্বর সোরা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কাম সাইক্লোন শেল্টারে আয়োজিত মতবিনিময় সভায় স্থানীয়রা তাঁর কাছে এসব দাবি তুলে ধরেন।
সভায় স্থানীয় বাসিন্দারা বলেন, সুন্দরবনে একাধিক জলদস্যু বাহিনীর তৎপরতা বেড়ে যাওয়ায় গাবুরাসহ উপকূলীয় এলাকার বনজীবীদের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। জলদস্যুদের দাবিকৃত চাঁদা দিতে না পারলে জেলে ও বাওয়ালিদের অপহরণ ও নির্যাতন করা হয় বলে তাঁদের অভিযোগ। পরে অপহৃতদের মুক্তির জন্য পরিবারের কাছে মোটা অঙ্কের টাকা দাবি করা হয়। স্বজনদের ফিরিয়ে আনতে অনেক পরিবারকে ঋণ করতে হয়, ফলে তাঁদের আর্থিক সংকট আরও বাড়ে।

স্থানীয়দের আরও অভিযোগ, অতীতে আত্মসমর্পণ করা কিছু জলদস্যুর পুনরায় অপরাধে জড়িয়ে পড়ার খবরও উদ্বেগের কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাঁরা সুন্দরবনে নিয়মিত অভিযান জোরদার, দস্যুদের আস্তানা চিহ্নিত করা, অপহরণ ও মুক্তিপণ আদায় বন্ধ এবং বনজীবীদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সমন্বিত পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি জানান।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলম বলেন, সুন্দরবনে যেতে এখন মানুষ সাহস পাচ্ছেন না। তাঁর দাবি, বনে বর্তমানে কাজল-মুন্না বাহিনী, জিয়া বাহিনী ও ভাই ভাই সুন্দরবন বাহিনী নামে তিনটি জলদস্যু বাহিনী সক্রিয় রয়েছে। উপকূলের বহু মানুষের জীবিকা সুন্দরবনের ওপর নির্ভরশীল হওয়ায় তাঁরা জেলা প্রশাসকের কাছে নিজেদের নিরাপত্তার বিষয়টি তুলে ধরেছেন।
শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) শামসুজ্জামান কনক বলেন, জেলা প্রশাসককে কাছে পেয়ে গাবুরার মানুষ খোলামেলাভাবে তাঁদের সমস্যার কথা জানিয়েছেন। জেলা প্রশাসক তাঁদের বক্তব্য শুনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাস দিয়েছেন।

জেলা প্রশাসক কওসার আজিজ সুন্দরবনে জলদস্যু দমনে সমন্বিত উদ্যোগ নেওয়ার আশ্বাস দেন। পাশাপাশি গাবুরার সুপেয় পানির সংকট নিরসন, স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়ন এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতি পূরণে প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের মান নিয়েও প্রশ্ন
মতবিনিময় সভায় সুন্দরবনে জলদস্যুদের তৎপরতার পাশাপাশি গাবুরা ইউনিয়নে চলমান মেগা প্রকল্পের কাজের গুণগত মান, সড়কের স্থায়িত্ব ও যোগাযোগব্যবস্থা নিয়েও আলোচনা হয়। স্থানীয়রা প্রকল্পের মূল সড়কের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সংযোগ সড়ক নির্মাণ, প্রকল্পের নকশা ও নকশাসংক্রান্ত তথ্য জনসমক্ষে প্রকাশ এবং নির্মাণকাজের মান নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তাঁদের ভাষ্য, উপকূলীয় এলাকার মানুষের দীর্ঘদিনের দুর্ভোগ কমাতে প্রকল্পটি গুরুত্বপূর্ণ। তাই পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ বাস্তবায়ন, নিয়মিত তদারকি, অসমাপ্ত খাল খননের কাজ সম্পন্ন করা এবং নির্মাণের প্রতিটি ধাপের স্থায়িত্ব ও গুণগত মান যাচাই করা প্রয়োজন।
স্থানীয়রা আরও জানান, গাবুরা ইউনিয়নে সুপেয় পানির সংকট, পর্যাপ্ত চিকিৎসাসুবিধার অভাব, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ঘাটতি, খেলার মাঠ সংরক্ষণ, ভূমিহীনদের বসবাসের ব্যবস্থা এবং দৃষ্টিনন্দন এলাকার উন্নয়ন ও সংরক্ষণসহ নানা সমস্যা রয়েছে। এসব সমস্যা সমাধানে সংশ্লিষ্ট সরকারি দপ্তরগুলোর সমন্বিত উদ্যোগ চান তাঁরা।
গাবুরা ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান মাসুদুল আলমসহ স্থানীয় বক্তারা প্রকল্পের কাজের স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেন। সভায় মাস্টার আবু তালেব সাগর, আমজিয়াদ হোসেন ও ইকবাল হোসেন মন্টুও বক্তব্য দেন। এ সময় শ্যামনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা শামসুজ্জামান কনক, সহকারী কমিশনার (ভূমি) ওমর শরীফ ফাহাদ, স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি, সরকারি কর্মকর্তা ও এলাকার গণ্যমান্য ব্যক্তিরা উপস্থিত ছিলেন।

উল্লেখ্য, ২০২৩ সাল থেকে সুন্দরবন উপকূলীয় গাবুরা ইউনিয়নের প্রায় ২৭ কিলোমিটার বেড়িবাঁধ রক্ষায় ১ হাজার ২০ কোটি ৪১ লাখ টাকার একটি মেগা প্রকল্প বাস্তবায়ন করা হচ্ছে। প্রকল্পের আওতায় বেড়িবাঁধে কংক্রিটের ব্লক ও পাইলিংয়ের কাজ চলছে।
তবে প্রকল্পের অর্থ ব্যয়, নির্মাণকাজের মান এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের ওপর চাপ প্রয়োগ করে অর্থ লুটপাটের অভিযোগও তুলেছেন স্থানীয়রা। তাঁদের অভিযোগ, ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর স্থানীয় এক জনপ্রতিনিধি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানকে জিম্মি করে নগদ অর্থ লুট করেছেন। এ ছাড়া ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কিছু ব্যক্তি ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের কয়েকজন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নিম্নমানের কাজ করে প্রকল্পের অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের বিষয়ে সংশ্লিষ্ট জনপ্রতিনিধি, ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ও পানি উন্নয়ন বোর্ডের বক্তব্য পাওয়া গেলে তা প্রতিবেদনে যুক্ত করা প্রয়োজন।
স্থানীয়দের প্রত্যাশা, জেলা প্রশাসকের দেওয়া আশ্বাস দ্রুত বাস্তবায়িত হবে। বিশেষ করে সুন্দরবনে জলদস্যুদের তৎপরতা বন্ধ করে জেলে ও বাওয়ালিদের নিরাপদে জীবিকা নির্বাহের সুযোগ নিশ্চিত করা হবে। একই সঙ্গে উন্নয়ন প্রকল্পের কাজের মান বজায় রাখা এবং গাবুরার দীর্ঘদিনের নাগরিক সমস্যাগুলোর সমাধানে কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়া হবে।
