Published on
:
3 min read
পুরোদমে শুরু হয়ে গিয়েছে দুর্গা পুজো ২০২৬। আজ ১৭ অক্টোবর শনিবার পালিত হচ্ছে মহাসপ্তমী। এ’দিন নবপত্রিকা স্নান করানোর ভিড় সকাল থেকেই উপচে পড়ছে গঙ্গার ঘাটগুলিতে।
Highlights
১৭ অক্টোবর ২০২৬, শনিবার পালিত হচ্ছে মহাসপ্তমী।
মহাসপ্তমীর সকালে নবপত্রিকা স্নান করানোর মাধ্যমে দুর্গাপুজোর মূল আচার শুরু হয়।
নবপত্রিকা বা কলা বৌ তৈরি হয় কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মান ও ধান—এই ন’টি উদ্ভিদ দিয়ে।
নবপত্রিকার ন’টি উদ্ভিদ দেবী দুর্গার ন’টি বিশেষ রূপের প্রতীক।
প্রচলিত রীতি অনুযায়ী, নবপত্রিকাকে লালপাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে গণেশের পাশে রাখা হয়।
গবেষকদের মতে, নবপত্রিকা পুজোর সঙ্গে প্রাচীন শস্যদেবীর আরাধনার যোগ রয়েছে।
এই নবপত্রিকাই কলা বৌ নামে পুজোর চারদিন গণেশের পাশে অবস্থান করে। এই দিনই দুর্গাপুজোর ঘট স্থাপন করা হয়। কেন নবপত্রিকাকে গণেশের বৌ বলা হয় আর কেন সপ্তমীর সকালে নবপত্রিকাকে স্নান করানো হয়, তা জেনে নিন।
কী এই নবপত্রিকা?
নবপত্রিকা বাংলার দুর্গাপূজার একটি বিশিষ্ট অঙ্গ। নবপত্রিকা শব্দটির আক্ষরিক অর্থ ন’টি গাছের পাতা। তবে বাস্তবে নবপত্রিকা ন’টি পাতা নয়, ন’টি উদ্ভিদ। এগুলি হলো - কদলি বা রম্ভা (কলা), কচু, হরিদ্রা (হলুদ), জয়ন্তী, বিল্ব (বেল), দাড়িম্ব (দাড়িম), অশোক, মান ও ধান। একটি সপত্র কলাগাছের সঙ্গে অপর আটটি সমূল সপত্র উদ্ভিদ একত্র করে একজোড়া বেল-সহ শ্বেত অপরাজিতা লতা দিয়ে বেঁধে লালপাড় সাদা শাড়ি জড়িয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর আকার দেওয়া হয়। তারপর তাতে সিঁদুর দিয়ে সপরিবার প্রতিমার ডান দিকে দাঁড় করিয়ে পুজো করা হয়। প্রচলিত ভাষায় নবপত্রিকার নাম কলাবৌ।
নবপত্রিকায় ৯ দেবী
নবপত্রিকার ন’টি উদ্ভিদ আসলে দুর্গার ন’টি বিশেষ রূপের প্রতীক রূপে কল্পিত হয়। এই ৯ দেবী হলেন রম্ভাধিষ্ঠাত্রী ব্রহ্মাণী, কচ্বাধিষ্ঠাত্রী কালিকা, হরিদ্রাধিষ্ঠাত্রী উমা, জয়ন্ত্যাধিষ্ঠাত্রী কার্তিকী, বিল্বাধিষ্ঠাত্রী শিবা, দাড়িম্বাধিষ্ঠাত্রী রক্তদন্তিকা, অশোকাধিষ্ঠাত্রী শোকরহিতা, মানাধিষ্ঠাত্রী চামুণ্ডা ও ধান্যাধিষ্ঠাত্রী লক্ষ্মী। এই ৯ দেবী একত্রে "নবপত্রিকাবাসিনী নবদুর্গা" নামে নবপত্রিকাবাসিন্যৈ নবদুর্গায়ৈ নমঃ মন্ত্রে পূজিতা হন।
নবপত্রিকার পুজোবিধি
মহাসপ্তমীর দিন সকালে কাছের কোনও নদী বা কোনও জলাশয়ে (নদী বা জলাশয় না থাকলে কোনও মন্দিরে) নিয়ে যাওয়া হয়। পুরোহিত নিজেই কাঁধে করে নবপত্রিকা নিয়ে যান। তাঁর পিছন পিছন ঢাকীরা ঢাক বাজাতে বাজাতে এবং মহিলারা শঙ্খ ও উলুধ্বনি করতে করতে যান। শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী স্নান করানোর পর নবপত্রিকাকে নতুন শাড়ি পরানো হয়। তারপর পূজামণ্ডপে নিয়ে এসে নবপত্রিকাকে দেবীর ডান দিকে একটি কাঠের সিংহাসনে স্থাপন করা হয়। পুজোমণ্ডপে নবপত্রিকা প্রবেশের মাধ্যমে দুর্গাপুজোর মূল অনুষ্ঠানটির প্রথাগত সূচনা হয়।
শস্যদেবীর আরাধনা
নবপত্রিকা প্রবেশের পর দর্পণে দেবীকে মহাস্নান করানো হয়। এরপর বাকি দিনগুলিতে নবপত্রিকাকে অন্য দেবদেবীর সঙ্গেই পুজো করা হয়। বিশেষ ভাবে লক্ষণীয় হলো, নবপত্রিকা প্রবেশের আগে পত্রিকার সামনে দেবী চামুণ্ডার আবাহন ও পুজো করা হয়।
গবেষকদের মতে, নবপত্রিকার পুজো প্রকৃতপক্ষে শস্যদেবীর পুজো। ড. শশিভূষণ দাশগুপ্ত লিখেছেন, ‘এই শস্যবধূকেই দেবীর প্রতীক রূপে গ্রহণ করিয়া প্রথমে পূজা করিতে হয়, তাহার কারণ শারদীয়া পূজার মূলে বোধহয় এই শস্যদেবীরই পূজা।’ পরবর্তীকালে বিভিন্ন দুর্গাপুজোর বিধিতে এই নবপত্রিকার বিভিন্ন ব্যাখ্যা দেওয়া হয়েছে। আসলে এই সবই হলো পৌরাণিক দুর্গার সঙ্গে এই শস্যদেবীকে মিলিয়ে দেওয়ার একটা সচেতন চেষ্টা। এই শস্যমাতা পৃথিবীরই রূপভেদ, সুতরাং আমাদের জ্ঞাতে-অজ্ঞাতে আমাদের দুর্গাপুজোর ভিতরে এখনও সেই আদিমাতা পৃথিবীর পুজো অনেকখানি মিশে রয়েছে।
FAQ
প্রশ্ন. নবপত্রিকা কী?
উত্তর. নবপত্রিকা হলো বাংলার দুর্গাপুজোর একটি গুরুত্বপূর্ণ আচার। কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মান ও ধান—এই ন’টি উদ্ভিদ একত্র করে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়।
প্রশ্ন. নবপত্রিকাকে কেন কলা বৌ বলা হয়?
উত্তর. নবপত্রিকার কেন্দ্রে থাকা কলাগাছকে লালপাড় সাদা শাড়ি পরিয়ে ঘোমটা দেওয়া বধূর মতো সাজানো হয়। প্রচলিত ভাষায় তাই নবপত্রিকাকে কলা বৌ বলা হয়।
প্রশ্ন. মহাসপ্তমীর সকালে নবপত্রিকাকে স্নান করানো হয় কেন?
উত্তর. দুর্গাপুজোর শাস্ত্রবিধি অনুযায়ী, মহাসপ্তমীর সকালে নবপত্রিকাকে নদী বা জলাশয়ে নিয়ে গিয়ে স্নান করানো হয়। এরপর নতুন শাড়ি পরিয়ে পুজোমণ্ডপে এনে দেবীর ডান দিকে স্থাপন করা হয়।
প্রশ্ন. নবপত্রিকার ন’টি উদ্ভিদ কী কী?
উত্তর. নবপত্রিকার ন’টি উদ্ভিদ হলো কলা, কচু, হলুদ, জয়ন্তী, বেল, ডালিম, অশোক, মান ও ধান।
প্রশ্ন. নবপত্রিকার ন’টি উদ্ভিদ কোন কোন দেবীর প্রতীক?
উত্তর. নবপত্রিকার ন’টি উদ্ভিদ যথাক্রমে ব্রহ্মাণী, কালিকা, উমা, কার্তিকী, শিবা, রক্তদন্তিকা, শোকরহিতা, চামুণ্ডা ও লক্ষ্মীর প্রতীক হিসেবে পূজিত হয়।
প্রশ্ন. নবপত্রিকা পুজোর সঙ্গে শস্যদেবীর সম্পর্ক কী?
উত্তর. গবেষকদের মতে, নবপত্রিকা পুজোর সঙ্গে প্রাচীন শস্যদেবীর আরাধনার যোগ রয়েছে। ন’টি উদ্ভিদের মাধ্যমে প্রকৃতি, কৃষি ও শস্যের সমৃদ্ধিকে দেবীর রূপে কল্পনা করা হয়।
