চাঁদপুর সদরের ইব্রাহীমপুরে প্রায় ৪০০ একর কৃষিজমির টপ সয়েল কেটে ঝিল তৈরি করে মাছ চাষের নামে দখল ও মাটি বিক্রির অভিযোগে উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।
বৃহস্পতিবার (২২ অক্টোবর) সকাল ১০টায় চাঁদপুর-৩ আসনের সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের নেতৃত্বে মুখদ্দি ও তালতাতলী এলাকায় এ অভিযান পরিচালনা করা হয়। এ সময় একটি ভেকু জব্দ করা হয় এবং ঝিলে চাষ করা মাছ মেঘনা নদীতে অবমুক্ত করা হয়।
অভিযান চলাকালে স্থানীয় জমির মালিকরা অভিযোগ করেন, প্রভাবশালী একটি চক্র তাদের পৈতৃক সম্পত্তিসহ কৃষিজমি অবৈধভাবে দখল করে মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করেছে। বাধা দিতে গেলে তাদের হুমকি ও মারধরের শিকার হতে হয়েছে বলেও অভিযোগ করেন তারা।
অভিযানে উপস্থিত ছিলেন চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস. এম. এন. জামিউল হিকমা, সদর মডেল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা ফয়েজ, সদরের সহকারী কমিশনার (ভূমি) প্রত্যয় হাশেম, জেলা বিএনপির সহ-সভাপতি খলিলুর রহমান গাজী প্রমুখ।
স্থানীয় জমির মালিক মো. নুরুল ইসলাম রাঢ়ী বলেন, ‘এখানে আমাদের পৈতৃক সম্পত্তি রয়েছে। এসব জমিতে আমাদের বাপ-দাদারা বিভিন্ন ধরনের ফসল চাষ করতেন। কিন্তু কিছু লোক ক্ষমতার দাপট দেখিয়ে আমাদের হুমকি-ধমকি দিয়ে জমি দখল করেছে। মাছের ঝিল তৈরির নামে ফসলি জমির মাটি কেটে বিভিন্ন ইটভাটায় বিক্রি করেছে।’
আরেক জমির মালিক ইদ্রিস আলী জানান, ইব্রাহীমপুর ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের মুখদ্দি এলাকায় তার পৈতৃক ২২ একর সম্পত্তি রয়েছে। একটি চক্র জমি দখল করে মাটি কাটা শুরু করলে তারা বাধা দেন। এ সময় তাদের মারধর করা হয় বলে অভিযোগ করেন তিনি। এমপি শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিকের উদ্যোগের প্রশংসা করে তিনি বলেন, তিনি যে উদ্যোগ নিয়েছেন, এ জন্য আমরা আল্লাহর কাছে তার জন্য দোয়া করব।
চাঁদপুর সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এস এম এন জামিউল হিকমা বলেন, এই চরে প্রায় ৪০০ একর জমি রয়েছে। একটি চক্র পুকুর খনন করে আসছিল। খননের সময় বিভিন্ন পর্যায়ে আমরা বাধা দিয়েছি। প্রায় ৪০ বার অভিযান চালিয়ে ভেকু বিনষ্ট করা হলেও তারা কার্যক্রম বন্ধ করেনি। দুর্গম এলাকা হওয়ায় নদী উত্তাল থাকলে সেখানে যাতায়াত কঠিন হয়ে পড়ে। এই সুযোগে তারা আবারও মাটি কাটার কাজ চালিয়ে যায়।
তিনি আরও বলেন, আজকের অভিযানে ঝিলের মাছ নদীতে অবমুক্ত করা হয়েছে। সরকারি আইন অনুযায়ী স্থানীয় কৃষকদের মধ্যে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে। এ ঘটনায় ইতোমধ্যে তিনটি মামলা করা হয়েছে। এসব মামলায় প্রায় ৪৮ জনকে আসামি করা হয়েছে। তাদের গ্রেপ্তারে খোঁজ চলছে। আসামিদের অনেকে স্থানীয় নয়; বিভিন্ন জেলা থেকে এসে এ কর্মকাণ্ডে জড়িত হয়েছে।
সংসদ সদস্য শেখ ফরিদ আহম্মেদ মানিক বলেন, একটি চক্র নদীর ওপার থেকে এসে ইব্রাহীমপুর ইউনিয়নে আবাদি জমি ও সরকারি খাসজমিতে অবৈধভাবে কার্যক্রম চালাচ্ছে। এসব জমিতে স্থানীয় সাধারণ মানুষ চাষাবাদ করে জীবিকা নির্বাহ করতেন। প্রশাসন এর আগেও বহুবার অভিযান চালিয়েছে। কিন্তু অভিযান শেষে ওই চক্র আবারও এসে একই কাজ শুরু করে।
তিনি বলেন, ইউএনও সাহেবের সঙ্গে সরেজমিনে পরিস্থিতি দেখতে এসে ভয়াবহ অবস্থা দেখতে পেয়েছি। এভাবে চলতে থাকলে ভবিষ্যতে আমাদের আবাদি জমির পরিমাণ কমে যাবে। সরকার সৌরবিদ্যুৎ স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ উৎপাদনের চেষ্টা করছে। ইব্রাহীমপুরে বিপুল পরিমাণ জমি রয়েছে। পরিকল্পিতভাবে এখানে সৌরবিদ্যুৎ প্রকল্প স্থাপন করা গেলে কৃষক ও দেশ—উভয়ই উপকৃত হতে পারে।
সরকারি জমির মালিকানা ও বন্দোবস্ত প্রসঙ্গে এমপি মানিক বলেন, এই জমির মালিক সরকার। জমি সরকারি বিধিবিধান ও গেজেট অনুযায়ী বন্দোবস্ত থাকবে। সদর উপজেলা প্রশাসন জমির ব্যবস্থাপনার দায়িত্বে রয়েছে। সরকারি নিয়মকানুন অনুসরণ করে এ এলাকার ভূমিহীনদের মধ্যে জমি বন্দোবস্ত দেওয়ার বিষয়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। এ বিষয়ে আমি সরকারের উচ্চপর্যায়ে আলোচনা করব। যারা এসব কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত, তাদের কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না—সে যেই হোক।
তিনি আরও বলেন, এটি একটি দুর্গম এলাকা, যেখানে যাতায়াত অত্যন্ত কঠিন। গত চার মাস নদী উত্তাল থাকায় প্রশাসনের পক্ষে এখানে আসা কঠিন ছিল। এই সময়ের সুযোগ নিয়ে চক্রটি এসব কর্মকাণ্ড চালিয়েছে। আমি আশা করি, জড়িত সবাইকে দ্রুত আইনের আওতায় আনা হবে।
