শিশুদের নির্মল বিনোদন ও খেলাধুলার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করতে বগুড়া মহানগরে গড়ে তোলা হয়েছিল সাতটি পার্ক। কিন্তু সময়ের ব্যবধানে এসব পার্কের অনেকই হারিয়েছে স্বাভাবিক পরিবেশ ও বিনোদনের সুযোগ। বিশেষ করে মহানগরের প্রাণকেন্দ্র সাতমাথার কাছে অবস্থিত শহীদ খোকন পৌর শিশু উদ্যান এখন অনেকটাই পরিণত হয়েছে ফাঁকা মাঠে।
শিশুদের জন্য নেই পর্যাপ্ত রাইড, দোলনা কিংবা খেলাধুলার সরঞ্জাম। বরং পার্কজুড়ে হকারদের দখল, অপরিচ্ছন্ন পরিবেশ ও নিরাপত্তাহীনতা। সারা বছর এখানে রাজনৈতিক সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও মেলা হয়, আর সাধারণ সময়ে পার্কটি থাকে হকার ও ভ্রাম্যমাণ দোকানিদের দখলে। একদিকে অন্য পার্কগুলোর আধুনিকায়নের উদ্যোগ চললেও, দীর্ঘদিন ধরে উপেক্ষিত মুক্তিযোদ্ধা শহীদ খোকনের স্মৃতিবিজড়িত এই উদ্যান।
বিজ্ঞাপন
বগুড়া শহর অবকাঠামো উন্নয়ন প্রকল্পের আওতায় ২০০৬ সালে পার্কটির আধুনিকায়ন ও কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার নির্মাণ কাজের উদ্বোধন করা হয়। উদ্বোধন করেন তৎকালীন বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব তারেক রহমান এবং বগুড়া পৌরসভার তৎকালীন পৌর চেয়ারম্যান অ্যাডভোকেট মাহবুবুর রহমান। অথচ দীর্ঘ সময় পেরিয়ে গেলেও শিশুদের বিনোদনের উপযোগী করে গড়ে তোলা যায়নি পার্কটিকে।
সাতমাথা কেন্দ্রীয় ডাকঘরের পেছনে, সার্কিট হাউসের উল্টো পাশে অবস্থিত শহীদ খোকন পৌর শিশু উদ্যান। নামে শিশু উদ্যান হলেও সেখানে নেই দোলনা, স্লিপার কিংবা আধুনিক কোনো রাইড। সাধারণ সময়ে পার্কের ভেতরে ও প্রবেশমুখে হকার এবং ভ্রাম্যমাণ দোকানিদের উপস্থিতি চোখে পড়ে। চা-সিগারেট, কাপড়, সিমকার্ড ও খাবারের দোকানের পাশাপাশি কান পরিষ্কারের মতো সেবার দোকানও বসে। এতে পার্কের পরিবেশ থাকে অপরিচ্ছন্ন।
অভিযোগ রয়েছে, পার্কের ভেতরে কিছু ব্যক্তি জোরপূর্বক চাঁদা আদায় করেন। এতে শিশুদের নিয়ে আসা অভিভাবকদের মধ্যে অস্বস্তি ও ভীতি তৈরি হয়। মাঝেমধ্যে পরিবার নিয়ে পার্কে ঘুরতে এলেও শিশুদের বিনোদনের তেমন কোনো ব্যবস্থা না থাকায় হতাশ হয়ে ফিরতে হয়। শহীদ মিনারের বেদিতে লুকোচুরি খেলা ছাড়া শিশুদের জন্য উল্লেখযোগ্য কিছু করার সুযোগ নেই।
স্থানীয় কয়েকজন অভিভাবক ও স্কুলশিক্ষার্থীর ভাষ্য, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের কাছাকাছি হওয়ায় যাতায়াতের পথে তারা পার্কটি দেখেন। কিন্তু শিশুদের খেলার উপযোগী সরঞ্জাম না থাকায় নামের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে পাওয়া যায় না। তাদের চোখে এটি শিশু উদ্যানের চেয়ে একটি ফাঁকা মাঠ হিসেবেই বেশি ধরা পড়ে।
সম্প্রতি পার্কের পশ্চিম পাশের সীমানাপ্রাচীর ভেঙে সেখানে বহুতল ফুল মার্কেট ভবন নির্মাণ করা হয়েছে। এতে পার্কটির স্বকীয়তা ক্ষুণ্ণ হওয়ার পাশাপাশি অবাধ যাতায়াত ও নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ তৈরি হয়েছে।
পার্কে নেই শহীদ খোকনের স্মারক
মুক্তিযোদ্ধা গোলাম মোহাম্মদ পাইকার খোকনের স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে পার্কটির নামকরণ করা হয়। ১৯৭১ সালে মাত্র ১৭ বছর বয়সে মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন খোকন। সহযোদ্ধাদের নিয়ে বগুড়ায় প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তিনি। পরে বিশ্বাসঘাতকতার শিকার হয়ে ১৬ জন সহযোদ্ধাসহ ধরা পড়েন এবং নির্মম নির্যাতনের পর তাকে হত্যা করা হয়।
কিন্তু তার স্মৃতিবিজড়িত পার্কে নেই কোনো ম্যুরাল কিংবা তার জীবন ও মুক্তিযুদ্ধে অবদান তুলে ধরার মতো তথ্যসম্বলিত স্মারকচিহ্ন। কেবল শহীদ মিনার ও ফাঁকা প্রাঙ্গণ নিয়েই দাঁড়িয়ে আছে উদ্যানটি। ফলে নতুন প্রজন্মের কাছে শহীদ খোকনের আত্মত্যাগ তুলে ধরার সুযোগও সীমিত হয়ে পড়েছে।
সাতটি পার্ক এখন অস্তিত্ব সংকটে
বগুড়া পৌরসভার ২০২১-২০২২ অর্থবছরের বাজেটে বিনোদন পার্কগুলোর বিভিন্ন রাইড, স্থাপনা নির্মাণ ও আধুনিকায়নের জন্য এক কোটি টাকা বরাদ্দের ঘোষণা দেওয়া হয়েছিল। ২০২৩-২০২৪ অর্থবছরের বাজেট ঘোষণার স্মারক বইয়ে উল্লেখ করা আছে অ্যাডওয়ার্ড পার্ক, শহীদ খোকন পার্ক, চেলোপাড়া শিশু পার্ক, কাটনারপাড়া শিশু পার্ক, শিববাটি পার্ক, চকসূত্রাপুর শিশু পার্ক এবং এম এস ক্লাব মাঠ শিশু পার্কে শিশুদের বিনোদনের জন্য দোলনা, স্লিপারসহ কিছু কিডস রাইডস স্থাপন করা হয়েছে বলে উল্লেখ করা হয়।
একই বাজেটের উন্নয়ন হিসাবের ব্যয় খাতে পৌর পার্কসহ অন্যান্য পার্ক নির্মাণ বাবদ ৫০ লাখ টাকা ব্যয়ের তথ্যও রয়েছে। তবে বাজেটের ঘোষণা ও বাস্তব পরিস্থিতির মধ্যে ব্যবধান নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। অন্য কয়েকটি পার্কে কিছু বিনোদন সরঞ্জাম স্থাপন করা হলেও শহীদ খোকন পৌর শিশু উদ্যানে শিশুদের জন্য কার্যকর কোনো ব্যবস্থা গড়ে ওঠেনি।
এদিকে আলতাফুন্নেছা খেলার মাঠের উন্নয়নে পায়ে চলার পথ, আরসিসি ড্রেন, গেট, সীমানাপ্রাচীর ও রেলিং সংস্কারসহ বিভিন্ন কাজের উদ্যোগ নেওয়া হয়। মাঠে বালু ভরাট ও সমতল করার কাজও করা হয়েছে। অথচ শহীদ খোকন পার্কের উন্নয়নে দৃশ্যমান অগ্রগতি নেই বলে অভিযোগ রয়েছে।
আধুনিকায়নে এগোচ্ছে অ্যাডওয়ার্ড পার্ক
২০২৪ সালের গণঅভ্যুত্থানের পর ২০২৬ সালে নবসৃষ্ট বগুড়া সিটি করপোরেশনের বাজেটে অ্যাডওয়ার্ড পার্ক, শহীদ খোকন পৌর শিশু উদ্যান ও নীলসাগর দীঘি আধুনিকায়নের পরিকল্পনার কথা জানা যায়। কিন্তু বাস্তবে অ্যাডওয়ার্ড পার্কের উন্নয়ন কাজ শুরু হলেও তা চলছে ধীরগতিতে।
পার্কের সাঁতার শেখার সুইমিং কমপ্লেক্সের ছাদ বছরের মাঝামাঝি ধসে পড়ে। অন্যান্য নির্মাণ কাজও চলছে মন্থরগতিতে। সীমানার রেলিংসহ বিভিন্ন কাজ চলমান থাকায় দর্শনার্থীরা আগের নির্মিত হাঁটার পথও স্বাচ্ছন্দ্যে ব্যবহার করতে পারছেন না। ফোয়ারার পাশের শিশুদের অংশে থাকা দোলনা, স্লিপারসহ অধিকাংশ রাইড ক্ষতিগ্রস্ত। কাঁচা মাটির ওপর খেলনাগুলো স্থাপন করায় বৃষ্টির দিনে ওই অংশ ব্যবহার অনুপযোগী হয়ে পড়ে। জায়গা ছোট হওয়ায় শিশুদের বিনোদনের পরিসর নিয়েও ক্ষোভ রয়েছে অভিভাবকদের।
প্রতি ওয়ার্ডে শিশুপার্ক প্রকল্প থমকে আছে
মহানগরের প্রতিটি ওয়ার্ডে একটি করে শিশুপার্ক নির্মাণের পরিকল্পনা থাকলেও এর অগ্রগতি নেই। শিশুদের বিনোদনের সুযোগ বৃদ্ধি, পার্কের নিরাপত্তা এবং সেখানে সভা-সমাবেশ বন্ধের বিষয়ে জানতে চাইলে বগুড়া সিটি করপোরেশনের প্রশাসক এম আর ইসলাম স্বাধীন জানান, শহীদ খোকন পার্কে আর কোনো সভা-সমাবেশের অনুমতি দেওয়া হবে না।
তিনি আরো জানান, অ্যাডওয়ার্ড পার্কের আধুনিকায়নসহ সার্বিক কাজ আগামী নভেম্বরের মধ্যে শেষ করার নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। উপযুক্ত জায়গা পাওয়া গেলে ওয়ার্ড পর্যায়ে মিনি শিশুপার্ক নির্মাণ করে শিশুদের বিনোদনের ব্যবস্থা করা হবে।
তবে নগরবাসীর প্রত্যাশা, পরিকল্পনা ও বাজেটের ঘোষণা যেন কাগজে-কলমে সীমাবদ্ধ না থাকে। শিশুদের জন্য নিরাপদ, পরিচ্ছন্ন ও খেলাধুলার উপযোগী পরিবেশ নিশ্চিত করার পাশাপাশি শহীদ খোকন পৌর শিশু উদ্যানের ঐতিহ্য ফিরিয়ে আনতে দ্রুত কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া হবে—এমনটাই প্রত্যাশা তাদের।
