কক্সবাজারের উখিয়ার ইনানীর পাটুয়ারটেক সৈকত এলাকায় টুপটুপ রিসোর্ট অ্যান্ড রেস্টুরেন্টে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে নারী ও শিশুসহ ১০ জনের মৃত্যু হয়েছে। কাঠের তৈরি তিনতলা রিসোর্টটিতে আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর একে একে ১০ জনের দগ্ধ মরদেহ উদ্ধার করা হয়। এ ঘটনায় অন্তত ১৫ জন আহত হওয়ার খবর পাওয়া গেছে। সবচেয়ে উদ্বেগজনক বিষয় হলো, প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও লাইসেন্স ছাড়াই চলছিল রিসোর্টটির কার্যক্রম। গত জুনে পরিদর্শনের পর স্থাপনাটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হলেও কার্যক্রম বন্ধ করা হয়নি।
শনিবার (১৭ অক্টোবর) সকালে মেরিন ড্রাইভ সড়কসংলগ্ন রিসোর্টটিতে আগুন লাগে। আগুনের খবর পেয়ে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছে উদ্ধার ও নির্বাপণ কার্যক্রম শুরু করেন। স্থানীয় বাসিন্দারাও পুলিশের সহায়তায় উদ্ধারকাজে অংশ নেন। আগুনে রিসোর্টটির বড় অংশ পুড়ে যায়। পরে সেখান থেকে ১০ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়। কয়েকজনের মরদেহ শৌচাগার থেকে উদ্ধার করা হয়েছে বলে ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন। মরদেহগুলো মারাত্মকভাবে পুড়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তে ডিএনএ পরীক্ষার প্রয়োজন হতে পারে বলে সংশ্লিষ্ট প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রিসোর্টটির ব্যবস্থাপক মোহাম্মদ সুমনকে পুলিশি হেফাজতে নেওয়া হয়েছে। আগুনের সূত্রপাত ও দুর্ঘটনার কারণ অনুসন্ধানে তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। তবে আগুন লাগার প্রকৃত কারণ এখনো আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত হয়নি।
সতর্কতার পরও চলছিল রিসোর্ট: ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্সের মহাপরিচালক ব্রিগেডিয়ার জেনারেল সুলতানুল আফরীন জুনাইদ শনিবার ঢাকায় ফায়ার সার্ভিস সদর দপ্তরে সংবাদ সম্মেলনে জানান, টুপটুপ রিসোর্টের প্রয়োজনীয় অগ্নিনিরাপত্তা সনদ ও লাইসেন্স ছিল না। গত জুনে পরিদর্শনের পর এটিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে সতর্কতামূলক নোটিশ দেওয়া হয়েছিল। তারপরও রিসোর্টটির কার্যক্রম চালু ছিল।
তিনতলা কাঠের স্থাপনাটির নিচতলায় ছিল রেস্তোরাঁ ও রান্নার ব্যবস্থা। দোতলা ও তিনতলায় পর্যটকদের থাকার কক্ষ ছিল। কাঠের মতো দাহ্য উপকরণে তৈরি ভবনে আগুন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ার ঝুঁকি থাকলেও প্রয়োজনীয় নিরাপত্তাব্যবস্থা কেন নিশ্চিত করা হয়নি, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।
মহাপরিচালক বলেন, তদন্তের আগে অনুমানের ভিত্তিতে অগ্নিকাণ্ডের কারণ নির্ধারণ করা ঠিক হবে না। পুঙ্খানুপুঙ্খ তদন্তের পরই প্রকৃত কারণ জানা যাবে। কক্সবাজারসহ দেশের বিভিন্ন পর্যটন এলাকায় কাঠ ও অন্যান্য দাহ্য উপকরণে তৈরি রিসোর্টগুলোর নিরাপত্তা ও অনুমোদনের বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে। প্রয়োজনীয় অনুমতি ছাড়া পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে নোটিশ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হবে বলেও জানান তিনি।
রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাতের ধারণা: রিসোর্টের পাশের বাসিন্দা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও তাঁর ভাই মুসার ধারণা, রান্নাঘর থেকে আগুনের সূত্রপাত হয়ে থাকতে পারে। আব্দুল্লাহর ভাষ্য অনুযায়ী, রান্নাঘর ও অভ্যর্থনাকক্ষ পাশাপাশি ছিল। এর পাশেই ছিল ওপরের তলায় ওঠার সিঁড়ি। আগুন ছড়িয়ে পড়ায় ওপরের কক্ষে থাকা লোকজন ওই পথ দিয়ে বের হতে পারেননি বলে তাঁর ধারণা।
আব্দুল্লাহ বলেন, সকালের নাশতা তৈরির সময় রান্নাঘর থেকে আগুন ছড়িয়ে পড়তে দেখেছেন বলে তাঁর মনে হয়েছে। আগুনের খবর জানাতে তিনি সকাল ৭টা ২৪ মিনিটে জাতীয় জরুরি সেবা নম্বর ৯৯৯-এ ফোন করেন। পরে ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ঘটনাস্থলে পৌঁছান। আগুন ছড়িয়ে পড়ার পর একজনকে জানালার কাচ ভেঙে লাফ দিয়ে বের হতে দেখেছেন বলেও জানান তিনি। আহতদের উদ্ধার করে অটোরিকশায় তুলে দেওয়ার পর তাঁদের খোঁজ নিতে হাসপাতালে যান আব্দুল্লাহ।
ফায়ার সার্ভিসের সদর দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, শনিবার সকাল ৭টা ২৫ মিনিটে অগ্নিকাণ্ডের খবর পায় নিয়ন্ত্রণকক্ষ। উখিয়া ফায়ার স্টেশনের দুটি ইউনিট সকাল ৮টার দিকে ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে। তবে বিভিন্ন প্রতিবেদনে আগুন নিয়ন্ত্রণে আসার সময় নিয়ে ভিন্ন তথ্য রয়েছে।
একই পরিবারের একাধিক সদস্য নিহত: অগ্নিকাণ্ডে নিহতদের মধ্যে একই পরিবারের একাধিক সদস্য রয়েছেন। বিভিন্ন প্রতিবেদনে নিহতদের পরিচয় হিসেবে রাজধানীর বনশ্রী ও খিলগাঁও এলাকার ইসরাত জাহান মালিহা (৩০), মিলিতা মেহেজাবিন আলভী (২৩), লায়লা জাহান নাবিলা (২৭), নাফিসতা মীম (২৭), চুয়াডাঙ্গার ফারিয়া বা ফারিহা কবির (৩৩), পাঁচ বছর বয়সী ফাইজান বা ফায়িজান এবং নাসরিন আক্তার মুক্তার (২৯) নাম প্রকাশিত হয়েছে। তবে কয়েকটি প্রতিবেদনে নামের বানান, পারিবারিক সম্পর্ক ও পরিচয়ের বিবরণে অমিল রয়েছে। ফলে সব পরিচয় কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে চূড়ান্তভাবে নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
নিহতদের স্বজন ও জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ের লোকপ্রশাসন বিভাগের শিক্ষার্থী আব্দুল আহাদ সরকার জানান, নিহতদের মধ্যে তাঁর পরিবারের সদস্য ও পাঁচ বছর বয়সী ভাগনি রয়েছেন। তাঁর মামা মাসুদ ও মামী মেহেরুন্নেসা কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া পোস্টে প্রথমে পরিবারের ছয় সদস্যের মৃত্যুর খবর পাওয়ার কথা জানালেও পরে আরো একজনের মৃত্যুর খবর পাওয়ার কথা উল্লেখ করেন তিনি।
অন্য এক স্বজন আমিনুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, তাঁদের পরিবারের নয়জনের মধ্যে ছয়জন মারা গেছেন। বাকি তিনজন বেঁচে আছেন। পরিবারের দুই সদস্য আগুন লাগার সময় সৈকতে থাকায় প্রাণে বেঁচে যান। আরেকজন দোতলা থেকে লাফিয়ে পড়ে আহত অবস্থায় বেঁচে যান। আগুনের তীব্রতার কারণে সৈকতে থাকা স্বজনেরা রিসোর্টের ভেতরে ঢুকতে পারেননি। পরে তাঁরা ঢাকায় থাকা আমিনুলকে খবর দেন। তিনি বিমানযোগে কক্সবাজারে পৌঁছান।
স্বজনদের ভাষ্য অনুযায়ী, পরিবারটির সদস্যরা বৃহস্পতিবার ঢাকা থেকে কক্সবাজারে বেড়াতে যান। শনিবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে তাঁদের ঢাকায় ফেরার কথা ছিল। ফেরার প্রস্তুতির আগেই আগুনে সবকিছু তছনছ হয়ে যায়।
বেলকনি থেকে লাফ দিয়ে বাঁচলেন চিকিৎসক দম্পতি: অগ্নিকাণ্ডের সময় রিসোর্টে থাকা রাজধানীর মুগদা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের চিকিৎসক শিহাব উদ্দিন সাদি ও তাঁর স্ত্রী চিকিৎসক নাফিজা নাওয়ার খান বেলকনি থেকে লাফিয়ে প্রাণে বাঁচেন। বৃহস্পতিবার স্ত্রীকে নিয়ে কক্সবাজারে বেড়াতে এসে তাঁরা রিসোর্টটিতে উঠেছিলেন।
শিহাব জানান, সকালে তাঁরা ঘুমিয়ে ছিলেন। চিৎকার-চেঁচামেচি শুনে তাঁর স্ত্রী তাঁকে ডেকে তোলেন। ঘর থেকে বের হয়েই আগুন ও ধোঁয়ায় চারপাশ অন্ধকার হয়ে যেতে দেখেন। নিচে নামার পথ বন্ধ থাকায় তাঁরা বেলকনিতে যান। সেখান থেকে পাশের একটি টিনের ঘরের ওপর লাফ দেন। টিন ভেঙে নিচে পড়ে দুজন আহত হন। তাঁর স্ত্রীর পায়ে এবং তাঁর হাতে ও কাঁধে আঘাত লাগে। পরে স্থানীয় ব্যক্তিরা তাঁদের উদ্ধার করে প্রথমে উখিয়া উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে যান। প্রাথমিক চিকিৎসার পর তাঁরা কক্সবাজার সদর হাসপাতালে যান।
শিহাবের ভাষ্য, রিসোর্টটির আটটি কক্ষই বুক করা ছিল। অগ্নিকাণ্ডের সময় সেখানে থাকা অন্যদের পরিণতি নিয়ে তাঁরা উদ্বিগ্ন ছিলেন।
আহতদের চিকিৎসা, তদন্ত কমিটি গঠন: অগ্নিকাণ্ডে আহত ব্যক্তিদের কক্সবাজার সদর হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে আহতের সংখ্যা অন্তত ১৫ বলা হলেও প্রাথমিকভাবে ছয়জনের চিকিৎসাধীন থাকার তথ্যও পাওয়া গেছে। তাঁদের মধ্যে চিকিৎসক শিহাব উদ্দীন (৩১), তাঁর স্ত্রী নাফিজা নাওয়ার খান (২৯), ইসমাইল হোসেন মাসুদ (৩০), তাঁর স্ত্রী মেহেরুন্নেছা, মান্নান (৩৪) ও সামিদার (৩২) নাম উল্লেখ করা হয়েছে। আহতদের পরিচয় ও সর্বশেষ সংখ্যা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে নিশ্চিত করা প্রয়োজন।
উখিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা আতিকুর রহমান জানান, অগ্নিকাণ্ডের কারণ খতিয়ে দেখা হচ্ছে। নিহতদের পরিচয় নিশ্চিত করা এবং প্রয়োজনীয় আইনগত পদক্ষেপ নেওয়ার কাজ চলছে।
অগ্নিকাণ্ডের কারণ, প্রাণহানি ও ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ নিরূপণে কক্সবাজারের অতিরিক্ত জেলা ম্যাজিস্ট্রেটের নেতৃত্বে পাঁচ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে বলে স্থানীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। কমিটি আগুনের সূত্রপাত, রিসোর্টের নিরাপত্তাব্যবস্থা এবং সম্ভাব্য দায় নির্ধারণের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখবে।
এদিকে বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত ক্ষয়ক্ষতি নিরূপণ, পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ এবং পর্যটকদের সহায়তায় বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডকে প্রতিনিধি দল পাঠানোর নির্দেশ দিয়েছেন। নিখোঁজ ব্যক্তিদের সন্ধান এবং দুর্ঘটনার প্রকৃত কারণ উদ্ঘাটনে প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন তিনি। পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী ও পর্যটন খাতের অংশীজনদের নিয়ে জরুরি সভা আয়োজন এবং পর্যটনকেন্দ্রের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অগ্নিনিরাপত্তা ও জরুরি উদ্ধার বিষয়ে প্রশিক্ষণের উদ্যোগ নিতেও নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনা পর্যটনকেন্দ্রের আবাসন ও বিনোদন স্থাপনাগুলোর অগ্নিনিরাপত্তা, অনুমোদন এবং তদারকির দুর্বলতা সামনে এনেছে। ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত হওয়ার পরও একটি রিসোর্ট কীভাবে কার্যক্রম চালিয়ে গেল, সতর্কতামূলক নোটিশের পর কী ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল এবং সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ দায়িত্ব পালনে কতটা কার্যকর ছিল—তদন্তে এসব প্রশ্নের জবাব খুঁজে বের করা জরুরি। প্রাণহানির দায় নির্ধারণের পাশাপাশি ভবিষ্যতে এমন দুর্ঘটনা ঠেকাতে কার্যকর ব্যবস্থা নেওয়াই এখন সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।
সানা/আপ্র/১৭/১০/২০২৬
