বিসর্জনে পতেঙ্গা সৈকতে ভক্তদের ঢল
সিনিয়র রিপোর্টার। চট্টগ্রামনিউজ.কম
শঙ্খনাদ, উলুধ্বনি, ঢাকের বাদ্য আর ধূপ-ধুনোর মিষ্টি সুবাসে চারপাশ যেন এক স্বর্গীয় আবহে মুখরিত। কিন্তু সেই আনন্দের ভেতরেই লুকিয়ে ছিল একচিলতে বিদায়ের সুর। টানা ছয় দিনের জাঁকজমকপূর্ণ শারদোৎসবের বুধবার বিজয়া দশমীর পূজা শেষে অশ্রুসজল চোখে দুর্গতিনাশিনী দেবী দুর্গাকে বিদায় জানান ভক্তরা।
শুভ বিজয়া দশমীতে আনন্দময়ী মায়ের বিদায়বেলায় মন্ডপে মন্ডপে নেমে এসেছে ভক্তি, প্রেম আর বিষাদের এক অপূর্ব মেলবন্ধন। এর মধ্যদিয়ে একটানা ছয়দিনের শারদীয় দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক সমাপ্তি ঘটেছে।
পঞ্জিকার হিসাব ও ধর্মীয় বিধান মেনে আজ বুধবার কড়া নিরাপত্তার মধ্য দিয়ে পতেঙ্গা সমুত্র সৈকতে সম্পন্ন হয়েছে দেবী দুর্গার প্রতিমা বিসর্জন।
আজ বুধবারে বিজয়া দশমীর সকালে দেবীর চরণে শেষবারের মতো অঞ্জলি নিবেদন ও আর্শীবাদ গ্রহণে নগরীর পূজা মন্ডপ গুলোতে ছিল ভক্তদের উপচে পড়া ভিড়। সনাতন শাস্ত্রীয় রীতি মেনে সকাল থেকেই শুরু হয় দশমী বিহিত পূজা, অপরাজিতা পূজা এবং দর্পণ বিসর্জন।
দেবীর প্রতিবিম্ব দর্শনের পর ভক্তরা দেবীর পাদপদ্মে অর্পণ করেন শেষ পুষ্পাঞ্জলি, আর তাতেই সাঙ্গ হয় শাস্ত্রীয় পূজার আনুষ্ঠানিকতা। পুরোহিতরা দেবীর জন্য সাজান সেদ্ধ চালের নৈবেদ্য, কচু-ঘেচু আর শাপলা দিয়ে। এরপর শেষ মন্ত্রোচ্চারণের মধ্যদিয়ে বিদায় জানানো হয় দেবীকে।
তবে বিজয়া দশমীর সবচেয়ে আবেগঘন ও বর্ণিল মুহূর্ত ছিল ঐতিহ্যবাহী সিঁদুর খেলা। লাল-সাদা শাড়িতে সেজে বিবাহিত নারীরা বরণের থালায় সিঁদুর, পান-সুপারি, ফুল ও মিষ্টি নিয়ে হাজির হন মন্ডপে। পানের পাতায় দেবীর মুখ স্পর্শ করিয়ে মিষ্টিমুখ করানো এবং দেবীর সিঁথিতে সিঁদুর পরিয়ে দেয়া হয়। লাল রঙকে শক্তির প্রতীক হিসেবে মনে করে সনাতন নারীরা মন্ডপ প্রাঙ্গণে আনন্দ-উচ্ছ্বাসে একে অপরের মাথায়, কপালে ও গালে সিঁদুর মাখিয়ে স্বামীদের দীর্ঘায়ু, সংসার সমৃদ্ধি ও সুস্বাস্থ্য প্রার্থনা করেন। শুধু নারীরাই নন, অনেক স্বামীকেও দেখা গেছে স্ত্রীর কপালে সিঁদুর পরাতে, আর তরুণ-তরুণী থেকে শুরু করে শিশুরা মেতে উঠেছে নাচে-গানে। লাল রঙকে শক্তির প্রতীক হিসেবে মনে করে সনাতন নারীরা একে অপরের মাথায় সিঁদুর ছোঁয়ান। দীর্ঘায়ু কামনা করেন পরিবারের সদস্যদের। দশমীর অঞ্জলী নিবেদন শেষে মন্ডপে মন্ডপে ভক্তারা একে অপরের সঙ্গে বিজয়ার শুভেচ্ছা বিনিময় করেন।
বিজয়া দশমীর লগ্ন শুরু হওয়া মানেই ভক্তদের হৃদয়ে এক গভীর বিষাদের সুর বেজে উঠে। দীর্ঘ ছয় দিনের আনন্দ-উল্লাস, পূজা-অর্চনা আর মায়ের সান্নিধ্যের পর দেবালয়ের কৈলাসে স্বামীর ঘরে ফেরার পালা। এ বিদায়ের ক্ষণটি ভক্তদের মনকে ভারাক্রান্ত করে তোলে।
এবছর দুর্গাপূজায় দেবী দুর্গার মর্ত্যে আগমন হয়েছে ঘোটকে বা ঘোড়ায় এবং কৈলাসে গমন হবে নৌকায়। প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ঘোড়ায় আগমনকে মনে করা হয় সমাজে অস্থিরতা এবং পরিবর্তনের ইঙ্গিত।
অন্যদিকে নৌকায় গমনকে মনে করা হয়, জলবৃদ্ধি, অতিবৃষ্টি বা বন্যার আশঙ্কার পাশাপাশি শস্যবৃদ্ধি, উর্বরতা ও মনোবাসনা পূরণের ইঙ্গিত।
বিজয়া দশমীর দিন নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ছিল লোকে লোকারণ্য। দুপুর গড়িয়ে বিকেল নামতেই ঢাক-ঢোল, কাঁসর-ঘণ্টার বাদ্যের তালে তালে নগরীর বিভিন্ন মন্দির ও পাড়ার পূজা মন্ডপ গুলো থেকে শোভাযাত্রা করে প্রতিমাগুলো পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে নিয়ে আসা হয়। শঙ্খ, খোল ও ঢাকের বাদ্যের সুরে দেবীর স্তুতি গেয়ে ভক্তরা ট্রাকে করে পতেঙ্গা বিসর্জনের স্থানে পৌঁছান। এর পর একে একে প্রতিমাগুলো সমুদ্রে নিয়ে বিসর্জন দেওয়া হয়।
এ সময় চারপাশের দৃশ্যপট এক আবেগঘন রূপ নেয়। ভক্তদের কারও চোখে চিকচিক করে জল, কারও ঠোঁটে বিরামহীন উচ্চারিত হয় মায়ের বন্দনা। শেষ মুহূর্তে মায়ের চরণে ফুল দিয়ে দেশের শান্তি, সমৃদ্ধি ও সব ধরনের অপশক্তি দূর করার প্রার্থনা জানান সবাই। নদী থেকে পানি তুলে নিজের ও পরিবারের সদস্যদের গায়ে ছিটিয়ে আশীর্বাদ গ্রহণ করেন ভক্তরা।
এবারের চট্টগ্রাম নগরীর ২৯৪টি ও জেলার ১৬৫৫টিসহ মোট ১৯৫৯টি পূজা মন্ডপে উৎসবমুখর পরিবেশে উদযাপিত হয়েছে শারদোৎসব।
চট্টগ্রাম নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকত ছাড়াও কর্ণফুলী নদী, ফিরিঙ্গি বাজার, কালুরঘাট ও সীতাকুন্ডের সলিমপুর সৈকত এলাকায় হাজারো মানুষের উপস্থিতিতে প্রাতমা বিসর্জন সম্পন্ন হয়েছে।
পতেঙ্গা সৈকতে প্রতিমা বিসর্জন: প্রতিবছরের মতো এবারও পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে দেবীকে শেষবারের মতো দেখার জন্য লোকে লোকারণ্যে পরিণত হয়।
নগরীর পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে প্রতিমা নিরঞ্জনের ব্যবস্থা করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন।
সিটি কর্পোরেশনের ব্যবস্থাপনায় পতেঙ্গা সমুদ্র সৈকতে প্রতিমা বির্সজন অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন।
পতেঙ্গা বিসর্জন অনুষ্ঠানে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, চট্টগ্রাম নগরীতে সবার সম্মিলিত সহযোগিতা, পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ ও সম্প্রীতির মধ্য দিয়ে শারদীয় দুর্গোৎসব সুন্দরভাবে সম্পন্ন হয়েছে।
সিটি মেয়র ডা. শাহাদাত হোসেন বলেন, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে নগরীর পূজা উদযাপন কমিটি, সংশ্লিষ্ট সরকারি-বেসরকারি সংস্থা এবং চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তাদের সঙ্গে সমন্বয় করে প্রয়োজনীয় প্রস্তুতি গ্রহণ করা হয়েছিল। উৎসবের সার্বিক পরিবেশ সুন্দর রাখতে সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে যোগাযোগ ও মতবিনিময় করা হয়েছে। সবার আন্তরিকতা ও সহযোগিতার কারণেই উৎসবটি সুন্দরভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়েছে। এ জন্য তিনি পূজা উদযাপন কমিটি, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, সিটি কর্পোরেশনের কর্মকর্তা-কর্মচারী, স্বেচ্ছাসেবক, গণমাধ্যমকর্মীসহ সংশ্লিষ্ট সবাইকে ধন্যবাদ জানান।
তিনি বলেন, ধর্মীয় উৎসব নির্বিঘ্নে উদযাপনের জন্য শুধু নিরাপত্তা নিশ্চিত করাই যথেষ্ট নয়; প্রয়োজন নাগরিক সেবা, পরিচ্ছন্ন পরিবেশ, চলাচলের উপযোগী সড়ক এবং উৎসবস্থলে প্রয়োজনীয় অবকাঠামোগত সুবিধা নিশ্চিত করা। দুর্গাপূজা উপলক্ষে নগরীর বিভিন্ন পূজাম-পে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা প্রদান, বিদ্যুৎ ও আলোকসজ্জাসংক্রান্ত ব্যবস্থা সমন্বয়, সড়ক সংস্কার এবং পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতা কার্যক্রম পরিচালনা করেছে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন। নাগরিকদের ধর্মীয় ও সামাজিক উৎসবগুলো যাতে স্বস্তি ও আনন্দের সঙ্গে উদযাপন করতে পারেন, সে লক্ষ্যে সিটি কর্পোরেশন তার দায়িত্ব পালনে সচেষ্ট রয়েছে।
মেয়র আরও বলেন, চট্টগ্রাম ঐতিহাসিকভাবেই বহুধর্মীয় সংস্কৃতি, সম্প্রীতি ও সহাবস্থানের নগরী। এখানে হিন্দু, মুসলিম, বৌদ্ধ, খ্রিষ্টানসহ বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ দীর্ঘদিন ধরে পাশাপাশি বসবাস করছেন। একে অপরের ধর্মীয় বিশ্বাসের প্রতি সম্মান প্রদর্শন এবং বিপদে-আপদে পাশে দাঁড়ানোর মধ্য দিয়েই এই সামাজিক বন্ধন আরও শক্তিশালী হয়। একটি ধর্মীয় সম্প্রদায়ের উৎসবকে অন্য সম্প্রদায়ের মানুষের আনন্দের অংশ করে নিতে পারলে পারস্পরিক আস্থা বাড়বে এবং সামাজিক বিভাজন কমবে।
তিনি আরও বলেন, দুর্গোৎসবের সফল সমাপ্তি আমাদের সম্মিলিত প্রচেষ্টার ইতিবাচক দৃষ্টান্ত। এই সহযোগিতার ধারাবাহিকতা সারা বছর বজায় রাখতে হবে। ধর্মীয় উৎসবের বাইরেও নগরীর পরিচ্ছন্নতা, পরিবেশ সংরক্ষণ, জননিরাপত্তা এবং নাগরিক দায়িত্ব পালনে সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে। সিটি কর্পোরেশন ও নগরবাসীর মধ্যে অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় হলে চট্টগ্রামকে একটি শান্তি, সম্প্রীতি ও ভ্রাতৃত্বের নগরী হিসেবে গড়ে তোলা সম্ভব হবে।
অনুষ্ঠানে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের বিজয়া দশমীর শুভেচ্ছা জানিয়ে মেয়র বলেন, প্রতিমা বিসর্জনের মধ্য দিয়ে দুর্গোৎসবের আনুষ্ঠানিক পরিসমাপ্তি ঘটলেও সম্প্রীতি, সৌহার্দ্য ও মানবিকতার চর্চা অব্যাহত রাখতে হবে। সব ধর্মের মানুষের নিরাপদে ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান পালনের পরিবেশ নিশ্চিত করতে চট্টগ্রাম সিটি কর্পোরেশন ভবিষ্যতেও সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে সমন্বয় করে কাজ করবে।
অধ্যাপক অর্পন কান্তি ব্যানার্জীর সভাপতিত্বে বিসর্জন অনুষ্টানে স্বাগত বক্তব্য রাখেন মহানগর পূজা পরিষদের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট নিখিল কুমার নাথ। অনুষ্ঠান পরিচালনা করেন অঞ্জন দত্ত।
বক্তব্য রাখেন, ক্যাপ্টেন শামীম, ডা: নুরুল আবসার, বিপ্লব দে পার্থ, সৌরভ প্রিয় পাল, আশুতোষ দে, বিপ্লব সেন, সূজন কুমার শীল।
উপস্থিত ছিলেন রত্মাকর দাশ টুনু, শ্রী প্রকাশ দাশ অসিত, হিল্লোল সেন উজ্জ্বল, নটু চৌধুরী, সুকান্ত মহাজন টুটুল, প্রিয়তোষ ঘোষ রতন, প্রিয়তো বল, রিপন রায় চৌধুরী, অধ্যাপক অসীম দে, শ্যামল চৌধুরী, রাজন দাশ, অসিক দত্ত, চন্দন পালিত, অয়ন ধর, রাসেল দত্ত, উত্তম কুমার শীল, লিটন চৌধুরী, সৈকত মহাজন সাজু, সুজন কুমার শীল, সুজন শীল প্রমুখ।
চট্টগ্রামনিউজ/ এসডি/
