সৌদি আরবে হামলা এবং হরমুজ প্রণালিতে তেলবাহী জাহাজে আঘাতের ঘটনায় বিশ্বজুড়ে জ্বালানি তেলের সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার বড় ধরনের শঙ্কা তৈরি হয়েছে। এই অস্থির পরিস্থিতির প্রভাবে বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর, আন্তর্জাতিক বাজারে অপরিশোধিত তেলের দাম গত পাঁচ মাসের মধ্যে সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছেছে। প্রায় আট মাস আগে হরমুজ প্রণালিতে ইরানের কার্যত অবরোধের কারণে বৈশ্বিক জ্বালানি সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন দেখা দিয়েছিল। তখন আশঙ্কা করা হয়েছিল, এটি জ্বালানি বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ সংকট তৈরি করতে পারে। এর আগে চলতি বছরে মুনাফা অর্জনের যে পূর্বাভাস দিয়েছিল, তা থেকে সরে এসেছে প্রতিষ্ঠানটি।
বাজারে তেলের মানদণ্ড হিসেবে পরিচিত ব্রেন্ট ক্রুডের দাম ৩ শতাংশ বেড়ে বর্তমানে ব্যারেলপ্রতি ১১২ ডলারে লেনদেন হচ্ছে। গত ১৮ মে’র পর থেকে তেলের দাম এত উঁচুতে আর দেখা যায়নি। সংঘাতের তীব্রতা বাড়লে দাম আরও বৃদ্ধির আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। অঞ্চলটিতে সংঘাত আরও ছড়িয়ে পড়ার আশঙ্কা বাড়ছে।
বুধবার ইয়েমেনের হুথি বিদ্রোহীরা সৌদি আরবের একাধিক লক্ষ্যবস্তুতে হামলা চালায়। এর মধ্যে দাম্মামের একটি বেসামরিক বিমানবন্দরে হামলায় দুজন নিহত ও আটজন আহত হয়েছেন। পাশাপাশি, দেশটির একটি তেলক্ষেত্রে ড্রোন হামলায় আরও দুজন নিহত হওয়ার ঘটনা ঘটে।
অন্যদিকে, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কর্পস (আইআরজিসি) জানিয়েছে, বুধবার উত্তর উপসাগরীয় অঞ্চলে ‘অবৈধ’ তেল স্থানান্তরের সাথে জড়িত চারটি জাহাজে হামলা চালিয়ে আগুন ধরিয়ে দেওয়া হয়। ইরানি বাহিনী জাহাজগুলোকে অনুসরণ করার পরই এ হামলা চালানো হয় বলে দাবি তাদের।
আইআরজিসি আরও জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালির পশ্চিমে তিনটি জাহাজ মাইন বিস্ফোরণের কবলে পড়ে। একই সাথে যুক্তরাষ্ট্রকে হুঁশিয়ারি দিয়ে ইরান বলেছে, উসকানি অব্যাহত থাকলে মধ্যপ্রাচ্যে অবস্থিত মার্কিন ঘাঁটিগুলোর বিরুদ্ধে আরও বিস্তৃত সামরিক পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে।
এই উত্তেজনাপূর্ণ পরিস্থিতিতে সৌদি আরবে অবস্থিত বিভিন্ন কূটনৈতিক মিশন থেকে কূটনীতিক ও তাদের পরিবারের সদস্যদের সরে যাওয়ার নির্দেশ দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সৌদি রাষ্ট্রায়ত্ত তেল কোম্পানি আরামকো ধাহরানে তাদের সদর দপ্তরের কর্মীদের সরিয়ে নিয়ে দূর থেকে কাজ করার নির্দেশ দিয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যের আরও কয়েকটি মিশন থেকে কূটনীতিকদের পরিবারের সদস্যদের সরিয়ে নেওয়ার পরিকল্পনাও রয়েছে দেশটির।
উল্লেখ্য, গত এপ্রিলে সংঘাত চলাকালে তেলের দাম সর্বোচ্চ ১২৬ ডলারে উঠেছিল। মে মাসের শেষ দিকে তা ১০০ ডলারের নিচে নামলেও, জুলাইয়ের শুরুতে যুদ্ধবিরতির আশায় ব্যারেলপ্রতি ৭১ ডলারে নেমে আসে। তবে বর্তমানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যকার সমঝোতা ভেস্তে যাওয়া এবং নতুন করে সংঘাত শুরুর ফলে বাজার আবার অস্থির হয়ে উঠেছে। ইরানে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের হামলার পর সংঘাতের প্রথম কয়েক সপ্তাহে তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০ ডলার ছাড়িয়ে যায়। সে সময় হরমুজ প্রণালি দিয়ে তেল পরিবহন বন্ধ হয়ে যাওয়ায় বাজার বিশ্লেষকদের কেউ কেউ দাম ১৫০ ডলার পর্যন্ত ওঠার পূর্বাভাস দিয়েছিলেন।
এদিকে জ্বালানি তথ্যের যোগানদাতা প্রতিষ্ঠান কেপলারের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পারস্য উপসাগর থেকে তেল রপ্তানি বর্তমানে যুদ্ধ-পূর্ববর্তী পর্যায়ের চেয়েও বেশি। এর মূল কারণ হলো পাইপলাইনের মাধ্যমে স্থলপথে লোহিত সাগর ও ওমান উপসাগরীয় এলাকায় তেল পরিবহন বৃদ্ধি।
জ্বালানি তেলের অস্বাভাবিক মূল্যবৃদ্ধির কারণে ব্যবসায়িক লোকসানের আশঙ্কায় আছে সংশ্লিষ্ট কোম্পানিগুলো। পরিস্থিতির নেতিবাচক প্রভাবে এশিয়ার শেয়ার বাজারেও বড় দরপতন দেখা গেছে। জাপানের নিক্কেই ২২৫ সূচক ২ দশমিক ৭ শতাংশ, দক্ষিণ কোরিয়ার কোস্পি ৩ দশমিক ৫ শতাংশ এবং হংকংয়ের হ্যাং সেং সূচক ৩ শতাংশ পর্যন্ত নিচে নেমেছে।
The post আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দামে বড় উল্লম্ফন appeared first on Daily Sangbad Chorcha.
