অস্ত্রোপচার বা সার্জারির পর জ্ঞান ফেরার মুহূর্তটি অনেকের জন্যই বেশ যন্ত্রণাদায়ক। শরীরে কাটাছেঁড়ার ব্যথার পাশাপাশি যে সমস্যাটি রোগীদের সবচেয়ে বেশি কাবু করে তা হলো—তীব্র বমি বমি ভাব বা বমি হওয়া।
চিকিৎসাবিজ্ঞানের ভাষায় একে বলা হয় ‘পোস্ট-অপারেটিভ নসিয়া অ্যান্ড ভমিটিং’। অনেক সময় কড়া ডোজের ওষুধ দিয়েও এই বমি ভাব পুরোপুরি থামানো যায় না। তবে এবার এই সমস্যার এক অদ্ভুত ও সহজ সমাধান নিয়ে এসেছেন বিজ্ঞানীরা। কোনো তেতো ওষুধ বা ব্যয়বহুল ইনজেকশন নয়, অস্ত্রোপচারের সময় রোগীর কানে স্রেফ এক জোড়া নয়েজ-ক্যান্সেলিং হেডফোন পরিয়ে দিলেই ম্যাজিকের মতো কমে যায় এই বমি ভাব!
সাধারণত মানুষ ধারণা করেন, অ্যানেস্থেসিয়া বা অজ্ঞান করার অর্থ হলো মস্তিষ্কের মূল সুইচ একেবারে ‘অফ’ করে দেওয়া। কিন্তু হিউস্টনের বেলর কলেজ অব মেডিসিনের গবেষক ভিগি ক্যাটলোউইটজ জানাচ্ছেন ভিন্ন কথা। দশকের পর দশক ধরে চলা গবেষণা বলছে, অ্যানেস্থেসিয়া মোটেও ফ্যানের সুইচের মতো অফ বাটন নয়।
রোগী গভীর ঘুমে বা অবশ থাকলেও তার ব্রেন ঠিকই চারপাশের শব্দ ও আওয়াজ প্রসেস করতে থাকে। বিষয়টি অনেকটা চলন্ত বাসে ঘুমানোর মতো, যেখানে কন্ডাক্টর স্টপেজের নাম ডাকলেই যাত্রীর ঘুম ভেঙে যায়।
অস্ত্রোপচারের পর রোগীদের বমির এই যন্ত্রণা কমাতে সম্পূর্ণ প্রাকৃতিক ও সহজ কোনো উপায় বের করতে কাজ শুরু করেন চীনের সুচৌ ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট অ্যাফিলিয়েটেড হাসপাতালের গবেষক হুয়াইউ লিউ ও তাঁর গবেষক দল। সম্প্রতি সান দিয়েগোতে অনুষ্ঠিত অ্যানেসথেসিওলজি কনফারেন্সে তাঁরা তাদের এই যুগান্তকারী গবেষণার ফলাফল উপস্থাপন করেন।
গবেষণার অংশ হিসেবে ১৯২ জন নারী রোগীর ওপর পরীক্ষা চালানো হয়, যাদের সবারই সম্পূর্ণ অজ্ঞান করে বিশেষ ধরনের ‘কিহোল সার্জারি’ হওয়ার কথা ছিল। গবেষকরা রোগীদের দুটি দলে ভাগ করেন। এক দলকে অস্ত্রোপচারের শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কানে নয়েজ-ব্লকিং ইয়ার ডিফেন্ডার বা হেডফোন পরিয়ে রাখা হয় এবং অন্য দলকে তা দেওয়া হয়নি। তবে দুই দলকেই প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী সাধারণ অ্যানেস্থেসিয়া ও বমি রোধের স্ট্যান্ডার্ড ওষুধ দেওয়া হয়েছিল।
অস্ত্রোপচারের পর ৪৮ ঘণ্টা পার হওয়ার পর দেখা যায় দারুণ এক ফলাফল। যেসব রোগীকে হেডফোন পরানো হয়েছিল, তাদের মধ্যে মাত্র ৩৫ শতাংশের বমি বা বমি বমি ভাব দেখা দিয়েছে। অথচ যাদের কানে হেডফোন ছিল না, তাদের মধ্যে ৫২ শতাংশই বমির যন্ত্রণায় ভুগেছেন। শুধু তাই নয়, হেডফোন পরা রোগীদের যাদের সামান্য বমি ভাব হয়েছিল, তার মাত্রাও ছিল একদম নগণ্য।
ওটির হট্টগোল ও বমির সম্পর্ক: অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগতে পারে, অপারেশন থিয়েটার তো সাধারণত বেশ নিস্তব্ধ জায়গা। সেখানে আবার কিসের শব্দ? কিন্তু গবেষক লিউ মেপে দেখেছেন, একটি সাধারণ অপারেশন থিয়েটারে শব্দের মাত্রা থাকে প্রায় ৬৬ ডেসিবল, যা ড্রয়িংরুমে দুজন মানুষের স্বাভাবিক আলোচনার শব্দের সমান! সার্জনদের কথাবার্তা, ধাতব যন্ত্রপাতির ঠকঠক শব্দ আর লাইফ-সাপোর্ট মনিটরের বিপ-বিপ আওয়াজ মিলে সেখানে বেশ হট্টগোল চলে।
বিজ্ঞানীদের ধারণা, অজ্ঞান থাকা সত্ত্বেও এই বিকট যান্ত্রিক শব্দগুলো আমাদের স্নায়ুতন্ত্রের ওপর গভীর প্রভাব ফেলে। হঠাৎ তীব্র হর্ন শোনার পর যেমন বুকে ধক করে ওঠে, তেমনি অজ্ঞান অবস্থায় এই শব্দগুলো ব্রেনের ভেতর মানসিক চাপের সৃষ্টি করে। এই চাপ সরাসরি আমাদের স্বয়ংক্রিয় নার্ভাস সিস্টেমকে জাগিয়ে তোলে। যখন এই মানসিক চাপ মস্তিষ্কের ব্রেনস্টেমের সেই অংশগুলোতে আঘাত করে যা বমি নিয়ন্ত্রণ করে, ঠিক তখনই অপারেশন শেষে রোগীর বমি শুরু হয়।
যদিও হেডফোন পরলে ঠিক কোন বৈজ্ঞানিক প্রক্রিয়ায় এই বমি পুরোপুরি বন্ধ হয়, তা নিয়ে আরও কাজ চলছে এবং এটি বর্তমানে একটি শক্তিশালী অনুমান। তবে এই গবেষণা অজ্ঞান অবস্থায় মানব মস্তিষ্কের কার্যক্ষমতা সম্পর্কে এক নতুন দিগন্তের উন্মোচন করেছে। গবেষকদের আশা, অদূর ভবিষ্যতে হয়তো হাসপাতালগুলোর ওটিতে যাওয়ার আগে রোগীদের গাউনের পাশাপাশি এক জোড়া নয়েজ-ক্যান্সেলিং হেডফোনও দেওয়া হবে।
