Published on
:
4 min read
মৃত্তিকা ভট্টাচার্য
চড়কে মেলা বসবে সোজনা দিঘির পাড়ে। বুড়ো শিবের পুজো। ফাংশন আর যাত্রা হবে সারা রাত। মেলা একদিনই। চলবে রাতভর। কিন্তু যেতে চাইলে বাড়ির লোকে বলবে— ‘ওখানে আদিবাসী ছেলেমেয়েরা ভিড় করে। আর প্রেম-পিরিতি হলে, মনে ধরলে ওখান থেকে ধরে নিয়ে যায়, বে করবে বলে...’ তাই তো গাঁ-গঞ্জে এই মেলাকে ডাকে— ‘ধরাধরি মেলা’।
চৈত্রের পর আশ্বিন। দুর্গাপুজো হবে, আবার বসবে মেলা। সারা রাত। অল্পবয়সি ছেলেমেয়েদের ভিড় হবে। প্রেম হবে। আর তার পর... বিয়ে? কিন্তু তা কি সহজ? সব তো কমবয়সি ছেলে-ছোকরা। বয়স যে সেই সীমায় পৌঁছয়নি। কিন্তু মানবে কে? মানাবেই বা কে? বিয়েতে বাধা দিলে মান। পালিয়ে যাওয়ার চিন্তা কখনও আবার মরে যাওয়ার! আবার কখনও একত্রবাস। তার পরে অপ্রাপ্তবয়সের সন্তান।
শিশু অধিকার অ্যাক্টিভিস্ট ভুবন রিভু তাঁর ‘হোয়েন চিল্ড্রেন হ্যাভ চিল্ড্রেন’ বইটিতে হদিশ দিয়েছেন অপ্রাপ্তবয়সে গর্ভধারণ বা টিনএজ প্রেগন্যান্সির ভয়াবহতার। ভারতের নানা প্রান্তে বাল্যবিবাহ ও টিনএজ প্রেগন্যান্সির বাস্তব ছবি দেখিয়েছেন। দুর্ভাগ্যজনক হলেও যার কোনওটাতেই খুব একটা পিছিয়ে নেই পশ্চিমবঙ্গ। এনএফএইচএস ৬-এর তথ্য বলছে— ভারতে যেখানে বাল্যবিবাহের হার ২০.১ শতাংশ, পশ্চিমবঙ্গে সেই হার ৩৪.৪ এবং বাল্যমাতৃত্বের হার ১৬.৬ শতাংশ। রাজ্যে পালাবদলের পরে বাল্যবিবাহ নিয়ে তৎপরতা দেখাতে শুরু করেছে নতুন সরকার। আর এই আবহেই মালদা জেলার সেই ইস্যু পুরোনো হলেও হয়ে উঠেছে প্রাসঙ্গিক। বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তে জনজাতি গোষ্ঠীগুলির মধ্যে ‘ফ্রি মিক্সিং’ খুবই পরিচিত একটি কালচার, যা তথাকথিত মধ্যবিত্ত এবং রক্ষণশীল সমাজের সঙ্গে ঠিক খাপ খায় না। তবে বাল্যবিবাহ ও কিশোরী মাতৃত্বের এই ইস্যুগুলি নিয়ে সচেতন মহল বিশেষত স্বেচ্ছাসেবী দলগুলি বরাবরই উদ্বিগ্ন।
কিন্তু এ সমস্যা যে শুধু জনজাতির, তা নয়। এই দুই মেলায় স্থানীয় বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মানুষ ভিড় জমান। কিন্তু গাজল, হবিবপুর, বামনগোলা — মালদার এই ব্লকগুলি জনজাতি বহুল। তাই স্থানীয় মেলায় স্থানীয়ের ভিড়টাই বেশি। তবে এ ক্ষেত্রে অন্য সম্প্রদায়ের থেকে জনজাতিকে যেটি ভিন্ন করে, তা প্রশাসনিক পরিকাঠামো।
আদিবাসী সম্প্রদায় কোনও সমস্যা, সমাধান বা মতামত নিতে প্রথমে যায় তাদের কমিউনিটির নেতাদের কাছে। তার পর আসে প্রশাসন। কিন্তু বিধান দেবেন যে নেতারা, তাঁদের প্রশিক্ষণ দেওয়া তো সরকারি কর্তব্য। কিন্তু বছরের পর বছর ধরে বন্ধ রয়েছে সেই উদ্যোগ।
আসা যাক দুই মেলার কথায়। মালদার হবিবপুরে চড়ক উপলক্ষে বসে সোজনা দিঘির মেলা। আর পাঁচটা গ্রামীণ আদিবাসী মেলার মতো তার বহর হলেও প্রবল জনপ্রিয়। রাজ্য পেরিয়ে ঝাড়খণ্ড থেকে আসা আদিবাসীরা সেখানে ভিড় জমায়। সারা দিন ভালোই ভিড়ভাট্টা থাকে আট থেকে আশির। কিন্তু যাত্রাপালা, অর্কেস্ট্রা— মেলা আয়োজকরা কোনও কোনও অছিলায় সেটা টেনে নিয়ে যান রাতভর। প্রশাসনের খাতায় কলমে সেখানে সারা রাত মেলা চলার ‘নিয়ম’ না থাকলেও বছরের পর বছর এমনটাই চলে সোজনা দিঘিতে। আর সচেতন মহলের এই উদ্বেগের বিষয়টাই কমবয়সি ছেলেমেয়েদের কাছে হয়ে ওঠে আকর্ষণের।
রাত বাড়ে। মেলার আবহ বদলায়। নিরাপত্তা যা থাকে, তা বিশেষ চোখে পড়ে না। তখন কি আর ফাংশনে মন টেকে? সোজনা দিঘির মেলাটা যেখানে হয়, তার পাশে ধু-ধু মাঠ। ফাঁকা, অন্ধকার। জনবসতি বেশ খানিকটা দূরে। অত রাতে মেলা থেকে বেরিয়ে ফাঁকা জমির আলে বসে গল্পে মাতে তারা। মেলা-মাঠ ছেড়ে জমির মাঠে ভিড় জমে। স্বাভাবিক ভাবে প্রশ্নটা উঠেই যায় — এমন পরিবেশে দুর্ঘটনা ঘটতে কতক্ষণ?
উত্তর দিনাজপুরের ইটাহারেও মেলা বসে। একবার তখন প্রায় অনেকটা রাত, সেই মেলা থেকে ফিরছিল মেয়েটি। কিন্তু ওই নারীশরীরকে শুধু মাংসপিণ্ড ভেবে ছিঁড়ে খেল একদল। ঘটনা নিয়ে রীতিমতো হইচই পড়ল। তার পর প্রশাসন নিয়ম করল— বাড়ি ফিরতে হলে রাত ন’টার মধ্যে বেরোতে হবে। কিন্তু ঘড়ির কাঁটা ন’টা পেরোলেই আর কাউকে বেরোতে দেওয়া হবে না। সারা রাত পুলিশ থাকবে পাহারায়। হবিবপুরের মেলাগুলোয় তেমন কোনও ব্যবস্থা নেই। দুর্ঘটনা হলে তবেই কি সরকারের হুঁশ ফিরবে? জানা নেই। সেই সব মেলার রাতে প্রেম হলে মেয়েটিকে সঙ্গে করে গ্রামে নিয়ে যাওয়ার চল রয়েছে। বিয়ে তো হয়নি, ঘরে তুলতে পারবে না। মেয়েটিকে রাখা হয় মোড়লের বাড়ি। তার পরে ছেলে-মেয়ের দুই পরিবার একসঙ্গে বসে সিদ্ধান্ত হবে। গ্রামের মোড়ল, পাঁচজন কমিউনিটি লিডার নিয়ে বসল সভা। সচেতনতা ও শিক্ষাই এখানে ব্যবধান তৈরি করে সিদ্ধান্তে।
বয়স আঠারোয় না পৌঁছলে সেখানেই আপত্তি তোলেন কমিউনিটি লিডার। কোনও সময়ে অভিভাবকও। সেই সিদ্ধান্ত মানলে সেখানেই মিটল সমস্যা। কিন্তু না-মিটলে? এখানে একটা বড় ভূমিকা কমিউনিটি লিডারদের। স্বেচ্ছাসেবী সংগঠনগুলোও স্থানীয় বাসিন্দাদের নিয়ে কাজ করছে দীর্ঘদিন ধরে। তবে আগেই বলছিলাম, জনজাতির লোকেরা সমস্যা মেটাতে কমিউনিটি লিডার বা গ্রামের প্রধান অথবা মোড়লের কাছেই আগে যায়। পরে আসে প্রশাসন। বিভিন্ন জনজাতির এমন অনেক সব ট্র্যাডিশন নিয়ে কাজ করা প্রশাসনের কাছে বরাবরই একটা চ্যালেঞ্জ। জাতিগত ভাবাবেগে আঘাত লাগার একটা ভয়ও আছে।
বাল্যবিবাহ, কিশোর বয়সে গর্ভধারণের মতো ইস্যুগুলি নিয়ে আদিবাসী গোষ্ঠীগুলির মধ্যে প্রশিক্ষণ দেওয়ার কাজ শুরু করেছিল সরকার। ২০১৯-এ রাজ্যজুড়ে আদিবাসী কমিউনিটি লিডারদের ট্রেনিং দেওয়ার একটা প্রজেক্ট চালু হয়েছিল। চলেছিল কিছু দিন। কিন্তু তার পরে কোভিড অতিমারী। আর চালু হয়নি সেই প্রকল্প। পালাবদলের পরেও দৃশ্যটাও একই।
মেলা থেকে পছন্দ করে বছর পনেরোর মেয়েটাকে এনেছিল এক কিশোর। হয়তো বাড়ির মতেই তাকে নিয়ে ঘর বাঁধল তারা। পরিবার, বড়জোর পাড়া প্রতিবেশীরা জানল। কিশোর বয়সের সংসারে সন্তানও এল। এক অপ্রাপ্তবয়সের যুগলের বিয়ে পরবর্তী জীবনে তাদের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যে কতটা ক্ষতি করতে পারে, তা সর্বজনবিদিত। কনসেন্ট-এর সুস্পষ্ট ধারণার অভাব, গার্হস্থ্য হিংসা-সহ অপরিণত চিন্তা ভাবনার জন্য তৈরি হওয়া এমন নানা পরিস্থিতি ক্ষতি করছে। তার উপরে সন্তান!
শুধু সচেতনতা বাড়ানোর চেষ্টার মাধ্যমে পরিস্থিতি সামাল দিতে পেরে উঠছে না স্বেচ্ছাসেবী সংস্থাগুলো। তারা চাইছে জনজাতির এই ইস্যুগুলোয় প্রশাসনিক পদক্ষেপ। চাইছে, স্পর্শকাতর ইস্যুগুলি সামাল দিতে আদিবাসী গোষ্ঠীর নেতা, প্রধানদের প্রশিক্ষণ দেওয়া শুরু হোক সরকারি তরফে। তাই তারা চাইছে— ‘ধরাধরি’ মেলায় থাকুক পাহারা। রাতে মেলা চলা বন্ধ করুক বা নিয়ম জারি করুক ইটাহারের মতো। তাই আপাতত সরকারের হস্তক্ষেপের দিকে তাকিয়ে এলাকার সচেতন মহল।
