মাত্র দুই শতক জমির ওপর টিনের চালা দেওয়া ছোট্ট একটি বাড়ি। সেই বাড়িতেই স্ত্রী ও দুই মেয়েকে নিয়ে ছিল মিজানুর রহমানের (৪৮) সংসার। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষটিকে হারিয়ে এখন দিশাহারা তাঁর স্বজনেরা। স্বামীর মৃত্যুর শোক সইতে না পেরে বারবার কান্নায় ভেঙে পড়ছিলেন স্ত্রী মরিয়ম। একপর্যায়ে তিনি মূর্ছাও যাচ্ছিলেন। অন্যদিকে, বড় মেয়ে মিতালী স্বামী পরিত্যক্তা। এমন পরিস্থিতিতে পরিবারটির ভবিষ্যৎ নিয়ে দেখা দিয়েছে গভীর অনিশ্চয়তা।
শনিবার (২৪ অক্টোবর) দুপুরে রংপুরের তারাগঞ্জ উপজেলার হাড়িয়ারকুঠি ইউনিয়নের প্রামাণিকপাড়া মোড়ে মোটরসাইকেলের ধাক্কায় গুরুতর আহত হন মিজানুর রহমান। পরে তাঁকে উদ্ধার করে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হলে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তাঁর মৃত্যু হয়। একই দুর্ঘটনায় গুরুতর আহত হন পরিবার পরিকল্পনা পরিদর্শক রেজাউল করিম।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, শনিবার দুপুর আনুমানিক ২টার দিকে হাতিবান্ধার হাটসংলগ্ন স্বাস্থ্যকেন্দ্র থেকে মোটরসাইকেলে ডাঙ্গীরহাটের দিকে যাচ্ছিলেন রেজাউল করিম। পথে প্রামাণিকপাড়া মোড়ে মোড় নেওয়ার সময় মোটরসাইকেলটি পাশের একটি দোকানে বসে থাকা মিজানুরকে ধাক্কা দেয়। এতে তিনি সড়কে ছিটকে পড়ে অচেতন হয়ে যান। তাঁর কান দিয়ে রক্তক্ষরণ হচ্ছিল বলে জানান প্রত্যক্ষদর্শীরা।
পরে স্থানীয় লোকজন দুজনকে উদ্ধার করে দ্রুত রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মিজানুরের মৃত্যু হয় বলে নিশ্চিত করেন স্থানীয় বাসিন্দা শফিকুল ইসলাম। তিনি হাসপাতালে রোগীর সঙ্গে ছিলেন।
মিজানুরের পরিবারে রয়েছেন স্ত্রী মরিয়ম এবং দুই মেয়ে—বড় মিতালী (২০) ও ছোট মদিনা (১৭)। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম ব্যক্তির মৃত্যুতে তাঁদের জীবনযাপনের অবলম্বনটুকুও যেন হারিয়ে গেল। মাত্র দুই শতক জমির ওপর টিনের চালা দেওয়া একটি বাড়ি ছাড়া তাঁদের আর কী সম্পদ রয়েছে, তা-ও এখন বড় প্রশ্ন।
স্বামীর মরদেহ ঘিরে মরিয়মের কান্না আর আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। শোকের মধ্যে বারবার মূর্ছা যাওয়ার উপক্রম হচ্ছিল তাঁর। একদিকে স্বামী হারানোর অসহনীয় বেদনা, অন্যদিকে সংসার চালানোর দুশ্চিন্তা—সব মিলিয়ে পরিবারটির সামনে এখন কঠিন বাস্তবতা।
বিশেষ করে বড় মেয়ে মিতালী স্বামী পরিত্যক্তা হওয়ায় পরিবারের ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ আরও বেড়েছে। ছোট মেয়েটির জীবনও এখন অনিশ্চয়তার মুখে। যে মানুষটি পরিবারের ভরণপোষণের দায়িত্ব পালন করতেন, তাঁর আকস্মিক মৃত্যুতে সংসারটির সামনে তৈরি হয়েছে নতুন সংকট।
একটি সড়ক দুর্ঘটনা কেড়ে নিল একজন মানুষের প্রাণ; একই সঙ্গে অনিশ্চয়তায় ফেলে দিল তাঁর ওপর নির্ভরশীল পরিবারকে। এই শোক কাটিয়ে পরিবারটি কীভাবে ঘুরে দাঁড়াবে, কীভাবে চলবে তাদের সংসার—এখন সেই প্রশ্নই বড় হয়ে দেখা দিয়েছে।
এ অবস্থায় শোকাহত পরিবারটির পাশে দাঁড়াতে স্থানীয় জনপ্রতিনিধি, প্রশাসন ও সমাজের সামর্থ্যবান ব্যক্তিদের সহযোগিতা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
