আজকাল ওয়েবডেস্ক: যে মেয়ের মুখে লেগে থাকত হাসি, যিনি নিজের জীবনের ছোট ছোট আনন্দের মুহূর্ত ভাগ করে নিতেন সমাজমাধ্যমে, সেই স্নেহা চক্রবর্তীর অকালমৃত্যু যেন কিছুতেই মেনে নিতে পারছে না মেদিনীপুর। ভালবেসে বিয়ে, নতুন সংসার, ভবিষ্যৎ নিয়ে একরাশ স্বপ্ন সবকিছু থেমে গেল মাত্র ২৫ বছর বয়সে!
শ্বশুরবাড়ি থেকে তরুণী গৃহবধূর দেহ উদ্ধারের ঘটনায় উঠেছে পণের দাবিতে নির্যাতন এবং খুনের অভিযোগ। স্বামী ও শ্বশুর গ্রেপ্তার হলেও মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত কারণ জানতে এবং দোষীদের কঠোরতম শাস্তির দাবিতে সরব স্নেহার পরিবার। মঙ্গলবার সন্ধ্যায় সেই দাবিতেই মোমবাতি হাতে পথে নামলেন স্নেহার বাবা-মা, বন্ধু, প্রতিবেশী ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
মঙ্গলবার সন্ধ্যায় মেদিনীপুর শহরের বিধাননগর মাঠ থেকে শুরু হয় মৌন মিছিল। হাতে জ্বলন্ত মোমবাতি নিয়ে শহরের বিভিন্ন রাস্তা পরিক্রমা করেন স্নেহার পরিচিতজনেরা। সেই মিছিলে সামিল হন তাঁর শোকস্তব্ধ বাবা ধ্রুব চক্রবর্তী এবং মা-ও। মিছিলের উদ্দেশ্য ছিল স্নেহার স্মৃতির প্রতি শ্রদ্ধা জানানো এবং তাঁর অস্বাভাবিক মৃত্যুর নিরপেক্ষ তদন্তের দাবি তোলা। অংশগ্রহণকারীদের বক্তব্য, এই মৃত্যুর পিছনে কোনও অপরাধ ঘটে থাকলে তদন্তের মাধ্যমে প্রত্যেক অপরাধীকে চিহ্নিত করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
মেদিনীপুর শহরের ডাকবাংলা রোডের বাসিন্দা স্নেহা চক্রবর্তীর সঙ্গে যমুনাবালির রণদীপ জানার দীর্ঘদিনের প্রেমের সম্পর্ক ছিল। ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে বিয়ে হয় তাঁদের। কিন্তু বিয়ের এক বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ঘটে যায় মর্মান্তিক ঘটনা। গত বৃহস্পতিবার, ৮ অক্টোবর, মেদিনীপুর সদর ব্লকের যমুনাবালিতে শ্বশুরবাড়ি থেকে স্নেহার দেহ উদ্ধার করে পুলিশ। শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের দাবি, আত্মহত্যা করেছেন স্নেহা। যদিও সেই বক্তব্য মানতে নারাজ তাঁর বাপের বাড়ির লোকজন।
স্নেহার বাবা ধ্রুব চক্রবর্তী কলকাতা পুলিশের কর্মী। তাঁর অভিযোগ, বিয়ের পর থেকেই মেয়েকে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হতে হচ্ছিল। মেয়েকে খুন করা হয়েছে বলেও অভিযোগ তুলেছেন তিনি। স্নেহার বাবার অভিযোগ, বিএমডব্লিউ কেনার জন্য বাপের বাড়ি থেকে দশ লক্ষ টাকা আনতে মেয়ের উপর চাপ সৃষ্টি করা হচ্ছিল। এই বিষয়টি নিয়েই স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে বারবার অশান্তি হত বলে পরিবারের দাবি।
পরিবারের বক্তব্য, স্নেহা ওই কেনাকাটার বিরোধিতা করেছিলেন। অভিযোগ, মৃত্যুর আগের দিন বুধবার বিএমডব্লিউ কিনে আনেন রণদীপ। তার পরদিনই শ্বশুরবাড়ি থেকে উদ্ধার হয় স্নেহার দেহ। এই ঘটনাক্রম ঘিরে একাধিক প্রশ্ন তুলেছেন স্নেহার বাবা। মেদিনীপুর কোতোয়ালি থানায় অভিযোগ দায়ের করেন তিনি। অভিযোগের ভিত্তিতে স্নেহার স্বামী রণদীপ জানা এবং তাঁর বাবা রতন জানাকে গ্রেপ্তার করে পুলিশ।
তবে অর্থ দাবির অভিযোগ, নির্যাতন এবং স্নেহার মৃত্যুর মধ্যে কোনও যোগ রয়েছে কি না, তা তদন্তসাপেক্ষ। মৃত্যুর প্রকৃত কারণও তদন্তের মাধ্যমেই নিশ্চিত হওয়া প্রয়োজন।
শুধু পরিবারের কাছেই নয়, কর্মস্থলেও অত্যন্ত পরিচিত মুখ ছিলেন স্নেহা। কলকাতার একটি প্রতিষ্ঠান থেকে হাসপাতাল ম্যানেজমেন্ট নিয়ে পড়াশোনা শেষ করে মেদিনীপুর শহরের স্পন্দন হাসপাতালে চাকরিতে যোগ দিয়েছিলেন তিনি। সেখানে মানবসম্পদ বা এইচআর বিভাগে কর্মরত ছিলেন। মিষ্টি ব্যবহার এবং হাসিখুশি স্বভাবের জন্য সহকর্মীদের কাছে প্রিয় ছিলেন স্নেহা। তাঁর এমন আকস্মিক মৃত্যুতে শোকের ছায়া নেমে এসেছে কর্মস্থলেও।
সমাজমাধ্যমেও যথেষ্ট সক্রিয় ছিলেন তরুণী। ছবি পোস্ট করা, রিল তৈরি করা কিংবা জীবনের স্মরণীয় মুহূর্ত বন্ধুদের সঙ্গে ভাগ করে নেওয়া ছিল তাঁর পছন্দের। নিজের বিয়ের মেহেন্দি থেকে সিঁদুরদানের বিশেষ মুহূর্তও ফেসবুকে তুলে ধরেছিলেন স্নেহা। তাঁর ফেসবুকের কভার ছবিতে এখনও রয়ে গিয়েছে স্বামীর সঙ্গে কাটানো সুখের মুহূর্তের স্মৃতি। সেই ছবি দেখেই আবেগপ্রবণ হয়ে পড়ছেন পরিচিতজনেরা। অনেকেই সমাজমাধ্যমে স্নেহার মৃত্যুর তদন্ত এবং সুবিচারের দাবিতে সরব হয়েছেন।
স্নেহার অস্বাভাবিক মৃত্যুর প্রভাব পড়েছে তাঁর বাপের বাড়ি সংলগ্ন ডাকবাংলা রোডের দুর্গাপুজোতেও। ২০২২ সালে শুরু হওয়া ডাকবাংলা রোড সর্বজনীন দুর্গাপুজো এ বছর পঞ্চম বর্ষে পা দিয়েছে। কিন্তু এলাকার মেয়ের মৃত্যুতে পুজোর জাঁকজমক কমিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন উদ্যোক্তারা। পুজো কমিটির কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এ বছর নিয়ম মেনে দেবীর পুজো এবং চণ্ডীপাঠ হবে। তবে বন্ধ রাখা হয়েছে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। প্রতিবছর চতুর্থী থেকে পুজোর দিনগুলিতে সন্ধ্যায় সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হত। এলাকার শিশু থেকে বড়রা তাতে অংশ নিতেন। পুজোর তিন দিন থাকত খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থাও। কিন্তু এ বছর সেই আয়োজন বাতিল করা হয়েছে।
বাজবে না মাইকও। শুধু আলো জ্বলবে, নিয়ম মেনে হবে দেবীর আরাধনা। এলাকার মানুষের কাছে এ যেন আনন্দের উৎসবের মধ্যেও প্রিয়জন হারানোর গভীর শোক। মেয়েকে হারিয়ে ভেঙে পড়েছেন ধ্রুব চক্রবর্তী। তাঁর অভিযোগ, স্নেহা আত্মহত্যা করার মতো মেয়ে ছিলেন না। মেয়েকে খুন করা হয়েছে বলেই তাঁর সন্দেহ। ঘটনার পূর্ণাঙ্গ তদন্ত এবং দোষীদের কঠোর শাস্তি চান তিনি।
মুখ্যমন্ত্রীর কাছেও সুবিচারের আবেদন জানিয়েছেন স্নেহার বাবা। তাঁর বক্তব্য, বহু মানুষ এই কঠিন সময়ে পরিবারের পাশে দাঁড়িয়েছেন। তিনি আশা করছেন, তদন্তে মেয়ের মৃত্যুর প্রকৃত সত্য সামনে আসবে। মঙ্গলবারের মোমবাতি মিছিলেও উঠে এল সেই একই দাবি। শোকের সঙ্গে মিশে থাকা ক্ষোভ নিয়ে পথে নামলেন স্নেহার আপনজনেরা।
স্নেহার মৃত্যু আত্মহত্যা, খুন, না কি অন্য কোনও কারণে তার চূড়ান্ত উত্তর এখনও তদন্তের অপেক্ষায়। অভিযোগের সত্যতা বিচারেও এখনও প্রতিষ্ঠিত হয়নি। তবে মেয়েকে হারানো বাবা-মায়ের একটাই আকুতি, সত্য সামনে আসুক, অপরাধ প্রমাণিত হলে দোষীরা কঠোর শাস্তি পাক। মোমবাতির আলো নিভে যাবে, মিছিলও শেষ হবে। কিন্তু স্নেহার মৃত্যু ঘিরে যে প্রশ্নগুলি উঠেছে, সেগুলির উত্তর না মেলা পর্যন্ত সুবিচারের দাবি যে থামবে না, মঙ্গলবারের মৌন মিছিল থেকে সেই বার্তাই দিলেন তাঁর পরিবার, বন্ধু ও শুভাকাঙ্ক্ষীরা।
