রংপুর: সনাতন ধর্মাবলম্বীদের প্রধান ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গোৎসব উপলক্ষ্যে আজ মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) রংপুর আনছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সফরকালে তিনি নগরীর স্টেশন রোড এলাকার ঐতিহাসিক ধর্মসভা রাধা গোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করবেন এবং সনাতন ধর্মাবলম্বীদের নেতাদের সঙ্গে মতবিনিময় ও শুভেচ্ছা বিনিময় করবেন।
জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, মঙ্গলবার বেলা ১১টায় প্রধানমন্ত্রীর রংপুরে পৌঁছানোর কথা রয়েছে। তার এই সফর ঘিরে নগরজুড়ে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা বিরাজ করছে এবং সার্বিক নিরাপত্তা-ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে।
জেলা প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী সূত্রে জানা গেছে, সফর ঘিরে রংপুরজুড়ে চার স্তরের সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। বিশেষ নিরাপত্তা বাহিনী (এসএসএফ), পুলিশ, র্যাব ও আনসার বাহিনীর পাশাপাশি মণ্ডপগুলোতে নিয়োজিত রাখা হয়েছে স্বেচ্ছাসেবক দল। নগরীর প্রবেশপথগুলোতে বসানো হয়েছে অতিরিক্ত চেকপোস্ট। এসএসএফ ও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা এলাকায় নিরাপত্তা তদারকি করছেন। এরই মধ্যে এসএসএফের নেতৃত্বে এসআরবি ও পুলিশের যৌথ মহড়া অনুষ্ঠিত হয়েছে। মন্দির এলাকায় সিসি ক্যামেরা স্থাপনসহ নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে।
প্রধানমন্ত্রীর আগমনকে কেন্দ্র করে স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের পাশাপাশি বিএনপি ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা গেছে। রাজধানী ঢাকার বাইরে গিয়ে রংপুরে সরকারপ্রধানের দুর্গাপূজার মণ্ডপ পরিদর্শনের সিদ্ধান্তকে স্থানীয় বাসিন্দারা সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক দৃষ্টান্ত হিসেবে দেখছেন।
শ্রী শ্রী কালীবাড়ী মন্দিরে দুর্গোৎসবে আসা জীবন ঘোষ বলেন, ‘আমরা যা ভাবিনি, প্রধানমন্ত্রী তা-ই করতে যাচ্ছেন। তিনি রংপুরে আসবেন, আমাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করবেন, মণ্ডপ পরিদর্শন করবেন-এটা নিশ্চয়ই আনন্দের। তকে কাছ থেকে দেখার জন্য আমার মতো অনেকেই অপেক্ষা করছেন। আমরা চাই, তার এই সফর সফল, আনন্দময় ও সম্প্রীতির হোক।’
রাধা গোবিন্দ মন্দিরের সভাপতি পার্থ বোস বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী রংপুরের একটি মন্দিরে আসছেন, এ জন্য আমরা অত্যন্ত আনন্দিত। প্রত্যন্ত অঞ্চলে কীভাবে শারদীয় উৎসব পালন করা হয়, তিনি তা সরেজমিনে দেখবেন। আমাদের সঙ্গে কুশল বিনিময় করবেন, এটি আমাদের এবং ভক্তদের জন্য পরম পাওয়া। এটি সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির একটি উজ্জ্বল উদাহরণ হিসেবে থাকবে বলে আমরা মনে করি।’
রাধাগোবিন্দ মন্দির কমিটির সাধারণ সম্পাদক খোকন সরকার বলেন, ‘স্বাধীনতার পর এই প্রথম কোনো প্রধানমন্ত্রী দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে রংপুরে আসছেন। তারেক রহমানকে স্বাগত জানাতে হিন্দু সম্প্রদায়ের মানুষ মুখিয়ে আছেন।’
নগরজুড়ে সাজসাজ রব ও পরিচ্ছন্নতা অভিযান
সরেজমিনে দেখা যায়, প্রধানমন্ত্রীর আগমন ঘিরে নগরজুড়ে সাজসাজ অবস্থা বিরাজ করছে। সিটি করপোরেশনের উদ্যোগে সড়ক ও রোড ডিভাইডারগুলো ধুয়ে-মুছে রং করা হয়েছে। ডিভাইডারে লাগানো হচ্ছে ছোট ছোট ফুলের গাছ। এরই মধ্যে নগরীর প্রধান সড়কের ফুটপাত দখলমুক্ত করে পরিষ্কার করা হয়েছে। কাছারি বাজারসহ বিভিন্ন এলাকায় ফুটপাত দখল করে গড়ে তোলা দোকানপাট ও অন্যান্য স্থাপনা বুলডোজার দিয়ে ভেঙে দেওয়া হয়েছে। নগরীর বিলবোর্ডে শোভা পাচ্ছে সিটি করপোরেশন, রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, শারদীয় দুর্গোৎসব কমিটি, সাংস্কৃতিক ঐক্য পরিষদ এবং রংপুর জেলা ও মহানগর বিএনপির পক্ষ থেকে শুভেচ্ছা জানানো বিশাল বিশাল ব্যানার।
প্রধানমন্ত্রীর যাতায়াতের জন্য নির্ধারিত সড়কগুলোতে সংস্কারকাজ চলছে। বিশেষ করে নগরীর ডিসির মোড় থেকে চেকপোস্ট পর্যন্ত চলমান সংস্কারকাজ দ্রুতগতিতে সম্পন্ন করা হচ্ছে। এসব কাজের তদারকি করছেন সিটি করপোরেশনের প্রশাসক অ্যাডভোকেট মাহফুজ উন-নবী চৌধুরী ডন।
এদিকে, প্রধানমন্ত্রী আকস্মিকভাবে রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালসহ অন্য কোনো স্থান পরিদর্শন করতে পারেন-এমন আশঙ্কায় হাসপাতালে রাতভর ধোয়ামোছা ও রোগীদের বাড়তি সেবা দেওয়া হচ্ছে। বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষও ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছে বলে জানা গেছে।
রংপুর মহানগর ও জেলা বিএনপির পাশাপাশি যুবদল, স্বেচ্ছাসেবক দল, ছাত্রদল, মহিলা দল, কৃষক দল, তাঁতি দল, মৎস্যজীবী দল, ওলামা দল, জিয়া সংসদসহ বিভিন্ন অঙ্গ ও সহযোগী সংগঠনের নেতাকর্মীরা প্রধানমন্ত্রীর সফর সফল করতে ব্যাপক প্রস্তুতি নিয়েছেন।
জেলা প্রশাসক ইসরাত জাহান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী রংপুরের রাধা গোবিন্দ মন্দিরের পূজামণ্ডপ পরিদর্শনের পাশাপাশি হিন্দু সম্প্রদায়ের ভক্তদের সঙ্গে শারদীয় দুর্গোৎসবের শুভেচ্ছা ও কুশল বিনিময় করবেন। তার সফর ঘিরে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সর্বোচ্চ প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।’ মহানগর বিএনপির সদস্যসচিব ও রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক মাহফুজ উন-নবী চৌধুরী ডন বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রীর সফর ঘিরে মানুষের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা দেখা দিয়েছে। বিশেষ করে হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের মধ্যে ব্যাপক উৎসাহ লক্ষ্য করা যাচ্ছে। আমরাও আনন্দিত। সম্প্রীতির বার্তা নিয়ে তিনি শারদীয় উৎসবে পূজামণ্ডপ পরিদর্শনে রংপুরে আসছেন।’ তিনি আরও বলেন, ‘সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী রংপুরের উন্নয়নে ১ হাজার ৮০০ কোটি টাকার দুটি প্রকল্পের অনুমোদন দিয়েছেন। পাশাপাশি রংপুর জেলার ছয়টি সংসদীয় আসনে আরও ১২৭ কোটি টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। ভবিষ্যতের জন্য অনেক পরিকল্পনা রয়েছে, যা বাস্তবায়িত হলে এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের বঞ্চনার অবসান ঘটবে, ইনশাআল্লাহ।’
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের সূত্রে প্রকাশিত সফরসূচি অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকালে সামরিক বিমানযোগে ঢাকার তেজগাঁও বিমানবন্দর থেকে নীলফামারীর সৈয়দপুর বিমানবন্দরে পৌঁছাবেন প্রধানমন্ত্রী। সেখান থেকে সড়কপথে বেলা ১১টার দিকে রংপুর নগরীর রাধা গোবিন্দ মন্দির (ধর্মসভা) পরিদর্শন করবেন। পরে তিনি সৈয়দপুর বিমানবন্দর হয়ে রাজশাহী ও চট্টগ্রামের উদ্দেশে রওনা দেবেন।
