মানিকগঞ্জের সাটুরিয়া উপজেলার দরগ্রাম ইউনিয়ন ভূমি অফিসের উপসহকারী ভূমি কর্মকর্তা (নায়েব) আব্দুল মোতালেবের বিরুদ্ধে ঘুষ নেওয়ার অভিযোগের সত্যতা পাওয়া গেছে। এ বিষয়ে তদন্ত প্রতিবেদনও জমা দিয়েছে কমিটি। তারপরও তাঁর বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
গত ১১ সেপ্টেম্বর ‘ঘুষের রেট ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ, টাকা ছাড়া কাজ করেন না ভূমি কর্মকর্তা’ শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। এতে নামজারিসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা দেওয়ার ক্ষেত্রে ২০ হাজার থেকে দেড় লাখ টাকা পর্যন্ত ঘুষ নেওয়ার অভিযোগ উঠে আসে। পাশাপাশি অফিসে বসে টাকা গোনার একটি ভিডিও প্রকাশিত হলে বিষয়টি নিয়ে আলোচনা শুরু হয়।
সংবাদ প্রকাশের পর অভিযোগ তদন্তে কমিটি গঠন করে জেলা প্রশাসন। তদন্তের দায়িত্ব দেওয়া হয় সাটুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) কাজী মোহাম্মদ অনিক ইসলামকে। তাঁকে সাত কর্মদিবসের মধ্যে প্রতিবেদন জমা দিতে নির্দেশ দেওয়া হয়।
গত ২৩ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত শুনানিতে অভিযোগকারী, সাংবাদিক ও অভিযুক্ত নায়েবের লিখিত বক্তব্য নেওয়া হয়। সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, শুনানিতে ঘুষ নেওয়ার বিষয়টি স্বীকার করেন আব্দুল মোতালেব। পরে জেলা প্রশাসনের কাছে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেন ইউএনও। তবে প্রতিবেদনে কী সুপারিশ করা হয়েছে, তা জানা যায়নি। তবে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেওয়ার পরও আব্দুল মোতালেবের বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি।
খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, আব্দুল মোতালেবের চাকরির মেয়াদ রয়েছে আর মাত্র দুই মাস। এরই মধ্যে তিনি স্বেচ্ছায় অবসরে যাওয়ার আবেদন করেছেন। অভিযোগের নিষ্পত্তি ও বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়ার আগেই তাঁর অবসরের আবেদন সামনে আসায় শাস্তি এড়ানোর আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্টরা।
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আব্দুল মোতালেব বলেন, ‘আমার চাকরির আর মাত্র কয়েক মাস সময় আছে। আমি চাকরি থেকে স্বেচ্ছায় অবসর নেব। ওই নিউজে আমার কিছুই হবে না।’
তদন্তে অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও কেন অভিযুক্ত কর্মকর্তার বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি, জানতে চাইলে মানিকগঞ্জের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (রাজস্ব) মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘সরকারি চাকরিজীবীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হলে কিছু প্রক্রিয়া রয়েছে। সেটি সময়সাপেক্ষ। শুনেছি, নায়েব আব্দুল মোতালেব নিজেই চাকরি ছেড়ে দেওয়ার আবেদন করেছেন। একটা মানুষ চাকরি ছেড়ে দিলে তার বিরুদ্ধে আর কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে? চাকরি ছেড়ে দেওয়াটাই তো বড় শাস্তি।’
তদন্ত চলাকালে কিংবা অভিযোগের সত্যতা পাওয়ার পরও তাঁকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়নি কেন-এমন প্রশ্নের জবাবে মোহাম্মদ আলী বলেন, ‘তাৎক্ষণিক কোনো অপরাধ প্রমাণিত হলে সাময়িক বরখাস্ত করা যায়। কিন্তু তদন্তের পরে সেটি করা যায় না। তখন বিভাগীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। তবে সেটি একটু সময়সাপেক্ষ।’
এর আগে দরগ্রাম ইউনিয়ন ভূমি অফিসের এই কর্মকর্তার বিরুদ্ধে নামজারিসহ বিভিন্ন ভূমিসেবা দিতে ঘুষ দাবির অভিযোগ করেন একাধিক সেবাপ্রার্থী। তাঁদের অভিযোগ, প্রয়োজনীয় কাগজপত্র জমা দেওয়ার পরও নানা অজুহাতে আবেদন আটকে রাখা হতো। কখনো অতিরিক্ত কাগজপত্র চাওয়া হতো, কখনো আবেদনে ভুল থাকার কথা বলে তা বাতিল করা হতো। পরে চাহিদামতো টাকা দিলে দ্রুত মিলত সেবা।
ভুক্তভোগীদের একজন আনছের আলী বলেন, ‘নামজারি করার জন্য আমি দেড় বছর ঘুরেছি। বিভিন্ন সমস্যার কথা বলে আমার আবেদন বাতিল করে দেওয়া হয়। পরে পাশের একটি রুমে নিয়ে ২০ হাজার টাকা দাবি করেন। টাকা দেওয়ার পরই আমার নামজারি করে দেওয়া হয়। দেড় বছর ঘুরে বাধ্য হয়ে টাকা দিয়েছি।’
