জয়ন্ত সাহা
শুধু পাহাড়ের চা বাগান নয়, তরাই ও ডুয়ার্সের চা- বাগানের অপরূপ শোভার টানে পর্যটকেরা বারবার ছুটে আসেন এসব এলাকায়। যখন চায়ের মরসুম তখন শান্ত লাকড়া, সুমি লাকড়াদের চা গাছের মাথা থেকে নিপুন হাতে দুটি পাতা একটা কুঁড়ি তোলা কিংবা যখন বাগানে পাতা তোলার মরসুম নেই তখন সুমন চিকবড়াইকেদের হাঁসুয়া হাতে বাগানের আগাছা কেটে ফেলার ভিডিও ক্যামেরা বন্দী করে হাসি মুখে ফিরে যান নিজেদের গন্তব্যে। ওদের কজনই বা জানেন, অনিয়মিত বৃষ্টি কিংবা অপ্রতুল বৃষ্টি আর তাপমাত্রার অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে চায়ের গুনমান আর উৎপাদন দুই-ই কমছে তরাই আর ডুয়ার্সে। প্রথম রেইন ফ্ল্যাশের পর জুন মাসে পাতা তোলা হয়। সেই চায়ের কোয়ালিটি হয় "সবসে বড়া"। অথচ গত জুনে পর্যাপ্ত বৃষ্টিই হল না। ফলে উৎপাদন আর উন্নত মানের চা দুয়েরই ওপর কোপ পড়েছে তরাই আর ডুয়ার্সে।
টি রিসার্চ এসোশিয়েশনের দাবি এর ফলে গত জুনের চাইতে এবারের জুনে চায়ের উৎপাদন কমেছে তরাই ও ডুয়ার্সে। তরাইয়ের তুলনায় ডুয়ার্সে উৎপাদন কমেছে অনেকটাই বেশি।
চা শ্রমিক ইউনিয়নের নেতারাও বলছেন, চা চাষে চাই পর্যাপ্ত বৃষ্টি। তরাই ও ডুয়ার্সে যার অভাব ছিল না। কিন্তু আবহাওয়ার চরিত্র দ্রুত বদলাচ্ছে। মোট বৃষ্টিপাতের পরিমানের পাশাপাশি বৃষ্টি হবার দিনের সংখ্যাও কমেছে।আবার হড়পা বানের কারণে এবং নদীর বুক দখল হয়ে যাওয়া বালি পাথর মাফিয়াদের বেপরোয়া মনোভাবে পাহাডী নদী গতিপথ বদলে চা বাগানকে গ্রাস করছে।পরিসংখ্যান বলছে আগের বছরের জুন মাসে তরাই আর ডুয়ার্সে বৃষ্টি হয়েছিল ২৫ দিন আর চলতি বছরের জুন মাসে বৃষ্টি হয়েছে মাত্র ১৮ দিন।
একই সঙ্গে ডুয়ার্সে তাপমাত্রা বেড়েছে ২-৪ ডিগ্রি।তাপমাত্রা বাড়ার পেছনে মুখ্য কারণ জঙ্গল লাগোয়া এলাকায় গাছ কেটে হোটেল, রিসর্ট গড়ায় সরকারের মদত। আর জঙ্গলে কাঠ মাফিয়াদের দৌরাত্ম। এক্ষেত্রেও বন দপ্তর গত ১৫ বছরে কোন পদক্ষেপ নেয় নি। বন লুটের কারণে ডুয়ার্সের জলবায়ুতে প্রভাব পড়েছে যথেষ্টই।
চা শ্রমিকদের নেতা বিকাশ মোহালি বলেন, আগে অক্টোবর মাসে পাতা তুলতে এসে শ্রমিকেরা বলতো," আজ জার আহে।"(আজ ঠান্ডা পড়েছে)। অথচ এখন অক্টোবরে রোদের হাত থেকে বাঁচতে পাতা তোলার সময়ে ছাতা ব্যবহার করেন শ্রমিকেরা। তাঁর অভিযোগ শুধু জঙ্গলের গাছ লুঠ হয়েছে তাই নয়, বাগানের পুরনো বড় বড় শেড ট্রি কেটে বেচে দিয়েছে বাগান মালিকরা। ফলে ভারসাম্য হারিয়েছে প্রকৃতি। বৃষ্টি আসবে কোথা থেকে?
আবহাওয়ার বদলের কারণে চড়া রোদে পাতা যেমন ঝলসে যায় তেমনি পাতাখোর লালপোকা আর চা মশারা পাতা খেয়ে দিচ্ছে। রাসায়নিক সারের ব্যবহার বাড়ছে।এর ফলেও মার খাচ্ছে উৎপাদন।
ডুয়ার্সে চা শিল্পে মরার ওপর খাড়ার ঘা ডলোমাইট।ডুয়ার্সের চা বাগানের বড় অংশ ভুটান সীমান্ত ঘেঁষা।সীমান্তের থেকে কিছু দূরে বাগান হলেও ভুটানের নদী ঝোরা নেমে এসেছে ডুয়ার্সের এসব এলাকায়। আর ভুটান থেকে প্রতিদিন উঠছে ডলোমাইট। ভুটানের নদী, ঝোরার জল ডলোমাইট মিশ্রিত মাটি বয়ে চলে আসে বাগান এলাকায়। বর্ষায় এসব নদী আর
ঝোড়া প্লাবিত হলে বাগান ভাসে ডলোমাইট মিশ্রিত নদী আর ঝোড়ার জলে। বন্ধ্যা হয়ে যায় চা বাগানের জমি।বন্যার জল শুকিয়ে গেলে বাগানের মাটিতে মিশে থাকা ডলোমাইট মাটির আণুবিক্ষনিক ছিদ্রগুলি বন্ধ করে দেয়। ফলে বদলে যায় চা বাগানের জমির চরিত্র। এর ফলেও কমছে উৎপাদন।
জলবায়ুর এই ছন্দহীনতার জন্য সরকারের যা করনীয় সেটা যেমন হচ্ছে না তেমনি তেমনি চা বাগান মালিকেরা শুধুই মুনাফালোভী হওয়ার কারণে বিপ্ননতার মুখে তরাই ও ডুয়ার্সের চা বাগান।
সরকারি তথ্য বলছে ১৮৭৪ সালে গজলডোবায় গড়ে উঠেছিল ডুয়ার্সের প্রথম চা বাগান। সে বাগান গিলেছে তিস্তা নদী। তারপর কেটে গেছে ১৫০ বছর।
এখন শ্রমিকদের মজুরি মাত্র ২৫০ টাকা। পিএফ পেনশনের টাকা পাচ্ছে না শ্রমিকেরা। বোনাস অনিয়মিত।এরমাঝে ছন্দহীন জলবায়ু আর ডলোমাইট দুইয়ের গ্রাসে তরাই আর ডুয়ার্স। বারবার দুটি পাতা একটি কুঁড়ির টানে তরাই আর ডুয়ার্সে আসা পর্যটকেরা জানেনই না বাগান আর বাগানের শ্রমিকের জীবন কতটা অন্ধকারময়।
সরকার আসে, সরকার যায় চা বাগানের শ্রমিক কিংবা বাগানের দিন বদলায় না। বাগানের জমিতে থাবা বসাতে ওত পেতে আছে কর্পোরেটেরা।
