সাত বছর পর আবারও ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজে খেলতে যাচ্ছে বাংলাদেশ। সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া এই টুর্নামেন্টে টাইগারদের প্রতিপক্ষ জিম্বাবুয়ে ও আফগানিস্তান। ২০১৯ সালে আয়ারল্যান্ডে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বহুজাতিক টুর্নামেন্টের শিরোপা জিতেছিল বাংলাদেশ। এবার সেই সাফল্যের স্মৃতি ফিরিয়ে এনে নতুন করে শিরোপা জয়ের স্বপ্ন দেখছে লিটন দাসের দল।
বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে ২০১৯ সালের আয়ারল্যান্ড সফর বিশেষভাবে স্মরণীয়। মাশরাফি বিন মুর্তজার নেতৃত্বে সেবার দুর্দান্ত ক্রিকেট খেলেছিল টাইগাররা। সাকিব আল হাসান, তামিম ইকবাল, মুশফিকুর রহিম ও মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের মতো অভিজ্ঞ ক্রিকেটারদের সঙ্গে তরুণদের সম্মিলিত পারফরম্যান্স দলকে এনে দিয়েছিল ঐতিহাসিক সাফল্য।
সেই আসরের ফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারিয়ে প্রথমবারের মতো বহুজাতিক টুর্নামেন্টের শিরোপা জেতে বাংলাদেশ। দ্বিপক্ষীয় সিরিজের বাইরে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে এটিই বাংলাদেশের একমাত্র ত্রিদেশীয় বা বহুজাতিক টুর্নামেন্টের শিরোপা। সাত বছর পর আবারও একই ধরনের প্রতিযোগিতায় অংশ নিতে যাচ্ছে দলটি। তাই এবারের আসর ঘিরে বাড়তি প্রত্যাশা তৈরি হয়েছে সমর্থকদের মধ্যে।
১৭ অক্টোবর শুরু বাংলাদেশের শিরোপা অভিযান
আগামী ১৭ অক্টোবর বাংলাদেশ ও জিম্বাবুয়ের ম্যাচ দিয়ে শুরু হবে ত্রিদেশীয় ওয়ানডে সিরিজ। এরপর ১৯ অক্টোবর মুখোমুখি হবে আফগানিস্তান ও জিম্বাবুয়ে। ২১ অক্টোবর আফগানিস্তানের বিপক্ষে মাঠে নামবে বাংলাদেশ। তিন দলের লড়াই শেষে ২৩ অক্টোবর একই ভেন্যুতে অনুষ্ঠিত হবে ফাইনাল।
সূচি অনুযায়ী, সিরিজের প্রথম দুটি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে আবুধাবিতে। শেষ লিগ ম্যাচ ও ফাইনালের ভেন্যু শারজাহ। তিন দলই ইতোমধ্যে নিজেদের স্কোয়াড ঘোষণা করেছে।
দলগুলোর সামর্থ্য ও সাম্প্রতিক পারফরম্যান্স বিবেচনায় শিরোপার লড়াইয়ে কাউকে এগিয়ে রাখার সুযোগ কম। আফগানিস্তানের স্পিন শক্তি, জিম্বাবুয়ের লড়াকু মানসিকতা এবং বাংলাদেশের পেস আক্রমণ প্রতিযোগিতাটিকে আকর্ষণীয় করে তুলতে পারে। ফলে প্রতিটি ম্যাচেই গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে জয়-পরাজয়ের হিসাব।
পেস আক্রমণে বড় ভরসা বাংলাদেশ
এবারের সিরিজে বাংলাদেশের অন্যতম শক্তির জায়গা পেস বোলিং। তাসকিন আহমেদ, মোস্তাফিজুর রহমান, হাসান মাহমুদ ও শরিফুল ইসলামের সমন্বয়ে গড়া পেস আক্রমণ প্রতিপক্ষের ব্যাটারদের জন্য কঠিন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে।
গতি, সুইং এবং বৈচিত্র্য কাজে লাগিয়ে প্রতিপক্ষকে চাপে রাখার সামর্থ্য রয়েছে এই বোলারদের। বিশেষ করে গুরুত্বপূর্ণ সময়ে উইকেট তুলে নিতে পারলে বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের সম্ভাবনা বাড়বে।
অন্যদিকে, স্পিন বিভাগেও রয়েছে বেশ কয়েকটি বিকল্প। মেহেদী হাসান মিরাজ, রিশাদ হোসেন ও তানভীর ইসলামের পাশাপাশি আলিস আল ইসলামের উপস্থিতি বোলিং আক্রমণে ভিন্ন মাত্রা যোগ করতে পারে। তবে আফগানিস্তানের মতো স্পিননির্ভর দলের বিপক্ষে বাংলাদেশের বোলারদের কার্যকর পরিকল্পনা নিয়ে মাঠে নামতে হবে।
ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতাই বড় পরীক্ষা
বোলিংয়ে শক্তি থাকলেও বাংলাদেশের শিরোপা জয়ের পথে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হতে পারে ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতা। দেশের বাইরে ওয়ানডে ক্রিকেটে ব্যাটিং বিপর্যয়ের যে সমস্যা দেখা যায়, তা কাটিয়ে ওঠা জরুরি।
অধিনায়ক লিটন দাস, নাজমুল হোসেন শান্ত, তাওহীদ হৃদয় ও সাইফ হাসানদের ব্যাট হাতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে হবে। শুরুতে ভালো জুটি গড়ার পাশাপাশি মাঝের ওভারগুলোতে ইনিংস ধরে রাখা এবং শেষ দিকে দ্রুত রান তোলার সামর্থ্যও দেখাতে হবে ব্যাটারদের।
বিশেষ করে বড় লক্ষ্য তাড়া করা কিংবা প্রথমে ব্যাট করে প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ স্কোর গড়ার ক্ষেত্রে ব্যাটিং ইউনিটের দায়িত্ব থাকবে বেশি। বোলাররা প্রতিপক্ষকে চাপে রাখলেও সেই চাপকে জয়ে রূপ দিতে হলে ব্যাটারদের ধারাবাহিক পারফরম্যান্স প্রয়োজন।
এ কারণে লিটন দাসের নেতৃত্বে দলটির ব্যাটিং পরিকল্পনা, উইকেটের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার ক্ষমতা এবং চাপের মুহূর্তে সিদ্ধান্ত নেওয়ার দক্ষতা শিরোপা নির্ধারণে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।
ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশের পরিসংখ্যান
এখন পর্যন্ত সাতটি ত্রিদেশীয় সিরিজে অংশ নিয়ে তিনবার ফাইনালে উঠেছে বাংলাদেশ। এর মধ্যে একবার শিরোপা জয়ের বিপরীতে দুবার রানার্সআপ হয়েছে দলটি। পরিসংখ্যান বলছে, বহুজাতিক টুর্নামেন্টে বাংলাদেশের সাফল্যের সুযোগ এখনো সীমিত।
তবে এবারের আসর সেই চিত্র বদলে দেওয়ার সুযোগ এনে দিয়েছে। তিন দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় ফাইনালে উঠতে হলে লিগ পর্বের প্রতিটি ম্যাচে ভালো করতে হবে। পাশাপাশি প্রতিপক্ষের শক্তি ও দুর্বলতা বিশ্লেষণ করে সঠিক একাদশ নির্বাচনও গুরুত্বপূর্ণ হবে।
ফিরছে ত্রিদেশীয় ক্রিকেটের পুরোনো রোমাঞ্চ
একসময় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ত্রিদেশীয় সিরিজ মানেই ছিল বাড়তি উত্তেজনা। তিন দলের প্রতিদ্বন্দ্বিতায় একটি ম্যাচের ফলাফল অন্য দলের ফাইনালে ওঠার সম্ভাবনাকেও প্রভাবিত করত। ফলে প্রতিটি ম্যাচেই থাকত আলাদা হিসাব-নিকাশ।
কিন্তু সময়ের সঙ্গে ব্যস্ত আন্তর্জাতিক সূচি ও দ্বিপক্ষীয় সিরিজের প্রাধান্যে এ ধরনের টুর্নামেন্টের আয়োজন কমে এসেছে। সাত বছর পর বাংলাদেশের ত্রিদেশীয় সিরিজে ফেরার মধ্য দিয়ে সেই পুরোনো রোমাঞ্চ আবারও ফিরে আসার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
এবারের প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশের সামনে লক্ষ্য শুধু অংশগ্রহণ নয়, বরং শিরোপা জিতে বহুজাতিক আসরে নিজেদের অবস্থান আরও শক্তিশালী করা। অভিজ্ঞতা ও তারুণ্যের সমন্বয়ে গড়া দলটি কতটা সফল হবে, তা নির্ভর করবে মাঠের পারফরম্যান্সের ওপর।
২০১৯ সালের আয়ারল্যান্ডের সাফল্য বাংলাদেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের কাছে এখনো বিশেষ স্মৃতি। এবার সংযুক্ত আরব আমিরাতে সেই স্মৃতিকে নতুন অর্জনে রূপ দেওয়ার অপেক্ষা। সাত বছর পর ত্রিদেশীয় সিরিজে ফিরে তাই লিটন দাসের দলের সামনে রয়েছে দীর্ঘ অপেক্ষার অবসান ঘটিয়ে আবারও শিরোপা জয়ের বড় সুযোগ।
The post ত্রিদেশীয় সিরিজে বাংলাদেশ, লক্ষ্য সেই শিরোপা appeared first on SATV.
