শারদীয় দুর্গাপূজার আগে দেশের ৩৪টি স্থানে হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে চুরির অভিযোগের বিষয়ে মাঠপর্যায়ে তদন্ত করে অধিকাংশ ঘটনায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্য পায়নি পুলিশ।
নেতৃত্বের দ্বন্দ্ব, সরকারি অনুদানের অর্থ নিয়ে বিরোধ, ব্যক্তিগত শত্রুতা, চুরি এবং মানসিক ভারসাম্যহীন ব্যক্তির কর্মকাণ্ডের মতো বিষয় এসব ঘটনার পেছনে রয়েছে বলে পুলিশের পর্যালোচনায় উঠে এসেছে।
বিজ্ঞাপন
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ ও মহানগর সর্বজনীন পূজা কমিটির কাছ থেকে পাওয়া অভিযোগ এবং গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ পর্যালোচনা করে পুলিশ সদরদপ্তর এসব তথ্য পেয়েছে।
সোমবার (১৯ অক্টোবর) রাতে পুলিশের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, কয়েকটি ঘটনাকে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি বিনষ্টের উদ্দেশ্যে সংঘটিত হামলা হিসেবে প্রচার করা হলেও মাঠপর্যায়ে যাচাইয়ে সেই দাবির সত্যতা পাওয়া যায়নি। তবে প্রকৃত অর্থে দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে সংঘটিত হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে চুরির ঘটনায় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
প্রতিমা নামানোর সময় ভাঙে অসুরের হাত
গত ১৬ অক্টোবর নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে রামচন্দ্রদী মধ্য মনিপাড়া সর্বজনীন দুর্গাপূজা মণ্ডপে প্রতিমা স্থাপনের সময় অসুরের ডান হাতের একটি অংশ ভেঙে যায়। পুলিশি পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, প্রতিমা গাড়ি থেকে নামিয়ে মণ্ডপে নেওয়ার সময় অসাবধানতাবশত এ ঘটনা ঘটে।
মণ্ডপের সভাপতি মোহন বাশি দাস ও সাধারণ সম্পাদক রাজিব চন্দ্র দাস বিষয়টি নিশ্চিত করেন। এ ঘটনায় আড়াইহাজার থানায় ১৭ অক্টোবর একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়।
ব্যক্তিগত বিরোধে ভাঙে গণেশের মূর্তি
গত ৫ অক্টোবর ময়মনসিংহ নগরের ঋষিপাড়া এলাকায় সুপারি পাড়াকে কেন্দ্র করে পল্লব দাসের পরিবারের সঙ্গে প্রতিবেশী জীবন ঋষির পরিবারের কথা-কাটাকাটি হয়। এর জেরে জীবন ঋষি, তাঁর ছেলে জয়ন্ত ও ভাগনে রায়মোহন প্রতিপক্ষকে লক্ষ্য করে ঢিল ছোড়েন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
বিজ্ঞাপন
এতে ময়না রানী দাস (৫৮) আহত হন। একই সঙ্গে ঢিলের আঘাতে মণ্ডপের সামনে রং করার জন্য রাখা গণেশের মূর্তির কিছু অংশ ভেঙে যায়। সংশ্লিষ্ট পূজামণ্ডপের সভাপতি নৃপেন্দ্র দাস ও সাধারণ সম্পাদক পরিমল চন্দ্র দাসের ভাষ্য অনুযায়ী, দুই পরিবারের পূর্ববিরোধের জেরে এ ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় কোতোয়ালি থানায় জিডি করা হয়।
মানসিক ভারসাম্যহীন নারীর বিরুদ্ধে শামিয়ানা ছেঁড়ার অভিযোগ
গত ১৫ অক্টোবর পাবনার সুজানগরের ভায়না এলাকায় রাধানগর সর্বজনীন দুর্গা মন্দিরের পূজামণ্ডপের শামিয়ানা ছিঁড়ে ফেলার অভিযোগ ওঠে এক নারীর বিরুদ্ধে। স্থানীয়দের বরাত দিয়ে পুলিশ জানায়, ওই নারী ঘটনার আগে চার-পাঁচ দিন ধরে এলাকায় অবস্থান করছিলেন।
বিজ্ঞাপন
মন্দির কমিটি পুলিশকে জানালে সুজানগর থানা পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে ওই নারীকে হেফাজতে নেয়। মন্দিরের সভাপতি সমীর কুমার সরকার ও সাধারণ সম্পাদক মিলন কুমার সরকার তাঁর মানসিক ভারসাম্যহীনতার বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বলে প্রতিবেদনে বলা হয়।
ঠাকুরগাঁওয়ে ইসকন ও সনাতন সম্প্রদায়ের বিরোধ
গত ১ অক্টোবর ঠাকুরগাঁওয়ের ভুল্লী থানার ভাতগাঁও এলাকায় শ্রীশ্রী রসিক রায় জিউ ইসকন মন্দিরে প্রতিমা স্থাপনকে কেন্দ্র করে বিরোধের ঘটনা ঘটে।
পুলিশের পর্যালোচনার তথ্য অনুযায়ী, সনাতন সম্প্রদায়ের ৭০ থেকে ৮০ জন ব্যক্তি লাঠিসোঁটা নিয়ে মন্দিরে প্রবেশ করে সেখানে অবস্থানরত ইসকনের কয়েকজন সদস্যকে মারধর করেন এবং মালামাল ভাঙচুর করেন। পরে ইসকনের প্রতিমা সরিয়ে নিজেদের প্রতিমা স্থাপন করা হয়।
বিজ্ঞাপন
এরপর ইসকন সম্প্রদায়ের ১০০ থেকে ১২০ জন ঘটনাস্থলে উপস্থিত হয়ে বাধা দিলে দুপক্ষের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। পরবর্তী সময়ে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তি, প্রশাসন ও রাজনৈতিক নেতাদের মধ্যস্থতায় সমঝোতা হয়। পুরোনো প্রতিমা সরিয়ে নতুন প্রতিমা স্থাপন করা হয় বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
স্থানীয় পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি মনোরঞ্জন সিংহের ভাষ্য অনুযায়ী, ঘটনাটি ইসকন ও সনাতন সম্প্রদায়ের মধ্যে বিরোধের জেরে ঘটে। এ ঘটনায় ভুল্লী থানায় জিডি করা হয়।
সরকারি অনুদানের অর্থ নিয়ে দুই মন্দিরের বিরোধ
গত ২ অক্টোবর রাতে ঠাকুরগাঁওয়ের বালিয়াডাঙ্গী উপজেলার কাশিডাঙ্গী বৈরাগীপাড়া এলাকায় সরকারি অনুদানের অর্থ নিয়ে কৃষ্ণ মন্দির ও কালী মন্দিরের দুপক্ষের মধ্যে বিরোধের সৃষ্টি হয়। একপর্যায়ে কথা-কাটাকাটি থেকে হাতাহাতি ও মারামারি হয়।
বিজ্ঞাপন
পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, কৃষ্ণ মন্দিরের সভাপতি কৈলাস মোহন্ত ও কালী মন্দিরের সভাপতি সুধীর মোহন্ত নিজ নিজ মন্দিরের উন্নয়নের জন্য জেলা পরিষদে আর্থিক অনুদানের আবেদন করেছিলেন। কৃষ্ণ মন্দিরের নামে এক লাখ টাকা বরাদ্দের খবর জানার পর দুপক্ষই অর্থ নিজেদের আবেদনের বিপরীতে বরাদ্দ হয়েছে বলে দাবি করে। এ বিরোধ থেকেই সংঘর্ষের সূত্রপাত। এ ঘটনায় বালিয়াডাঙ্গী থানায় জিডি করা হয়।
প্রতিমা স্থাপনের স্থান নিয়ে মারামারি
গত ৪ অক্টোবর টাঙ্গাইলের দেলদুয়ার উপজেলার নলখী পাড়ায় পূর্ণচন্দ্র নাট মন্দিরের নবগঠিত অস্থায়ী কমিটির উদ্যোগে দুর্গাপূজা আয়োজনের প্রস্তুতির সময় প্রতিমা মন্দিরের ভেতরে না বাইরে স্থাপন করা হবে, তা নিয়ে বিরোধ দেখা দেয়।
বিজ্ঞাপন
এ নিয়ে মন্দির কমিটির সভাপতি জয়রথ পাল ও সাধারণ সম্পাদক দুলাল চন্দ্র পালের পক্ষের লোকজনের মধ্যে কথা-কাটাকাটি হয়। একপর্যায়ে দুপক্ষের মধ্যে মারামারি শুরু হলে পুলিশ ঘটনাস্থলে গিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনে।
পরবর্তী সময়ে স্থানীয় সংসদ সদস্যের মধ্যস্থতায় সমঝোতা হয় বলে দেলদুয়ার থানা পূজা উদযাপন কমিটির সভাপতি রঘুনাথ বসাক জানান। পূজা চলাকালে বিশৃঙ্খলা না করার বিষয়ে সংশ্লিষ্টরা অঙ্গীকার করেন। বর্তমানে সেখানে শান্তিপূর্ণ পরিবেশে পূজা উদযাপিত হচ্ছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
নিরাপত্তা নিশ্চিতের দাবি পুলিশের
পুলিশের পর্যালোচনায় বলা হয়েছে, দুর্গাপূজাকে কেন্দ্র করে প্রকৃতপক্ষে দুর্বৃত্তদের মাধ্যমে সংঘটিত হামলা, প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে চুরির ঘটনায় পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নিয়েছে। পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা, আইনগত পদক্ষেপ গ্রহণ, অধিকাংশ ঘটনায় আসামি গ্রেফতার, চোরাই মালামাল উদ্ধার এবং বিবদমান পক্ষগুলোর মধ্যে সমঝোতা প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।
এ ছাড়া পূজামণ্ডপগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা ও আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখা হয়েছে বলে দাবি করা হয়েছে। পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৩৩ হাজারের বেশি পূজামণ্ডপে উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে।
তবে ৩৪টি স্থানের অভিযোগের মধ্যে কতটি ঘটনার তদন্ত সম্পন্ন হয়েছে, কতটি মামলায় গ্রেফতার করা হয়েছে, তা উল্লেখ করা হয়নি।
টিটি/এমএএইচ/
ফলো করুন
পাঠকপ্রিয় অনলাইন নিউজ পোর্টাল জাগোনিউজ২৪.কমে লিখতে পারেন আপনিও। লেখার বিষয় ফিচার, ভ্রমণ, লাইফস্টাইল, ক্যারিয়ার, তথ্যপ্রযুক্তি, ধর্ম, কৃষি ও প্রকৃতি। আজই আপনার লেখাটি পাঠিয়ে দিন jagofeature@gmail.com ঠিকানায়।
