রাজধানী ঢাকায় মানুষ নিরাপদে বসবাস করবে, নির্বিঘেœ ব্যবসা-বাণিজ্য পরিচালনা করবে, নিজের সম্পদ ও সম্পত্তি নিয়ে নিশ্চিন্তে থাকবেÑ এটাই প্রত্যাশিত। নাগরিকের এই স্বাভাবিক জীবনযাপনের নিশ্চয়তা দেওয়া রাষ্ট্র ও সরকারের অন্যতম দায়িত্ব। কিন্তু চাঁদাবাজি, জমি দখল, ভয়ভীতি প্রদর্শন ও পেশিশক্তির দাপটে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকার মানুষ সেই নিরাপত্তা থেকে বঞ্চিত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে একশ্রেণির স্বঘোষিত নেতা সাধারণ মানুষ ও ব্যবসায়ীদের জিম্মি করে রাখছে। তাদের দৌরাত্ম্যে কোথাও নির্মাণকাজ বাধাগ্রস্ত হচ্ছে, কোথাও ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান থেকে নিয়মিত চাঁদা আদায় করা হচ্ছে, আবার কোথাও জমির মালিককে নিজের সম্পত্তি রক্ষায় হামলার শিকার হতে হচ্ছে।
মঙ্গলবার রূপালী বাংলাদেশের বিশেষ প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, বিএনপির পরিচয় ব্যবহারকারী একশ্রেণির স্বঘোষিত নেতার বিরুদ্ধে রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় চাঁদাবাজি, ভূমি দখল ও সন্ত্রাসী কর্মকা-ের অভিযোগ রয়েছে। তাদের অনেকেরই নেই দলীয় পদের আনুষ্ঠানিক স্বীকৃতি, নেই জনপ্রতিনিধি হিসেবে কোনো বৈধ দায়িত্ব। অথচ নিজেদের প্রভাবশালী নেতা পরিচয় দিয়ে তারা এলাকায় আধিপত্য বিস্তার করছেন।
সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব স্বঘোষিত নেতা নিজেদের রাজনৈতিক প্রভাবের কথা বলে সাধারণ মানুষকে ভয় দেখানো। রাজনৈতিক পরিচয় যদি চাঁদাবাজি ও জমি দখলের হাতিয়ার হয়ে ওঠে, তাহলে ক্ষতিগ্রস্ত হয় শুধু নাগরিকের নিরাপত্তা নয়, সংশ্লিষ্ট রাজনৈতিক দলের ভাবমূর্তিও। কোনো দলের নাম ব্যবহার করে কেউ অপরাধ করলে সেই দায় এড়ানোর সুযোগ নেই।
এ ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। প্রতিবেদনে কয়েকটি ঘটনায় ভুক্তভোগীদের অভিযোগ গ্রহণে বাধা ও পুলিশের নিষ্ক্রিয়তার অভিযোগও উঠে এসেছে। এসব অভিযোগের নিরপেক্ষ তদন্ত হওয়া দরকার। একই সঙ্গে চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের সঙ্গে যুক্ত ব্যক্তিদের পাশাপাশি তাদের পৃষ্ঠপোষকদের আইনের আওতায় আনতে হবে।
রাজধানীর যেসব এলাকায় চাঁদাবাজি, জমি দখল ও ভয়ভীতি প্রদর্শনের অভিযোগ রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে সমন্বিত অভিযান চালাতে হবে। দখল হওয়া সরকারি জমি উদ্ধার, বৈধ মালিকদের সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং ব্যবসায়ীদের নির্বিঘেœ কাজ করার পরিবেশ নিশ্চিত করতে হবে। ভুক্তভোগীরা যাতে প্রতিশোধের ভয়ে অভিযোগ জানাতে পিছপা না হন, সে জন্য তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা প্রয়োজন। রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে অপরাধে জড়িত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নিতে হবে দলগুলোকে। অপরাধী যে দলেরই হোক, আইনের প্রয়োগে কোনো ব্যতিক্রম থাকা চলবে না।
সাম্প্রতিক সময়ে চাঁদাবাজদের বিরুদ্ধে অভিযান ও গ্রেপ্তারে প্রধানমন্ত্রীর কঠোর অবস্থান প্রশংসনীয়। এখন সেই পদক্ষেপের ধারাবাহিকতা ও কার্যকারিতা নিশ্চিত করাই জরুরি। স্বঘোষিত নেতাদের দৌরাত্ম্য নির্মূল করতে পারলে একদিকে যেমন বিএনপির ভাবমূর্তি রক্ষা পাবে, অন্যদিকে সরকারের প্রতি মানুষের আস্থা বাড়বে এবং রাজধানীবাসী ফিরে পাবেন নিরাপদ ও শান্তিপূর্ণ জীবনযাপনের অধিকার।
সাধারণ মানুষ কোনো বিশেষ সুবিধা চান না। তারা চান আইনের সুরক্ষা, সম্পত্তির নিরাপত্তা এবং ভয়ভীতিমুক্ত জীবন। রাজনৈতিক পরিচয়ের আড়ালে কেউ যেন তাদের জিম্মি করতে না পারে, সেটি নিশ্চিত করার দায়িত্ব সরকারের। চাঁদাবাজি ও দখলদারত্বের বিরুদ্ধে ঘোষিত অবস্থানকে বাস্তবে কার্যকর করে সরকারকে প্রমাণ করতে হবে, রাষ্ট্রের কর্তৃত্ব কোনো স্বঘোষিত নেতা বা গোষ্ঠীর হাতে নয়, আইন ও জনগণের অধিকার রক্ষার দায়িত্বেই নিয়োজিত।