আগামী ১৫ বছরে উন্নয়নশীল দেশগুলোর শ্রমবাজারে প্রবেশ করতে যাওয়া প্রায় ১২০ কোটি তরুণের মধ্যে ৮০ কোটির কর্মসংস্থান হবে না বলে সতর্ক করেছে জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি (ইউএনডিপি)। সংস্থাটির প্রধান আলেকজান্ডার ডি ক্রু বলেছেন, কর্মসংস্থান সৃষ্টিতে কার্যকর নীতি ও উদ্যোগ নেওয়া না হলে বিপুলসংখ্যক তরুণ কাজের সুযোগ থেকে বঞ্চিত হবেন।
মঙ্গলবার ব্যাংকক থেকে নিউইয়র্কে আয়োজিত এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে তিনি এ সতর্কবার্তা দেন। বিশ্বব্যাংক গ্রুপ ও আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের (আইএমএফ) বার্ষিক সভায় অংশ নিতে বর্তমানে ব্যাংককে রয়েছেন তিনি।
বিজ্ঞাপন
ডি ক্রু বলেন, আগামী ১৫ বছরে প্রায় ১২০ কোটি তরুণ পড়াশোনা শেষ করে শ্রমবাজারে প্রবেশ করবেন। কিন্তু বর্তমান পূর্বাভাস অনুযায়ী, তাদের মধ্যে মাত্র ৪০ কোটি মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হবে। বাকি ৮০ কোটি তরুণের জন্য পর্যাপ্ত চাকরি থাকবে না।
তার মতে, অনেক উন্নয়নশীল দেশে জনসংখ্যার মধ্যম বয়স ১৮ থেকে ২৫ বছরের মধ্যে। ফলে এসব দেশে বিপুলসংখ্যক তরুণের জন্য কর্মসংস্থান তৈরি করা বড় চ্যালেঞ্জ। বর্তমান প্রযুক্তিগত পরিস্থিতির ভিত্তিতে এই পূর্বাভাস দেওয়া হলেও যথাযথ নীতি ও শ্রমবাজারকেন্দ্রিক উদ্যোগের মাধ্যমে পরিস্থিতি বদলানো সম্ভব।
তিনি বলেন, এই সংকট নিজে থেকেই দূর হবে না; এর পেছনে নীতিগত সিদ্ধান্তের ভূমিকা রয়েছে।
কর্মসংস্থান বাড়াতে ইউএনডিপির দুই উদ্যোগ
তরুণদের কর্মসংস্থানের সুযোগ বাড়ানো এবং বিনিয়োগ ত্বরান্বিত করতে দুটি নতুন উদ্যোগ চালু করেছে ইউএনডিপি। এর মধ্যে ‘ইনভেস্টমেন্ট অ্যাকসেলারেটর’ উদ্যোগের মাধ্যমে সরকারগুলোকে বিনিয়োগবান্ধব নীতি ও আইনি কাঠামো উন্নত করতে সহায়তা করা হবে। পাশাপাশি বিনিয়োগের উপযোগী প্রকল্প চিহ্নিত করে সেগুলোকে পরিকল্পনা থেকে বাস্তবায়নের পর্যায়ে নিয়ে যাওয়ার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে।
অন্য উদ্যোগ ‘জবস ফর প্রসপারিটি ফ্যাসিলিটি’র লক্ষ্য, যেসব খাতে বেশি কর্মসংস্থান তৈরির সম্ভাবনা রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করা। একই সঙ্গে নিয়োগদাতাদের চাহিদার সঙ্গে তরুণদের দক্ষতার সামঞ্জস্য তৈরি এবং ব্যবসায় বিনিয়োগ ও কর্মী নিয়োগের বাধা দূর করতে দেশগুলোকে সহায়তা করা হবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ভবিষ্যৎ কর্মসংস্থানে কতটা প্রভাব ফেলবে—এমন প্রশ্নের জবাবে ডি ক্রু বলেন, সক্রিয় শ্রমনীতি গ্রহণের মাধ্যমে কর্মসংস্থানের পূর্বাভাস পরিবর্তন করা সম্ভব। তার মতে, এআইয়ের ব্যবহার বাড়লেও পরিচর্যা, কৃষি ও পর্যটনের মতো খাতে উল্লেখযোগ্য কর্মসংস্থানের সুযোগ থাকবে।
তিনি বলেন, মানুষকে দারিদ্র্য থেকে টেকসইভাবে বের করে আনার সবচেয়ে কার্যকর পথ হলো কর্মসংস্থান সৃষ্টি।
এই দুই উদ্যোগে বিশ্বব্যাংক গ্রুপ, ইউরোপীয় বিনিয়োগ ব্যাংক এবং ইউরোপীয় পুনর্গঠন ও উন্নয়ন ব্যাংকের সঙ্গে অংশীদারত্ব সম্প্রসারণ করা হয়েছে। নেপাল, ইয়েমেন, হাইতি, লেবানন ও ঘানায় এর পরীক্ষামূলক কার্যক্রম ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে।
উন্নয়নশীল দেশগুলো ‘তিনমুখী সংকটে’
কর্মসংস্থানের এই সতর্কবার্তা এমন সময়ে এল, যখন অনেক উন্নয়নশীল দেশ একসঙ্গে তিনটি বড় চাপের মুখে রয়েছে। ডি ক্রু পরিস্থিতিটিকে ‘তিনমুখী ধাক্কা’ হিসেবে বর্ণনা করেছেন। এর মধ্যে রয়েছে জ্বালানির উচ্চমূল্য, ১৯৫০ সালের পর অন্যতম তীব্র এল নিনো পরিস্থিতি এবং ঋণ গ্রহণের অত্যন্ত উচ্চ ব্যয়।
ইউএনডিপির নতুন প্রতিবেদন ‘নো টাইম টু রিকভার’ অনুযায়ী, বর্তমানে একটি উন্নয়নশীল দেশের সরকারকে গড়ে মোট সরকারি আয়ের ৯ দশমিক ৫ শতাংশ শুধু ঋণের সুদ পরিশোধে ব্যয় করতে হচ্ছে। ২০১০ সালের পর এই প্রথম বহুমাত্রিক দারিদ্র্যে বসবাসকারী মানুষের সংখ্যা বেড়েছে। এ ধরনের দারিদ্র্য নির্ধারণে শুধু আয় নয়, বিদ্যুৎ, পানি, স্বাস্থ্যসেবা ও শিক্ষার মতো মৌলিক সেবায় প্রবেশাধিকারের বিষয়ও বিবেচনা করা হয়।
ডি ক্রু বলেন, এসব পরিসংখ্যান সবার জন্য সতর্কসংকেত হওয়া উচিত। বিশ্ব অর্থনীতি প্রত্যাশার তুলনায় বেশি স্থিতিশীলতা দেখালেও সব দেশ সমানভাবে সেই সুবিধা পাচ্ছে না। কিছু দেশের অর্থনৈতিক ভিত্তি শক্তিশালী হলেও অন্য দেশগুলোর পক্ষে নতুন ধাক্কা সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে।
ইউএনডিপির সতর্কবার্তা অনুযায়ী, আগামী বছরগুলোতে তরুণদের জন্য পর্যাপ্ত কর্মসংস্থান তৈরি করা উন্নয়নশীল দেশগুলোর অন্যতম প্রধান চ্যালেঞ্জ হয়ে উঠতে পারে। এ পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দক্ষতাভিত্তিক প্রশিক্ষণ, কর্মসংস্থানমুখী নীতি এবং বেসরকারি খাতের সম্প্রসারণ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।
সূত্র: ইন্ডিয়া ব্লুমস ও ইউএনডিপি
