শ্বশুরবাড়িতে হাতে তৈরি নাশতা নিয়ে গিয়েছিলেন মা। নাশতার পরিমাণ কম—এমন অভিযোগ তুলে শুরু হয় কথা-কাটাকাটি। একপর্যায়ে মা ও মেয়েকে মারধরের অভিযোগ ওঠে শ্বশুরবাড়ির সদস্যদের বিরুদ্ধে। মারধরের নয়দিন পর চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন তিন মাসের অন্তঃসত্ত্বা গৃহবধূ সিফাতুন নূর সিফাত।
শুক্রবার (২৩ অক্টোবর) দুপুর দেড়টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
শনিবার বিকাল ময়নাতদন্ত শেষে মরদেহ চন্দনাইশের বাবার বাড়িতে পৌঁছালে স্বজনদের আহাজারিতে ভারী হয়ে ওঠে পরিবেশ। বাদ মাগরিব জানাজা শেষে পারিবারিক কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়। এ ঘটনায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আটক করা হয়েছে সিফাতের শাশুড়ি রিজিয়া বেগমকে (৬০)।
এর আগে গত ১৪ অক্টোবর চট্টগ্রামের পটিয়া উপজেলার কুসুমপুরা ইউনিয়নের পূর্ব কুসুমপুরা এলাকায় এ ঘটনা ঘটে বলে অভিযোগ করেছেন নিহতের মা জুহিনুর আক্তার। তার অভিযোগ, নাশতা নিয়ে বিরোধের জেরে তাকে মারধর করা হয়। একই সময় তার মেয়েকেও মারধর করে মাটিতে ফেলে দেওয়া হয়। তবে গৃহবধূর মৃত্যুর প্রকৃত কারণ এখনো নিশ্চিত হওয়া যায়নি। ঘটনাটি তদন্ত করে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ।
নিহত সিফাতুন নূর (২২) চন্দনাইশ পৌরসভার ৪ নম্বর ওয়ার্ডের নয়াপাড়া এলাকার মো. নূর ও জুহিনুর আক্তারের মেয়ে। প্রায় পাঁচ মাস আগে পারিবারিকভাবে তার বিয়ে হয় পটিয়ার কুসুমপুরা ইউনিয়নের পূর্ব কুসুমপুরা গ্রামের ইলিয়াস খাঁ বাড়ির বাসিন্দা মো. তারেকের (২৬) সঙ্গে। তারেক দুবাইপ্রবাসী। বিয়ের কয়েক মাস পরই তিনি বিদেশে চলে যান। এরপর সিফাতুন শ্বশুরবাড়িতে বসবাস করছিলেন।
পটিয়া থানায় দেওয়া লিখিত অভিযোগে মা জুহিনুর আক্তার উল্লেখ করেন, গত ১৪ অক্টোবর সন্ধ্যা সাড়ে ৭টার দিকে মেয়ের শ্বশুরবাড়িতে হাতে তৈরি নাশতা নিয়ে যান তিনি। নাশতার পরিমাণ কম হয়েছে এমন অভিযোগ তুলে তাকে ও তার মেয়েকে গালিগালাজ করা হয়। নাশতা কম হলে পরে আরও নিয়ে আসবেন বলে জানান তিনি। এ নিয়ে কথা-কাটাকাটির একপর্যায়ে সিফাতুনের শাশুড়ি রিজিয়া বেগম (৬০) তাকে কিল-ঘুষি ও লাথি মারেন বলে অভিযোগ করেন জুহিনুর।
অভিযোগে আরও বলা হয়, একই সময় রাশেদা বেগম (৫৫) ও সুমি আক্তার (৫২) সিফাতুনের চুলের মুঠি ধরে মাটিতে ফেলে দেন। তাদের চিৎকারে আশপাশের লোকজন এগিয়ে এসে মা-মেয়েকে উদ্ধার করেন বলে দাবি করেন জুহিনুর। এ ঘটনায় রিজিয়া বেগম, রাশেদা বেগম ও সুমি আক্তারের বিরুদ্ধে পটিয়া থানায় লিখিত অভিযোগ দেন তিনি।
এদিকে নিহতের পরিবারের দাবি, বিয়ের পর থেকেই সিফাতুন শ্বশুরবাড়িতে শারীরিক ও মানসিক নির্যাতনের শিকার হচ্ছিলেন।
নিহত গৃহবধুর মা জুহিনুর আক্তার বলেন, ঘটনার দিন রাতে দুবাই থেকে তার মেয়ের স্বামী ফোন করে সিফাতুনের শারীরিক অবস্থার অবনতির কথা জানান। পরে রাত ১০টায় চট্টগ্রাম মেডিকেলে গিয়ে মেয়েকে অচেতন অবস্থায় আইসিইউতে দেখতে পান তিনি। এরপর টানা নয় দিন সেখানে চিকিৎসাধীন ছিলেন সিফাতুন। শুক্রবার রাতে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়।
নিহতের বাবা মোহাম্মদ নূর অভিযোগ করেন, মারধরের ঘটনার পর বিষয়টি ভিন্ন খাতে প্রবাহিত করতে সিফাতুন আত্মহত্যার চেষ্টা করেছেন এমন ঘটনা সাজানো হয়েছিল। তিনি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে প্রকৃত ঘটনা উদ্ঘাটন এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
এ বিষয়ে পটিয়া থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. জিয়াউল হক বলেন, গত ১৪ অক্টোবর ওই গৃহবধূকে মারধরের বিষয়ে তার মায়ের কাছ থেকে একটি লিখিত অভিযোগ পাওয়া গেছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তার মৃত্যু হয়েছে বলে আমরা জেনেছি। ঘটনার প্রকৃত কারণ অনুসন্ধান করে তদন্ত সাপেক্ষে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
ডিজে
