রাশিয়ার ক্রমবর্ধমান জেটচালিত ড্রোন হামলা মোকাবিলায় ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থা নতুন চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। রাজধানী কিয়েভে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা রক্ষায় মোতায়েন করা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তানির্ভর স্বয়ংক্রিয় কামান প্রত্যাশিত কার্যকারিতা দেখাতে পারছে না বলে জানিয়েছেন ইউক্রেনের এক সামরিক উপদেষ্টা। অন্যদিকে, রুশ হামলায় দেশটির জ্বালানি অবকাঠামো ক্ষতিগ্রস্ত ও রাজধানীর বিভিন্ন এলাকায় বিদ্যুৎ সরবরাহ ব্যাহত হচ্ছে।
প্রতিরক্ষার শেষ স্তরেও সীমাবদ্ধতা : ইউক্রেনের আকাশ প্রতিরক্ষাব্যবস্থায় যুদ্ধবিমান, দূরপাল্লার ও স্বল্পপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র এবং বিমানবিধ্বংসী কামান শত্রুপক্ষের আকাশযান ধ্বংসে ব্যর্থ হলে স্বয়ংক্রিয় মেশিনগান গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। তবে এসব ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্টের উপদেষ্টা ও বৈদ্যুতিন যুদ্ধবিশেষজ্ঞ সেরহি বেস্ক্রেস্তনভের মতে, স্বয়ংক্রিয় কামানগুলো পুরো শহরকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্য তৈরি হয়নি। এগুলো মূলত নির্দিষ্ট স্থাপনাÑ যেমন গুদাম, সেতু, উৎপাদনকেন্দ্র ও বিদ্যুৎ উপকেন্দ্র রক্ষায় কার্যকর হতে পারে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট ভলোদিমির জেলেনস্কির আগের এক বক্তব্য অনুযায়ী, মধ্য কিয়েভে ১২টি স্বয়ংক্রিয় কামান মোতায়েন করা হয়েছে। আরও আটটি মোতায়েনের পরিকল্পনা রয়েছে। তবে বাস্তব যুদ্ধে এসব কামানের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। প্রতিবেদন অনুযায়ী, উড়ন্ত লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানতে এগুলোকে তুলনামূলক বেশি গুলি ছুড়তে হয়। ফলে সাধারণভাবে পরিচালিত কামানের তুলনায় গোলাবারুদের ব্যবহার প্রায় ৪০ শতাংশ বেশি হতে পারে। তা ছাড়া, এসব কামানে হাতে গুলি ভরতে হয়, যা দ্রুতগতির ড্রোন প্রতিহত করার ক্ষেত্রে বাধা সৃষ্টি করতে পারে।
নির্বিচার গোলাবর্ষণে বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তা নিয়েও উদ্বেগ রয়েছে। কিয়েভের বাসিন্দাদের বিমান হামলার সতর্কসংকেত শুনলে জানালা থেকে দূরে এবং নিরাপদ আশ্রয়ে থাকার পরামর্শ দেওয়া হয়েছে।
জেটচালিত ড্রোনে বাড়ছে রুশ হামলা : ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর তথ্য অনুযায়ী, গত সেপ্টেম্বরে রাশিয়া প্রায় ৩ হাজার ৫০০টি জেটচালিত ড্রোন ব্যবহার করেছে। জুনের তুলনায় এ সংখ্যা প্রায় দশ গুণ বেশি বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। এসব ড্রোনের গতি ঘণ্টায় প্রায় ৬০০ কিলোমিটার পর্যন্ত হতে পারে। ফলে পুরোনো ধরনের ধীরগতির ড্রোন প্রতিহত করতে কার্যকর ইউক্রেনের কিছু প্রতিরোধী ড্রোন নতুন ধরনের দ্রুতগতির লক্ষ্যবস্তুর বিরুদ্ধে তুলনামূলক কম কার্যকর হচ্ছে। সাম্প্রতিক সপ্তাহগুলোয় ইউক্রেনের রেলব্যবস্থা, গ্যাস স্থাপনা, তথ্যকেন্দ্র ও প্রতিরক্ষা উৎপাদনকেন্দ্রেও রাশিয়ার হামলা বেড়েছে। দেশটির নেতারা জেটচালিত ড্রোন প্রতিহত করার পাশাপাশি স্বল্পমূল্যের বিমানবিধ্বংসী ক্ষেপণাস্ত্রের উৎপাদন বাড়ানোর পরিকল্পনা করছেন। ইউক্রেনের বিমানবাহিনীর কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, এসব স্বয়ংক্রিয় কামান প্রচলিত ড্রোনকে প্রায় ১ হাজার ৪০০ ও জেটচালিত ড্রোনকে প্রায় ৮০০ মিটার দূরত্ব থেকে আঘাত করতে পারে। তবে বাস্তবে সাফল্য নির্ভর করছে লক্ষ্যবস্তুর গতি, গোলাবারুদ ও অন্যান্য প্রতিরক্ষাব্যবস্থার সমন্বয়ের ওপর।
কিয়েভে হামলা, বিদ্যুৎ ও পানির সংকট : রাশিয়ার সাম্প্রতিক ব্যাপক হামলায় ইউক্রেনে অন্তত ছয়জন নিহত হয়েছে বলে দেশটির কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে। রাজধানী কিয়েভের বড় অংশে বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ হয়ে যায়। কিছু এলাকায় পানির সরবরাহও ব্যাহত হয়। কিয়েভের মেয়র ভিতালি ক্লিচকো জানিয়েছেন, রাজধানী ও আশপাশের অঞ্চলের জ্বালানি স্থাপনাগুলোয় ব্যাপক ক্ষেপণাস্ত্র হামলা হয়েছে। জরুরি পরিস্থিতিতে শহরের কয়েকটি জেলায় বিদ্যুৎ সরবরাহ বন্ধ রাখতে হয়েছে। ইউক্রেনের প্রেসিডেন্ট জেলেনস্কি অভিযোগ করেছেন, কিয়েভের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলার বিষয়ে পশ্চিমা মিত্রদের কাছ থেকে আগাম সতর্কবার্তা পাওয়া যায়নি। তার দাবি, ক্ষেপণাস্ত্রগুলো শহরের কাছাকাছি পৌঁছানোর পরই প্রতিরক্ষাব্যবস্থা সেগুলোর উপস্থিতি শনাক্ত করতে পেরেছিল। এদিকে, মস্কোর মেয়র সের্গেই সোবিয়ানিন দাবি করেছেন, রাশিয়ার রাজধানীর দিকে উড়ে আসা প্রায় ৫০০টি ইউক্রেনীয় ড্রোন ভূপাতিত করা হয়েছে। রাশিয়ার রোস্তভ অঞ্চলেও বহু ড্রোন ধ্বংসের কথা জানিয়েছে দেশটির কর্তৃপক্ষ।
নতুন ড্রোন ঘাঁটি নিয়ে উদ্বেগ : রয়টার্সের বিশ্লেষণ করা উপগ্রহ চিত্র এবং প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞদের বক্তব্য অনুযায়ী, ইউক্রেন সীমান্তের কাছে রাশিয়ার দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় রোস্তভ এলাকায় দ্রুত একটি বড় ড্রোন উৎক্ষেপণকেন্দ্র নির্মাণ করা হচ্ছে। বিশ্লেষকদের ধারণা, স্থাপনাটি থেকে গেরান-৪ ও গেরান-৫ ধরনের জেটচালিত ড্রোন উৎক্ষেপণ করা সম্ভব হবে। সেখানে আটটি উৎক্ষেপণ মঞ্চ নির্মাণের তথ্যও প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। কেন্দ্রটি পুরোপুরি চালু হলে এক দিনে শতাধিক ড্রোন ছোড়ার সক্ষমতা তৈরি হতে পারে বলে এক বিশেষজ্ঞের ধারণা। তবে এ বিষয়ে রাশিয়ার প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের বক্তব্য পাওয়া যায়নি। স্থাপনাটির প্রকৃত সক্ষমতা ও কার্যক্রম শুরুর সময়ও স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা যায়নি।
স্টারলিংক নিয়ে অনিশ্চয়তা : ইউক্রেনের সামরিক যোগাযোগ ও ড্রোন পরিচালনায় স্টারলিংক উপগ্রহভিত্তিক যোগাযোগব্যবস্থা গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে। সাম্প্রতিক সময়ে এ ব্যবস্থায় গতিসীমা আরোপের কারণে ইউক্রেনের কিছু সামরিক অভিযান ব্যাহত হওয়ার অভিযোগ উঠেছে। প্রযুক্তি উদ্যোক্তা ইলন মাস্ক বলেছেন, স্টারশিল্ড ব্যবস্থার ব্যবহার ও গতি নিয়ন্ত্রণের দায়িত্ব যুক্তরাষ্ট্রের সামরিক কর্তৃপক্ষের হাতে। অন্যদিকে, ইউক্রেনের কর্মকর্তারা যোগাযোগব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তবে বিধিনিষেধের প্রকৃত কারণ এবং সামরিক অভিযানে এর পূর্ণ প্রভাব সম্পর্কে বিস্তারিত তথ্য এখনো স্পষ্ট নয়।
সব মিলিয়ে দ্রুতগতির ড্রোনের ব্যবহার বৃদ্ধি, জ্বালানি অবকাঠামোয় হামলা এবং যোগাযোগব্যবস্থা নিয়ে অনিশ্চয়তা ইউক্রেনের প্রতিরক্ষাকে আরও জটিল করে তুলেছে। দেশটির জন্য এখন গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ হলো সীমিত গোলাবারুদ ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা কাজে লাগিয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্থাপনা এবং বেসামরিক জনগণের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা।