দীর্ঘদিন ধরে জমে থাকা জনরোষ ভারতে এক অস্থির পরিস্থিতির সৃষ্টি করেছে। এ অসন্তোষের সর্বশেষ বহিঃপ্রকাশ হিসাবে উঠে এসেছে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের অপসারণ ও ভোটার তালিকা সংশোধনের বিতর্কিত প্রক্রিয়াটি বাতিলের দাবি।
এ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে তালিকা থেকে ১৩ কোটি মানুষের নাম বাদ পড়েছে। গত এক সপ্তাহ ধরে দিল্লিতে প্রতিদিন বিক্ষোভ চলছে। এর জেরে ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর চালানো হয় কঠোর দমন-পীড়ন।
মঙ্গলবার দ্য গার্ডিয়ানের প্রতিবেদনে এসব তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়, গত শুক্রবার থেকে দিল্লি কার্যত অবরুদ্ধ (লকডাউন) হয়ে পড়ে। ব্যারিকেড, রাস্তা বন্ধ ও রাস্তায় আধা-সামরিক বাহিনীর টহলের কারণে শহরটি এক সামরিক এলাকায় পরিণত হয়।
শনিবার ককরোচ জনতা পার্টির নেতৃত্বে বিক্ষোভের আগে কর্তৃপক্ষ ব্যাপক কড়াকড়ি আরোপ করে—দিল্লিতে আসা ২৪৫টি ট্রেন বাতিল করা হয়; ৪৫টি মেট্রো স্টেশন বন্ধ রাখা হয়; শহরের প্রাণকেন্দ্রে ইন্টারনেট পরিষেবা বিচ্ছিন্ন করা হয় এবং অনেক আন্দোলনকারীকে গৃহবন্দি করা হয়।
শনিবার দিল্লি বিমানবন্দরে অবতরণের পরপরই ‘ককরোচ পার্টি’র প্রতিষ্ঠাতাদের এয়ার ইন্ডিয়ার একটি বিমান থেকে নামিয়ে আনা হয়। বিরোধী দলের নেতাদের বিভিন্ন থানায় আট ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে আটকে রাখা হয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা গেছে, শিক্ষার্থী ও আন্দোলনকারীদের সঙ্গে ধস্তাধস্তি করা হচ্ছে, তাদের মারধর করা হচ্ছে এবং রাস্তা থেকে টেনেহিঁচড়ে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে।
এমনকি কয়েকজন সাংবাদিককেও আটকের শিকার হতে হয়েছে। আটকদের আইনি সহায়তা দিতে আসা সুপ্রিমকোর্টের এক আইনজীবীকে পুলিশ তুলে নিয়ে যায় এবং এ সময় তার শার্ট ছিঁড়ে ফেলা হয়।
এ দমন-পীড়ন মুম্বাই পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়ে। সেখানে মহাত্মা গান্ধীর প্রপৌত্র তুষার গান্ধীকে একটি স্থানীয় বিক্ষোভে অংশ নেওয়া থেকে বিরত রাখতে পুলিশ তাকে তুলে নিয়ে যায়। সোমবার দিল্লি পুলিশ যন্তর মন্তরকে নির্ধারিত বিক্ষোভস্থল হিসাবে বাতিল ঘোষণা করে এবং এর পরিবর্তে তিনটি বিকল্প স্থানের সুপারিশ করে।
শনিবারের বিক্ষোভে অংশ নিয়ে আটক হন রাজনৈতিক কর্মী যোগেন্দ্র যাদব। দমন-পীড়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, ‘আমি চার দশক ধরে জনজীবনে ও রাজনীতির অঙ্গনে আছি। কিন্তু কোনো বিক্ষোভের জন্য এমন প্রস্তুতি আগে কখনো দেখিনি।
কল্পনার সব সীমা ছাড়িয়ে যাওয়া এক অসাধারণ ঘটনা ছিল এটি।’ তিনি এটাকে ‘রাষ্ট্রের সৃষ্ট আতঙ্ক’ হিসাবে অভিহিত করেন। তা সত্ত্বেও দিল্লির বিভিন্ন এলাকায় কড়া নিরাপত্তাবেষ্টনী উপেক্ষা করেই ছোট ছোট দল আকস্মিক বিক্ষোভ প্রদর্শন করছে।
ব্রিটিশ গণমাধ্যমটির প্রতিবেদনে বলা হয়, বিক্ষোভ দমনের ঘটনা নতুন কিছু নয়। তবে এবার রাজধানীতে দমন-পীড়নের ব্যাপকতা বিশেষভাবে লক্ষণীয়। ভারত-শাসিত কাশ্মীরে কেন্দ্রীয় সরকারের দমন-পীড়ন অবশ্য অনেক বেশি কঠোর ছিল—বিশেষ করে ২০১৯ সালে। তখন ৩৭০ ধারা বাতিলের পর সেখানে ব্যাপক বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়।
রাষ্ট্রীয় পদক্ষেপের এ কঠোরতা ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি সরকারের জন্য উচ্চ রাজনৈতিক ঝুঁকির বিষয়টিই তুলে ধরে। কারণ, সরকার ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন প্রক্রিয়া নিয়ে ক্রমবর্ধমান প্রতিরোধের মুখে পড়েছে; নির্বাচনি প্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা নিয়েও প্রশ্ন উঠছে।