ডেস্ক রিপোর্ট: শারদীয় দুর্গাপূজা শুরুর আগে বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুর ও মন্দিরে হামলার অভিযোগ ঘিরে দেশজুড়ে তৈরি হয়েছিল উদ্বেগ। এরপরই নড়েচড়ে বসে সরকার। এর প্রেক্ষিতে দুর্গাপূজার মূল আয়োজনকে ঘিরে দেশজুড়ে নিরাপত্তা জোরদার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। সরকারের আগাম প্রস্তুতি, পুলিশের তৎপরতা ও পূজা উদযাপন কমিটিগুলোর সমন্বয়ে উৎসবকে শান্তিপূর্ণ রাখার উদ্যোগ ছিল চোখে পড়ার মতো।
উৎসবের আনন্দ যেন কোনোভাবেই বিঘ্নিত না হয়, এ লক্ষ্য সামনে রেখে এবারের দুর্গাপূজায় নিরাপত্তা ব্যবস্থায় বিশেষ গুরুত্ব দেয় সরকার। দেশজুড়ে ৩৩ হাজারেরও বেশি পূজামণ্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিতে নেওয়া হয় বহুমুখী পদক্ষেপ। পুলিশ, আনসার, বিজিবি ও স্থানীয় প্রশাসনের সমন্বয়ে জোরদার করা হয় নজরদারি। সব বাহিনীর মিলে ৩ লাখের বেশি সদস্য মাঠ পর্যায়ে দায়িত্ব পালন করছেন। গুরুত্বপূর্ণ মণ্ডপগুলোতে সিসিটিভি ক্যামেরা, টহল এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি মোকাবিলায় বিশেষ প্রস্তুতির ব্যবস্থাও রাখা হয়।
১৭ অক্টোবর পুলিশ প্রধান বা মহাপরিদর্শক (আইজিপি) মো. আলী হোসেন ফকির জানান, দেশের ৩৩ হাজারেরও বেশি মণ্ডপে শান্তিপূর্ণভাবে দুর্গাপূজা উদযাপিত হচ্ছে। পূজা উদযাপন কমিটিগুলোর সঙ্গে সমন্বয়ের মাধ্যমে নিরাপত্তা নিশ্চিত করার কথাও তুলে ধরেন তিনি। তবে বিগত বছরগুলোর সাম্প্রদায়িক সহিংসতার তিক্ত অভিজ্ঞতা থেকেই মূলত এবারের নিরাপত্তায় বিশেষ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়।
উল্লেখ্য, বিগত বছরগুলোর মধ্যে ২০২১ সালের অক্টোবর মাসে সবচেয়ে ভয়াবহ সহিংসতার ঘটনা ঘটেছিল। সে সময় কুমিল্লার একটি পূজামণ্ডপে পবিত্র কোরআন অবমাননার একটি ভিডিও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর কুমিল্লা, নোয়াখালী, চাঁদপুরের হাজীগঞ্জ, ফেনী, চট্টগ্রাম ও ঢাকাসহ অন্তত ১০টিরও বেশি জেলায় ব্যাপক হামলা চালানো হয়। সারাদেশে ৮০টিরও বেশি মন্দির ও মণ্ডপ ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ এবং হিন্দু সম্প্রদায়ের ঘরবাড়িতে হামলা করা হয়। সেই সহিংসতায় ৯ জন নিহত হওয়ার পাশাপাশি শত শত মানুষ আহত হন এবং পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২২টি জেলায় বিজিবি মোতায়েনসহ ৪৫০ জনেরও বেশি মানুষকে গ্রেফতার করা হয়েছিল।
এমনকি শেখ হাসিনা সরকারের পতনের পর ২০২৪ সালের দুর্গাপূজার সময় এবং তার পরবর্তী বছরগুলোতেও নিরাপত্তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ ছিল। ২০২৫ সালের দুর্গাপূজা চলাকালীনও সারাদেশে প্রতিমা ভাঙচুর ও ঢিল ছোঁড়াসহ অন্তত ৪৯টি অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা রেকর্ড করা হয়, যার প্রেক্ষিতে ১৯ জনকে গ্রেফতার করেছিল পুলিশ।
সেই ধারাবাহিকতায় ২০২৬ সালেও পূজার আগে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রতিমা ভাঙচুর ও হামলার ঘটনা সামনে এলে আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। তবে পরবর্তীতে ২০ অক্টোবর পুলিশ জানায়, এসব ঘটনার মাঠপর্যায়ের অধিকতর যাচাই-বাছাইয়ে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি নষ্ট করার উদ্দেশ্যে কোনো সুনির্দিষ্ট বা পরিকল্পিত ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি; বেশির ভাগ ঘটনাই ব্যক্তিগত বা স্থানীয় বিরোধ থেকে ঘটেছে। এমন প্রেক্ষাপটে উৎসবের দিনগুলোতে নিরাপত্তা বজায় রাখা, গুজব প্রতিরোধ এবং ধর্মীয় সম্প্রীতি রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ভূমিকা ছিল অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
অতীতের সব আশঙ্কা আর নিরাপত্তাহীনতার মেঘ কাটিয়ে এবারের দুর্গাপূজা যেভাবে সুশৃঙ্খল, আনন্দময় ও নিচ্ছিদ্র নিরাপত্তায় উদযাপিত হয়েছে তা সরকারের দূরদর্শী পরিকল্পনা ও কঠোর অবস্থানেরই এক অনন্য দৃষ্টান্ত। মাঠপর্যায়ে আইনশৃঙ্খলারক্ষাকারী বাহিনীর সার্বক্ষণিক উপস্থিতি, স্থানীয় প্রশাসনের নিবিড় তদারকি এবং দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণের ফলে দেশের প্রতিটি মণ্ডপে সাধারণ মানুষ নির্ভাবনায় উৎসবে শামিল হতে পেরেছেন। শান্তি, সম্প্রীতি ও শৃঙ্খলার এই সফল আয়োজন ছিল নিঃসন্দেহে সরকারের অত্যন্ত সময়োপযোগী ও প্রশংসনীয় এক পদক্ষেপ। নিরাপদ পরিবেশে ধর্মীয় উৎসব উদযাপনের এই প্রত্যাশা শুধু দুর্গাপূজায় নয়, সব ধর্মের মানুষের প্রতিটি উৎসবেই অটুট থাকুক, এমনটাই প্রত্যাশা সবার।
এটিভি/এসটিও
