রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) পদে বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তাদের থেকে নিয়োগের সম্ভাবনা নিয়ে ব্যাংক খাতে জোর গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে। এ নিয়ে ক্ষুব্ধ রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের কর্মকর্তারা। তাদের দাবি, সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে নিয়োগের আগে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অভ্যন্তরে দীর্ঘদিন ধরে কাজ করা যোগ্য, অভিজ্ঞ ও দক্ষ কর্মকর্তাদের যথাযথভাবে মূল্যায়ন করতে হবে। যোগ্য প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ব্যাংক থেকে এমডি নিয়োগ দেওয়া হলে পদোন্নতির ন্যায্যতা ও ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব বিকাশের পথরুদ্ধ হয়ে যেতে পারে বলেও মত সংশ্লিষ্টদের।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদের নেতারা বলছেন, এমডি নিয়োগের ক্ষেত্রে কোনো প্রার্থীকে শুধু বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তা হওয়ার কারণে অযোগ্য বিবেচনা করা উচিত নয়। তবে একইভাবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ কর্মকর্তাদের দীর্ঘ অভিজ্ঞতা, যোগ্যতা, কর্মদক্ষতা ও নেতৃত্বের সক্ষমতাকেও পাশ কাটানো যাবে না। তাদের মতে, নিয়োগের ক্ষেত্রে স্বচ্ছতা, যোগ্যতা, সততা, অভিজ্ঞতা ও নিরপেক্ষ মূল্যায়নকে প্রধান বিবেচনায় রাখতে হবে।
এ বিষয়ে সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো ড. ফাহমিদা খাতুন কালবেলাকে বলেন, অনেক বছর ধরে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলো ধারাবাহিকভাবে দুর্বল অবস্থায় রয়েছে। এই সময়ে নিয়োগের অভিজ্ঞতার শর্ত শিথিল করার পেছনে সরকারের উদ্দেশ্য হয়তো বেসরকারি খাতের দক্ষ ব্যাংকারদের এসব ব্যাংকের নেতৃত্বে আনার সুযোগ তৈরি করা। তবে শুধু একজন এমডি নিয়োগ করলেই দুর্বল ব্যাংকের অবস্থার উন্নতি হবে না; ব্যাংক পরিচালনার সামগ্রিক পরিবেশও বদলাতে হবে।
জানা গেছে, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকগুলোতে এমডি নিয়োগের জন্য এরই মধ্যে সরকারের বিভিন্ন সংস্থার প্রতিবেদনের আলোকে একাধিক তালিকা তৈরি করা হয়েছে। ওই তালিকার আলোকে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদের হাতেও রয়েছে ২৪ কর্মকর্তার একটি তালিকা। ওই তালিকার কয়েকজন এরই মধ্যে সরকারি ও বিশেষায়িত ব্যাংকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক হিসেবে দায়িত্বও নিয়েছেন।
বেসরকারি ব্যাংক থেকে এলে চ্যালেঞ্জ: বেসরকারি ব্যাংকের কর্মকর্তারা দক্ষ ও অভিজ্ঞ হতে পারেন। তবে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের প্রশাসনিক কাঠামো, চাকরিবিধি, পদোন্নতি ও বদলি ব্যবস্থা, সরকারি নীতি বাস্তবায়ন এবং জনস্বার্থসংশ্লিষ্ট দায়িত্বের সঙ্গে তাদের নতুন করে মানিয়ে নিতে সময় লাগতে পারে। বিশেষ করে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের পুরোনো ও বড় অঙ্কের খেলাপি ঋণ, আদালতসংশ্লিষ্ট মামলা, জামানত আদায়, পুনঃতপশিল, সরকারি কর্মসূচি বাস্তবায়ন এবং গ্রামীণ ও কৃষিঋণ কার্যক্রম পরিচালনায় সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের অভ্যন্তরীণ বাস্তবতা জানা গুরুত্বপূর্ণ বলে মনে করছেন অনেকে।
তবে এসব চ্যালেঞ্জ বেসরকারি ব্যাংকের কোনো প্রার্থীর জন্য অনিবার্য—এমন দাবিও করছে না রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক ঐক্য পরিষদ। তাদের বক্তব্য, যোগ্যতা, সততা, নেতৃত্বের সক্ষমতা এবং রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের বাস্তবতা বোঝার সামর্থ্য থাকলে বাইরের প্রার্থীরাও দায়িত্ব পালন করতে পারেন। একইভাবে অভ্যন্তরীণ প্রার্থীদের ক্ষেত্রেও যোগ্যতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
ছয় দফা দাবি: এমডি নিয়োগ নিয়ে রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদের মূল দাবি হলো—প্রথমে সংশ্লিষ্ট ব্যাংকের যোগ্য এএমডি ও ডিএমডিদের নীতিমালার আলোকে মূল্যায়ন করতে হবে। যোগ্য অভ্যন্তরীণ প্রার্থী থাকা সত্ত্বেও বাইরের প্রার্থী নিয়োগের জন্য নীতিমালা পরিবর্তনের প্রয়োজন আছে কি না, তা নিরপেক্ষভাবে পর্যালোচনা করতে হবে। এ ছাড়া শূন্য এমডি পদে দ্রুত নিয়োগ, অভ্যন্তরীণ ও বাইরের প্রার্থীদের জন্য অভিন্ন যোগ্যতার মানদণ্ড, অভিজ্ঞ কর্মকর্তাদের পেশাগত মর্যাদার স্বীকৃতি এবং পুরো নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদের ভাষ্য, দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞতা ও যোগ্যতা অর্জন করে যারা এএমডি ও ডিএমডি পদে পৌঁছেছেন, তাদের জন্য সর্বোচ্চ নেতৃত্বে যাওয়ার পথ উন্মুক্ত না থাকলে ভবিষ্যৎ নেতৃত্ব তৈরির প্রক্রিয়াই দুর্বল হবে। তাই রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের এমডি পদে নিয়োগে আগে অভ্যন্তরীণ যোগ্য কর্মকর্তাদের মূল্যায়ন এবং এরপর প্রয়োজন হলে বাইরের প্রার্থী বিবেচনার দাবি জানাচ্ছেন। অন্যথায় দাবি আদায়ে আন্দোলনে নামবেন তারা।
রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংক কর্মকর্তা ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক মো. মোতাহের হোসেন কালবেলাকে বলেন, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকে যোগ্য ও অভিজ্ঞ কর্মকর্তা থাকা সত্ত্বেও বেসরকারি ব্যাংক থেকে ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) নিয়োগ উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশ ব্যাংকের সহকারী মুখপাত্র মোহাম্মদ শাহরিয়ার সিদ্দিকী কালবেলাকে বলেন, এ ধরনের সংবাদ এরই মধ্যে গণমাধ্যম সূত্রে জানতে পেরেছি; কিন্তু আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগ বা বাংলাদেশ ব্যাংকে থেকে এ ধরনের নীতিমালা পরিবর্তন সংক্রান্ত কোনো নথি আমি পাইনি। তবে এ ধরনের নিয়োগ নতুন নয়, রাষ্ট্রায়ত্ত ব্যাংকের স্বার্থে এই নিয়োগ দেওয়া হতে পারে। এরই মধ্যে ২০০৫-০৬ সালে অগ্রণী ব্যাংকের বর্তমান চেয়ারম্যান সৈয়দ আবু নাসের বখতিয়ার আহমেদকে সরকার নিয়োগ দিয়েছে।
