পাঁচ শিক্ষার্থীর উদ্যোগে যাত্রা, ক্যাম্পাস সাংবাদিকতায় সক্রিয় ভূমিকার চেষ্টা; প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীতে অর্জন মূল্যায়ন ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনায় গুরুত্ব
নতুন একটি সংগঠন হিসেবে যাত্রার শুরু থেকেই ছিল নানা চ্যালেঞ্জ। পড়াশোনার পাশাপাশি সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, প্রতিবেদন তৈরি এবং সাংগঠনিক কার্যক্রম পরিচালনা—সবকিছু সামলে এগিয়ে যেতে হয়েছে সদস্যদের। সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের শিক্ষার্থীদের সমস্যা, সম্ভাবনা, সাফল্য ও বিভিন্ন কার্যক্রম সংবাদমাধ্যমে তুলে ধরার চেষ্টা করেছে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সাংবাদিক সমিতি (DPIJA)। সেই পথচলার এক বছর পূর্ণ হচ্ছে ২৫ অক্টোবর। প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকীকে সামনে রেখে সংগঠনটি গত এক বছরের অভিজ্ঞতা ও সীমাবদ্ধতা মূল্যায়নের পাশাপাশি আগামী দিনে আরও দক্ষ, দায়িত্বশীল ও পেশাদার সাংবাদিকতা চর্চার প্রত্যাশা করছে।
প্রাসঙ্গিক সংবাদ
২০২৫ সালের ২৫ অক্টোবর পাঁচজন উদ্যমী শিক্ষার্থীর উদ্যোগে যাত্রা শুরু করে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সাংবাদিক সমিতি। ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ ঘটনাবলি সংবাদ আকারে প্রকাশ, শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর বৃহত্তর পরিসরে তুলে ধরা এবং কারিগরি শিক্ষার সুযোগ, সম্ভাবনা ও সীমাবদ্ধতা সম্পর্কে জনসচেতনতা তৈরির লক্ষ্য নিয়ে সংগঠনটির যাত্রা শুরু হয়।
প্রতিষ্ঠার পর থেকে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন ঘটনা, শিক্ষার্থীদের যৌক্তিক দাবি-দাওয়া, সাফল্য ও বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরার চেষ্টা করেছেন সংগঠনটির সদস্যরা। সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, প্রতিবেদন তৈরি, ছবি ও ভিডিও ধারণ এবং সংবাদ প্রকাশের মধ্য দিয়ে তাঁরা সাংবাদিকতার বাস্তব অভিজ্ঞতা অর্জন করেছেন। একই সঙ্গে সমিতির কার্যনির্বাহী কমিটির সদস্যদের কেউ কেউ ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন জাতীয় গণমাধ্যমেও কাজ করছেন।
নতুন সংগঠন, নানা চ্যালেঞ্জ
একটি নতুন সাংবাদিক সংগঠনের কার্যক্রম পরিচালনা করতে সাংগঠনিক সমন্বয়, সদস্যদের দক্ষতা বৃদ্ধি এবং নিয়মিত সংবাদ প্রকাশের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা গুরুত্বপূর্ণ। ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সাংবাদিক সমিতির সদস্যদেরও পড়াশোনার পাশাপাশি এসব দায়িত্ব পালন করতে হয়েছে। কখনো সময়ের সীমাবদ্ধতা, কখনো প্রয়োজনীয় সুযোগ-সুবিধার অভাব, আবার কখনো সংবাদ সংগ্রহ ও প্রতিবেদন তৈরির ক্ষেত্রে নতুন অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হয়েছে তাঁদের।
তবে এসব চ্যালেঞ্জের মধ্যেও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী কাজ চালিয়ে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন সদস্যরা। ক্যাম্পাসের সমস্যা ও সম্ভাবনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অর্জন, বিভিন্ন আয়োজন এবং কারিগরি শিক্ষার নানা দিক তুলে ধরার সুযোগ তৈরি হয়েছে। একই সঙ্গে এক বছরের অভিজ্ঞতা সংগঠনটির সামনে নিজেদের কাজের মান উন্নয়ন, সাংগঠনিক সক্ষমতা বৃদ্ধি এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতা আরও ভালোভাবে চর্চার প্রয়োজনীয়তাও তুলে ধরেছে।
সাংবাদিকতায় সংবাদ প্রকাশের পাশাপাশি তথ্যের সত্যতা যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য গ্রহণ, বস্তুনিষ্ঠতা বজায় রাখা এবং ভুল হলে তা সংশোধনের মানসিকতা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে এসব ক্ষেত্রে আরও দক্ষ হয়ে ওঠার সুযোগ রয়েছে সংগঠনটির সামনে।
সাংগঠনিক সম্পাদকের চোখে এক বছরের পথচলা
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সাংবাদিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক মেহেদী হাসান বাপ্পি বলেন, “একটি নতুন সংগঠন হিসেবে শুরুতে আমাদের সামনে নানা চ্যালেঞ্জ ছিল। পড়াশোনার পাশাপাশি সাংবাদিকতার কাজ পরিচালনা করা, সদস্যদের মধ্যে সমন্বয় বজায় রাখা এবং নিয়মিত কার্যক্রম এগিয়ে নেওয়া সহজ ছিল না। তবে সবাই নিজেদের জায়গা থেকে চেষ্টা করেছেন। এই এক বছরে আমরা অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি, একই সঙ্গে আমাদের সীমাবদ্ধতাগুলোও বুঝতে পেরেছি।”
তিনি আরও বলেন, “আমরা চাই, আগামী দিনে সংগঠনের কার্যক্রম আরও গোছানো ও গতিশীল হোক। সদস্যদের সাংবাদিকতার দক্ষতা বাড়ানো, পারস্পরিক সমন্বয় জোরদার করা এবং ক্যাম্পাসের গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো আরও দায়িত্বশীলভাবে তুলে ধরার দিকে আমরা গুরুত্ব দিতে চাই। সবার সহযোগিতা পেলে ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সাংবাদিক সমিতি ভবিষ্যতে আরও ভালো কাজ করতে পারবে বলে আশা করি।”
শিক্ষার্থীদের প্রত্যাশা, ক্যাম্পাসের বাস্তব চিত্র উঠে আসুক সংবাদে
ক্যাম্পাস সাংবাদিকতার অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ অংশীজন সাধারণ শিক্ষার্থীরা। তাঁদের সমস্যা, প্রত্যাশা, সাফল্য ও সম্ভাবনা সংবাদে যথাযথ গুরুত্ব পেলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সাংবাদিক সংগঠনের যোগাযোগ আরও কার্যকর হতে পারে। একই সঙ্গে ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিষয়ে তথ্যভিত্তিক আলোচনা তৈরির সুযোগও বাড়ে।
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের সিভিল বিভাগের চতুর্থ পর্বের শিক্ষার্থী তামিম আহমেদ বলেন, “একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংবাদিক সমিতি থাকলে শিক্ষার্থীদের বিভিন্ন সমস্যা, দাবি-দাওয়া ও সম্ভাবনার কথা তুলে ধরার একটি মাধ্যম তৈরি হয়। আমরা চাই, ক্যাম্পাসের যেসব বিষয় শিক্ষার্থীদের পড়াশোনা ও দৈনন্দিন জীবনের সঙ্গে জড়িত, সেগুলো যেন গুরুত্বের সঙ্গে সংবাদে উঠে আসে। পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের সাফল্য ও ভালো উদ্যোগগুলোও তুলে ধরা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “সাংবাদিক সমিতি আরও সক্রিয়ভাবে কাজ করলে শিক্ষার্থীরা ক্যাম্পাসের বিভিন্ন বিষয়ে জানতে পারবেন এবং নিজেদের মতামত প্রকাশের সুযোগ পাবেন। আগামী দিনে সংগঠনটি আরও ভালো কাজ করবে—এটাই আমাদের প্রত্যাশা।”
দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার ওপর গুরুত্ব শিক্ষকের
একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে সাংবাদিকতার ভূমিকা শুধু ঘটনা প্রকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। শিক্ষার্থীদের সাফল্য, শিক্ষা পরিবেশ, সমস্যা ও সম্ভাবনাকে তথ্যের যথার্থতা বজায় রেখে তুলে ধরাও এর গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এ ক্ষেত্রে বস্তুনিষ্ঠতা, দায়িত্বশীলতা এবং সংশ্লিষ্ট সবার বক্তব্যকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউটের মেকানিক্যাল বিভাগের ইন্সট্রাক্টর হাফিজ আল আসাদ বলেন, “ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা শিক্ষার্থীদের মধ্যে সচেতনতা তৈরি এবং প্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন কার্যক্রম তুলে ধরার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। তবে সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্যের সত্যতা যাচাই, বস্তুনিষ্ঠতা ও দায়িত্বশীলতা বজায় রাখা জরুরি। ইতিবাচক কার্যক্রমের পাশাপাশি কোনো সমস্যা তুলে ধরার ক্ষেত্রেও সংশ্লিষ্ট বিষয়গুলো যথাযথভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।”
তিনি আরও বলেন, “আমি আশা করি, ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সাংবাদিক সমিতি আগামী দিনে আরও দক্ষতা ও পেশাদারত্বের সঙ্গে কাজ করবে। শিক্ষার্থীদের সাফল্য, কারিগরি শিক্ষার সম্ভাবনা এবং প্রতিষ্ঠানের উন্নয়নমূলক কার্যক্রম তুলে ধরার পাশাপাশি গঠনমূলক সাংবাদিকতার চর্চা অব্যাহত রাখবে।”
সভাপতির বক্তব্য: অভিজ্ঞতা কাজে লাগিয়ে এগিয়ে যেতে চাই
ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সাংবাদিক সমিতির সভাপতি আরমান খাঁন ছামির বলেন, “এক বছরের এই পথচলা আমার কাছে আনন্দের পাশাপাশি আত্মমূল্যায়নেরও সময়। নতুন সংগঠন হিসেবে আমাদের নানা চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি হতে হয়েছে। পড়াশোনার পাশাপাশি সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই ও প্রতিবেদন তৈরির কাজ করতে গিয়ে অনেক অভিজ্ঞতা অর্জন করেছি। সব কাজ হয়তো প্রত্যাশা অনুযায়ী করতে পারিনি, তবে প্রতিটি অভিজ্ঞতা থেকে শেখার চেষ্টা করেছি।”
তিনি বলেন, “আমি বিশ্বাস করি, দায়িত্বশীল সাংবাদিকতা একটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে স্বচ্ছতা, জবাবদিহিতা ও ইতিবাচক পরিবর্তনে ভূমিকা রাখতে পারে। আমরা শিক্ষার্থীদের কণ্ঠস্বর তুলে ধরতে, ক্যাম্পাসের বাস্তব চিত্র সামনে আনতে এবং কারিগরি শিক্ষার সম্ভাবনাকে বৃহত্তর পরিসরে পৌঁছে দিতে কাজ করে যেতে চাই। এ জন্য সবার গঠনমূলক পরামর্শ, সহযোগিতা ও দিকনির্দেশনা আমাদের প্রয়োজন।”
আগামী দিনের পরিকল্পনা সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমরা চাই, সংগঠনের সদস্যরা সংবাদ সংগ্রহ, তথ্য যাচাই, অনুসন্ধানী প্রতিবেদন ও মাল্টিমিডিয়া সাংবাদিকতায় আরও দক্ষ হয়ে উঠুন। শিক্ষার্থীদের সমস্যা ও সম্ভাবনার পাশাপাশি কারিগরি শিক্ষার সাফল্য, উদ্ভাবন, দক্ষতা উন্নয়ন এবং কর্মসংস্থানের সুযোগগুলোও আরও গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরতে চাই। এক বছরের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে আরও দায়িত্বশীল ও পেশাদারভাবে কাজ করাই আমাদের লক্ষ্য।”
সামনে আরও ভালো কাজের প্রত্যাশা
প্রথম প্রতিষ্ঠাবার্ষিকী সংগঠনটির জন্য গত এক বছরের কাজ পর্যালোচনা এবং ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নির্ধারণের একটি গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ। আগামী দিনে সংবাদ সংগ্রহ ও তথ্য যাচাইয়ের দক্ষতা বৃদ্ধি, অনুসন্ধানী সাংবাদিকতার চর্চা, মাল্টিমিডিয়া কনটেন্ট তৈরি এবং সাংবাদিকতার নৈতিকতা বিষয়ে প্রশিক্ষণ কার্যক্রম জোরদার করা গেলে সংগঠনটির কার্যক্রম আরও সমৃদ্ধ হতে পারে।
একই সঙ্গে কারিগরি শিক্ষার্থীদের উদ্ভাবন, গবেষণা, দক্ষতা উন্নয়ন, কর্মসংস্থানের সুযোগ এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিভিন্ন অর্জন নিয়ে আরও তথ্যসমৃদ্ধ প্রতিবেদন প্রকাশের সুযোগ রয়েছে। শিক্ষার্থীদের সমস্যা তুলে ধরার পাশাপাশি ইতিবাচক উদ্যোগ ও সম্ভাবনার গল্প সামনে আনতে পারলে ক্যাম্পাস সাংবাদিকতা আরও ভারসাম্যপূর্ণ ও কার্যকর হয়ে উঠবে।
এ ক্ষেত্রে শিক্ষার্থী, শিক্ষক, প্রশাসন, উপদেষ্টা ও শুভানুধ্যায়ীদের সহযোগিতাও গুরুত্বপূর্ণ। সংবাদ প্রকাশের ক্ষেত্রে তথ্য যাচাই, সংশ্লিষ্ট পক্ষের বক্তব্য নিশ্চিত করা এবং গঠনমূলক সমালোচনার পরিবেশ বজায় রাখার মধ্য দিয়ে সংগঠনটি ভবিষ্যতে আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে।
পাঁচ শিক্ষার্থীর উদ্যোগে শুরু হওয়া ঢাকা পলিটেকনিক ইনস্টিটিউট সাংবাদিক সমিতির এক বছরের পথচলায় যেমন রয়েছে অভিজ্ঞতা ও কাজের প্রচেষ্টা, তেমনি রয়েছে নিজেদের আরও উন্নত করার সুযোগ। সীমাবদ্ধতা থেকে শিক্ষা নিয়ে, সাংগঠনিক সক্ষমতা বাড়িয়ে এবং সত্য ও বস্তুনিষ্ঠতাকে গুরুত্ব দিয়ে আগামী দিনে আরও ভালো কাজ করার প্রত্যাশা সংগঠনটির।
প্রথম বছর পূর্ণ হওয়া তাই কেবল একটি মাইলফলক নয়; বরং আরও দায়িত্বশীল, দক্ষ ও পেশাদার সাংবাদিকতার পথে এগিয়ে যাওয়ার নতুন সূচনা।
-20261024151939.jpg&w=1440&q=75)