মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ইরানের বিরুদ্ধে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা প্রথমবারের মতো সরাসরি নাকচ করে দিয়েছেন। তবে নিকট–ভবিষ্যতে তাঁর প্রশাসন ‘মাদার অব অল বম্বস’—এমওএবি (সবচেয়ে শক্তিশালী অপারমাণবিক বোমা) নামে পরিচিত যুক্তরাষ্ট্রের সবচেয়ে মারাত্মক বোমাটি প্রয়োগের চিন্তাভাবনা করছে। মার্কিন সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত এমন প্রতিবেদন ট্রাম্প নাকচ করে দেননি।
ডানপন্থী মার্কিন নিউজ সাইট ‘নিউজম্যাক্স’-এ বৃহস্পতিবার প্রকাশিত এক সাক্ষাৎকারে ট্রাম্প ইঙ্গিত দেন, পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কোনো পরিকল্পনা তাঁর নেই। তবে তিনি স্পষ্ট করে জানান, বিধ্বংসী আকাশপথের অস্ত্র জিবিইউ-৪৩/বি ম্যাসিভ অর্ডন্যান্স এয়ার ব্লাস্ট বোমা মাদার অব অল বম্বস কোনো পারমাণবিক অস্ত্র নয়।
ট্রাম্প নিউজম্যাক্সকে বলেন, ‘আমি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করব না। আমাদের তা করার প্রয়োজন নেই। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।’
যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল ইরানে আগ্রাসনের শুরুর দিকে সম্ভাব্য পারমাণবিক সংঘাতের জল্পনা-কল্পনা হয়েছিল। আগে কখনো কিছু না বললেও এই মন্তব্যের মাধ্যমে পারমাণবিক ইস্যুতে ট্রাম্প প্রথম কোনো সুনির্দিষ্ট বক্তব্য দিলেন। যুদ্ধের আরেকটি ধাপ যে আসন্ন, সম্ভবত ৩ নভেম্বরের মার্কিন মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর, এই বক্তব্যের মাধ্যমে সেই গুঞ্জনও সত্য প্রমাণিত হতে যাচ্ছে বলে মনে হচ্ছে।

ট্রাম্প কী বলেছেন
ট্রাম্প নিউজম্যাক্সকে বলেন, যুক্তরাষ্ট্র সত্যিই ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলোতে বিশেষ করে পিকঅ্যাক্স পর্বতে আবার হামলা চালাতে পারে, যেখানে গ্রানাইট পাথরের বহু গভীরে তেহরান একটি পারমাণবিক স্থাপনা লুকিয়ে রেখেছে বলে মনে করা হয়।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট পারমাণবিক অস্ত্র বা কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের সম্ভাবনা নাকচ করে দেন।
ট্রাম্প বলেন, ‘আমি পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করব না। আমাদের তা করার প্রয়োজন নেই। আমরা বিশ্বের সবচেয়ে বড় পারমাণবিক শক্তিধর দেশ।’
মার্কিন প্রেসিডেন্ট আরও স্পষ্ট করেন, সিএনএনের প্রতিবেদনে মার্কিন সরকার শক্তিশালী বোমা ব্যবহারের চিন্তাভাবনা করছে বলে যে জানানো হয়েছে, সেই ‘এমওএবি’ কোনো পারমাণবিক বোমা নয়।
এমওএবি একটি ‘কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র’ (যার অর্থ অপেক্ষাকৃত ছোট আকারের পারমাণবিক গোলাবারুদ) কি না, এমন প্রশ্নের জবাবে ট্রাম্প আবারও জোর দিয়ে বলেন, এটি আসলে তা নয়।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, ‘মাদার অব অল বম্বস’ পারমাণবিক কিছু নয়। এটি মোটেও পারমাণবিক নয়। এটি কেবল একটি বেশ বড় আকারের বোমা।
ইরানে এই বোমা ব্যবহারের অনুমোদন দিয়েছেন কি না, সে বিষয়ে মন্তব্য করতে রাজি হননি রিপাবলিকান ট্রাম্প।
ট্রাম্প আরও ইঙ্গিত দেন, অদূর ভবিষ্যতে নতুন করে হামলা চালানোর সম্ভাবনা রয়েছে। তিনি যুক্তি দেন, ‘যুক্তরাষ্ট্র এখনই যুদ্ধ শেষ করতে পারে না। কারণ, ইরান যাতে পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করতে না পারে, তা নিশ্চিত করতে হবে। যদি তাদের কাছে এটি থাকত, তবে আমার মনে হয়, তারা সঙ্গে সঙ্গেই তা ব্যবহার করত।’
ট্রাম্প বলেন, শক্তি প্রয়োগের মাধ্যমে বা কূটনীতির মাধ্যমে এই যুদ্ধ ‘খুব শিগগির’ শেষ হবে এবং তারপর তেলের দাম কমে যাবে।
স্থল সৈন্য পাঠাবেন কি না, জানতে চাওয়া হলে ট্রাম্প বলেন, ‘না, আমি তেমন কিছু দেখছি না, আমি তা মনে করি না।’ যুদ্ধের শুরুর দিকে ট্রাম্প সেনা পাঠানোর বিষয়ে মন্তব্য করেছিলেন। তবে বিশ্লেষকেরা বলেছিলেন, ইরানের পাহাড়ি ভূখণ্ডের কারণে তা মার্কিন সেনাদের জন্য বিধ্বংসী হবে।

‘মাদার অব অল বম্বস’ আসলে কী
এমওএবিতে প্রায় ৮ হাজার ৫০০ কেজি (১৮ হাজার পাউন্ড বা ৮ দশমিক ৫ টন) উচ্চ ক্ষমতাসম্পন্ন বিস্ফোরক বহন করা যায়। এর ওজন ৯ হাজার ৮০০ কেজি (২১ হাজার ৬০৫ পাউন্ড বা প্রায় ১০ টন)। এই বোমা প্রায় চারটি গাড়ির ওজনের সমান এবং এটি ৯ মিটারের বেশি (প্রায় ৩০ ফুট) লম্বা। স্টেলথ বোমারু বিমান এ ধরনের বহনের জন্য অত্যন্ত ছোট। তাই এটি বহনের জন্য আরও বড় লকেড সি-১৩০ হারকিউলিস পরিবহন বিমান ব্যবহার করতে হয়।
বিশেষজ্ঞরা আল–জাজিরাকে বলেন, এটি মাটি থেকে কয়েক মিটার ওপরে বিস্ফোরিত করানোর জন্য তৈরি করা হয়েছে, যা এক কিলোমিটার ব্যাসার্ধের মধ্যে তীব্র আগুনের গোলা তৈরি করে ভবন ও উপরিভাগের অন্যান্য শক্ত কাঠামো ধ্বংস করতে পারে।
মার্কিন বিমানবাহিনী বলেছে, এটি এতটাই শক্তিশালী যে পরীক্ষায় এর বিস্ফোরণ থেকে তৈরি হওয়া ‘মাশরুম মেঘ’ ৩২ কিলোমিটার দূর থেকেও দেখা গেছে।
ব্রাসেলসভিত্তিক সামরিক ও অস্ত্র বিশ্লেষক এলাইজা ম্যাগিয়ার বলেন, ‘এর বিশাল বিস্ফোরক চার্জ উন্মুক্ত জায়গায় থাকা সেনা, সরঞ্জাম এবং স্পর্শকাতর কাঠামোর বিরুদ্ধে বিধ্বংসী প্রভাব ফেলতে পারে। এর উদ্দেশ্য হলো ভূপৃষ্ঠজুড়ে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী বিস্ফোরণ ঘটানো।’
তবে ম্যাগিয়ার বলেন, ভূপৃষ্ঠে আঘাত হানা এই বিশাল বিস্ফোরকটি ইরানের মাটির গভীরে পুতে রাখা পারমাণবিক স্থাপনাগুলোর বিরুদ্ধে কার্যকর হবে কি না, তা নিয়ে সন্দেহ রয়েছে। তিনি আরও যোগ করেন, এত বড় মালবাহী বিমানের জন্য ইরানের আকাশে প্রবেশ করা কঠিন হতে পারে।
পারমাণবিক অস্ত্র সম্পর্কে ট্রাম্প আগে কী বলেছিলেন
ট্রাম্প কখনোই স্পষ্টভাবে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের কথা উল্লেখ করেননি। তবে তিনি তা ব্যবহারের সম্ভাবনা পুরোপুরি উড়িয়েও দেননি।
সংঘাতের শুরুর দিনগুলোতে ওয়াশিংটন পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করতে পারে কি না, তা নিয়ে ব্যাপক জল্পনা-কল্পনা ছিল। এর প্রধান কারণ ছিল, তেহরানকে উদ্দেশ করে ট্রাম্পের দেওয়া অসংখ্য চরম হুমকিমূলক বক্তব্য।
উদাহরণস্বরূপ, গত এপ্রিলে ইরান যখন হরমুজ প্রণালিতে জাহাজের ওপর অবরোধ আরোপ করে, তখন ট্রাম্প তাঁর নিজের মালিকানাধীন ‘ট্রুথ সোশ্যাল’ সাইটে পোস্ট করে লিখেছিলেন, ‘ইরান শান্তিচুক্তিতে সম্মত না হলে এবং হরমুজ আবার খুলে না দিলে আজ রাতে একটি গোটা সভ্যতা ধ্বংস হয়ে যাবে, যা আর কখনোই ফিরিয়ে আনা সম্ভব হবে না।।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ইরানের অবকাঠামো ধ্বংস করার হুমকি দিয়ে বলেছিলেন, এই বোমাবর্ষণ অভিযান হবে ইরানের ‘বিদ্যুৎকেন্দ্র এবং সেতু ধ্বংসের দিন’, যা একই সঙ্গে ঘটবে।
বিশেষজ্ঞরা ব্যাপকভাবে তাঁর বক্তব্যকে পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহার করে ধ্বংসের হুমকি হিসেবেই ব্যাখ্যা করেছিলেন। তবে সেটিও ইরানকে আলোচনায় বসাতে ব্যর্থ হয়।
পরবর্তী সপ্তাহগুলোতে ট্রাম্প তাঁর এই যুদ্ধংদেহী মনোভাব থেকে কিছুটা সরে এলেও গত মাসে নিউইয়র্কে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদে তিনি আবারও বলেন, তিনি ইরানকে ‘ধ্বংস’ করে দিতে পারেন। তিনি সাধারণ পরিষদে আরও বলেছিলেন, মধ্যবর্তী নির্বাচনের পর একটি চুক্তি হবে বলে তিনি বিশ্বাস করেন।
‘কৌশলগত’ পারমাণবিক অস্ত্র কী
‘কৌশলগত’ পারমাণবিক অস্ত্র (টিএনডব্লিউ) হলো অপেক্ষাকৃত ছোট পারমাণবিক যুদ্ধাস্ত্র, যা ব্যাপক ধ্বংসলীলার জন্য তৈরি। তবে এটি কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্রের মতো নয়; বরং যুদ্ধক্ষেত্রের জন্য তৈরি।
অনেকে এগুলোকে পারমাণবিক বোমার চেয়ে কম শক্তিশালী বলে মনে করেন। তবে বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করেছেন, এগুলোর নাম বিভ্রান্তিকর এবং এগুলো অত্যন্ত বিধ্বংসী হতে পারে। এগুলোর বিস্ফোরণ ক্ষমতা শূন্য দশমিক ৩ থেকে ৫০ কিলোটনের মধ্যে, যা ৫০০ থেকে ৬০০ কিলোমিটার ব্যাসার্ধের ভেতরের এলাকা ক্ষতিগ্রস্ত করতে পারে।
যুক্তরাষ্ট্র হিরোশিমায় ১৫ কিলোটনের একটি পারমাণবিক বোমা ফেলেছিল, যার অর্থ হলো সেই অস্ত্রটিকে আজ একটি কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র হিসেবে গণ্য করা হবে। যুক্তরাষ্ট্র, উত্তর কোরিয়া ও রাশিয়ার অস্ত্রাগারে এ ধরনের অস্ত্র রয়েছে। যদিও কোনো দেশই কখনো তা ব্যবহার করেনি। এগুলো কোনো আন্তর্জাতিক চুক্তির আওতাভুক্ত নয় এবং অনেকটাই অনিয়ন্ত্রিত।
ইরানে সম্ভাব্য মার্কিন হামলা কেমন হতে পারে
ট্রাম্প এমওএবি ব্যবহারের সম্ভাবনা খারিজ না করায় বিশ্লেষকেরা ধারণা করছেন, যুক্তরাষ্ট্র হয়তো ইরানের পারমাণবিক ও প্রতিরক্ষা স্থাপনাগুলোকে বিশেষ করে পিকঅ্যাক্স পর্বতকে নিশানা করে আরেকটি, হয়তো চূড়ান্ত ও ভয়াবহ বোমাবর্ষণ করতে পারেন।
যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ বজায় রাখার পাশাপাশি হরমুজ প্রণালি দিয়ে বাণিজ্যিক জাহাজগুলোকে পাহারা দিয়ে পার করে দেওয়ার কাজ চালিয়ে যেতে পারে।
ইরান প্রতিশ্রুটি দিয়েছে, হামলার মাত্রা বৃদ্ধি করা হলে তারা প্রতিবেশী উপসাগরীয় দেশগুলোর তেল ও ডিজিটাল অবকাঠামো লক্ষ্য করে জবাব দেবে।
সামরিক শীর্ষ কর্মকর্তারাও সতর্ক করেছেন, যুক্তরাষ্ট্র স্থল অভিযান শুরু করলে ইরান তার প্রতিবেশীদের ওপর আক্রমণ করবে, যদিও ট্রাম্প সেই সম্ভাবনা উড়িয়ে দিয়েছেন বলেই মনে হচ্ছে।
যুদ্ধের শুরুর দিকে ট্রাম্প প্রায় ৪০০ কেজি উচ্চসমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম জব্দ করতে স্থলবাহিনী পাঠানোর সম্ভাবনার ইঙ্গিত দিয়েছিলেন। ওয়াশিংটন ও ইসরায়েলের দাবি অনুযায়ী, তেহরান ওই ইউরেনিয়াম মাটির নিচে লুকিয়ে রেখেছে।
গত মার্চ ইরানের বিরুদ্ধে লড়াইরত কুর্দি মিলিশিয়া গোষ্ঠীগুলোর সঙ্গে ট্রাম্পের ফোনালাপের পর গুঞ্জন উঠেছিল, ওয়াশিংটন ইরানে হামলার জন্য তাদের সঙ্গে সমন্বয় করতে পারে, অবশ্য শেষ পর্যন্ত তা আর ঘটেনি।
