প্রেমের সম্পর্কের টানাপোড়েন বা সঠিক সঙ্গী খুঁজে পাওয়ার পথটা সবসময় মসৃণ হয় না। ডেইটিংয়ের দুনিয়ায় পা রেখে অনেকেই বারবার একই ধরনের ভুল করেন, যার শেষ পরিণতি হয় মানসিক যন্ত্রণা ও একাকিত্ব।
কিন্তু কেন এমন হয়? সম্পর্ক-বিষয়ক মার্কিন বিশেষজ্ঞ, পডকাস্ট হোস্ট এবং বেস্টসেলার বই ‘ডিটাস্ট’ ও ‘দ্য ফেমিনিন কোড’-এর লেখিকা সাবরিনা বেন্ডরি মনে করেন, অধিকাংশ মানুষই সম্পর্কের কঠিন শিক্ষাগুলো নিজে চরমভাবে আঘাত পাওয়ার আগে উপলব্ধি করতে পারেন না।
১৭ বছর ‘ডেইটিং’ ও সম্পর্ক-বিষয়ক প্রশিক্ষক হিসেবে কাজ করার অভিজ্ঞতা থেকে, সাবরিনা নিজের জীবনের ভুলগুলো বিশ্লেষণ করেছেন।
রিয়েলসিম্পল ডটকম’য়ে প্রকাশিত প্রতিবেদনে, তিনি এমন ৫টি গুরুত্বপূর্ণ নিয়মের কথা জানিয়েছেন, যা জানা থাকলে সম্পর্কের ভুল পথ থেকে নিজেকে রক্ষা করা সম্ভব।
সঙ্গীর বর্তমানকে ভালোবাসুন, ‘ভবিষ্যতের রূপ’ নয়
সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরও অনেকেই পুরানো সঙ্গীকে ভুলতে পারেন না।
সাবরিনা বেন্ডরির মতে, “মানুষ আসলে সেই নির্দিষ্ট ব্যক্তির অভাব বোধ করে না, বরং তাকে নিয়ে মনে মনে যে ভবিষ্যতের ‘সম্ভাবনা’ তৈরি করেছিল, সেটার অভাবে ভোগে।”
যেমন, ‘সে যদি ক্যারিয়ার নিয়ে সিরিয়াস হত তবে কত ভালো আর্থিক সাহায্য পাওয়া যেত’, কিংবা ‘সে যদি নিজেকে একটু বদলে নিতো তবে কত চমৎকার সঙ্গী হত’— এই ধরনের অবাস্তব কল্পনা মানুষকে আটকে রাখে।
সাবরিনা উল্লেখ করেন, “বাস্তবতা হল, আপনি কাউকে জোর করে বা শুধু ভালোবেসে বদলে দিতে পারবেন না। নিজেকে প্রশ্ন করুন: যদি এই মানুষটি জীবনে আর কখনও একবিন্দুও না বদলায়, তবে কি আপনি তার বর্তমান রূপের সঙ্গেই সারাজীবন কাটাতে রাজি আছেন? উত্তর যদি 'না' হয়, তবে সেই সম্পর্ক বয়ে বেড়ানো অর্থহীন।”
'প্রয়োজন' আর 'ভালোবাসা' এক নয়
অনেকে মনে করেন, সঙ্গী যদি তার ওপর অতিরিক্ত নির্ভরশীল হন, তবে সেটি বুঝি গভীর ভালোবাসা। এটি ভুল ধারণা।
সাবরিনা বলেন, “কেউ আপনার ওপর নির্ভরশীল বা আপনাকে তার প্রয়োজন মানে এই নয় যে, সে আপনাকে মন থেকে ভালোবাসে, শ্রদ্ধা করে বা আপনার মূল্য বোঝে।”
“সুস্থ ও সুন্দর সম্পর্কে প্রতিনিয়ত প্রমাণ করতে হবে না যে, আপনি ভালোবাসার যোগ্য। কাউকে মানসিক বা যেকোনো সহায়তা দেওয়ার অর্থ এই নয় যে, তার জীবনের সব বোঝা আপনাকে একাই বইতে হবে”, পরামর্শ দেন এই লেখিকা।
অনুভূতির চেয়ে সঙ্গীর আচরণে নিজের মানসিক অবস্থার ওপর জোর দিন
কারও প্রতি তীব্র আকর্ষণ বা রসায়ন থাকলেই যে, সে আপনার জন্য উপযুক্ত সঙ্গী, তা কিন্তু নয়।
সাবরিনা নিজের জীবনের অভিজ্ঞতা থেকে বলেন, “খুব খারাপ বা ক্ষতিকর একজন মানুষের প্রতিও আপনার মনে তীব্র অনুভূতি তৈরি হতে পারে।”
তাই সঙ্গী আপনাকে কতটা ভালোবাসে শুধু সেই হিসাব না করে ভাবুন, তার সঙ্গে থাকার সময় নিজের কেমন অনুভূতি হয়?
আপনি কি শান্ত ও স্বাভাবিক থাকেন, নাকি সারাক্ষণ তার একটি ‘টেক্সট’ বা সামান্য মেজাজ পরিবর্তনের কারণে মানসিক অস্থিরতায় ভোগেন?
যে সম্পর্কে নিজের স্বাভাবিকতা হারিয়ে যায়, তা কখনই দীর্ঘস্থায়ী হতে পারে না।
অন্যের সীমাবদ্ধতাকে নিজের খামতি ভাববেন না
কেউ পরিত্যাগ করলে বা সম্পর্কে অবহেলা করলে, সাধারণত নিজেদের দোষ খুঁজতে বসি। 'আমার মাঝে কী কমতি ছিল' বা 'আমি কী ভুল করলাম'— এই ধরনের চিন্তা নিজের আত্মবিশ্বাস ধুলোয় মিশিয়ে দেয়।
মনে রাখতে হবে, কখনও কখনও অপর মানুষটির নিজস্ব কিছু সীমাবদ্ধতা থাকে, যার কারণে সে হয়তো আপনার প্রত্যাশা পূরণ করতে পারে না, বা সে যা চায় আপনার সঙ্গে তা মেলে না।
“এর অর্থ এই নয় যে আপনার কোনও যোগ্যতা কম। এটি একটি ভুল বোঝাপড়া বা অমিল, যাকে ব্যক্তিগত ব্যর্থতা হিসেবে দেখা উচিত নয়”, বলেন সাবরিনা।
সম্পর্ক টিকিয়ে রাখতে গিয়ে নিজেকে হারিয়ে ফেলবেন না
এটি সম্পর্কের সবচেয়ে বড় এবং মারাত্মক ভুল।
সাবরিনা জানান, তরুণ বয়সে সম্পর্ক টিকিয়ে রাখার জন্য তিনি নিজের ভালোলাগা-মন্দলাগা বা আপত্তিগুলো চেপে রাখতেন, যাতে সঙ্গী তাকে ছেড়ে চলে না যায়। নিজেকে খুব ‘সহজ-সরল’ বা ‘কুল’ হিসেবে জাহির করার এই চেষ্টা একসময় মানুষকে নিজের অস্তিত্ব সংকটে ফেলে দেয়।
নিজের মনের কথা চেপে যাওয়া, অন্যের অন্যায় আবদার মুখ বুজে মেনে নেওয়া এবং বারবার নিজের আত্মসম্মানের সীমারেখা ভাঙার মাধ্যমে মানুষ ধীরে ধীরে নিজেকেই হারিয়ে ফেলে।
কোনও সম্পর্কই নিজের আত্মসম্মান ও ব্যক্তিত্ব বিসর্জন দিয়ে টিকিয়ে রাখা সম্ভব নয়।
