আজকাল ওয়েবডেস্ক: নিউ ইয়র্কের জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাংশের নিশানায় মহম্মদ ইউনূস। বাংলাদেশের শত শত মানুষের মৃত্যু ও গণতন্ত্রকে ক্ষতিগ্রস্ত করার জন্য অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা তথা নোবেলজয়ী অর্থনীতিবিদকে দায়ী করা হয়। চিৎকার চেঁচামিচির মধ্যেই ইউনূস-কে 'জঙ্গি' বলেও কটাক্ষ করেন প্রবাসী বাংলাদেশিরা। উল্লেখ্য, প্রধান উপদেষ্টার পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর নোবেলজয়ী ইউনূসের এটিই ছিল প্রথম বিদেশ সফর। তাঁর বিরুদ্ধে এবং তাঁর তৈরি গ্রামীণ গ্রুপের বিরুদ্ধে দুর্নীতিবিরোধী তদন্তের দাবিও উঠেছে।
সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়া একটি ভিডিও-তে শোনা যাচ্ছে যে, একজন মহম্মদ ইউনূসের উদ্দেশে চিৎকার করে বলছেন, "আপনি একজন জঙ্গি। আপনি বাংলাদেশে মানুষ হত্যা করেছেন। আপনি কেন এখানে এসেছেন? আমাদের বলুন, কেন এসেছেন?"
বাংলাদেশের কয়েকটি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দোহা থেকে কাতার এয়ারওয়েজের একটি ফ্লাইটে টার্মিনাল-৮-এ পৌঁছানোর পর এই উত্তপ্ত পরিস্থিতির তৈরি হয়। ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, হুইলচেয়ারে করে বিমানবন্দর থেকে বের করার সময় প্রাক্তন প্রধান উপদেষ্টাকে নিশানা করে লোকজন চিৎকার করছেন। কেউ কেউ তাঁকে 'ফিরে যাওয়ার' দাবিও জানান।
বিক্ষোভকারীরা হাজার হাজার পুলিশের মৃত্যুর জন্য মহম্মদ ইউনূসকে দায়ী করেন। বিক্ষোভকারীদের অভিযোগ, গণঅভ্যুত্থানের পর থেকে বাংলাদেশে প্রায় দুই লাখ মানুষকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।
এরপর জন এফ কেনেডি আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত নিরাপত্তা কর্মীরা ইউনূসকে ঘটনাস্থল থেকে সরিয়ে নিয়ে যান। ঢাকায় প্রকাশিত 'ডেইলি সান' পত্রিকা বিমানবন্দরে উপস্থিত ব্যক্তিদের উদ্ধৃত করে জানিয়েছে যে, উত্তপ্ত পরিস্থিতির সময় ইউনূস এবং তাঁর সফরসঙ্গী লামিয়া মোরশেদ দ্রুত বিমানবন্দরের ভেতরে ঢুকে যান।
ঘটনায় জড়িত প্রবাসীদের পরিচয় নিয়ে এখনও নিশ্চিত তথ্য যায়নি। বাংলাদেশের একটি সংবাদমাধ্যম বিক্ষোভকারীদের ক্ষমতাচ্যুত প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দল আওয়ামী লীগের সমর্থক হিসেবে উল্লেখ করেছে।
এই ঘটনা বা অভিযোগের বিষয়ে ইউনূস বা তাঁর প্রতিনিধিদের পক্ষ থেকে তাৎক্ষণিক কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি।
নিউ ইয়র্কে প্রবাসীরা কেন ইউনূসের বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেন?
২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনার ক্ষমতাচ্যুতির পরবর্তী সময়ে হিংসা ও অস্থিরতা সামাল দেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসন সমালোচনার মুখে পড়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষরা হামলা প্রতিরোধ ও আইনশৃঙ্খলা বজায় রাখতে ব্যর্থতার জন্য সরকারকে দায়ী করেছিল। এছাড়া আওয়ামী লীগ অভিযোগ করেছিল যে, অন্তর্বর্তীকালীন প্রশাসনের সময় তাদের নেতাকর্মী ও সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হিংসার লক্ষ্যবস্তু করা হয়েছিল।
আলোচিত সব হত্যাকাণ্ড এবং অস্থিরতার ঘটনা প্রশাসনের নিরাপত্তা নিশ্চিত ও ন্যায়বিচার প্রদানের ক্ষমতা নিয়ে সমালোচনাকে আরও বাড়িয়ে তোলে। শেখ হাসিনা এবং বিভিন্ন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্বের স্বজন-সহ সমালোচকরা সরকারের বিরুদ্ধে হিংসার ঘটনায় যথাযথ পদক্ষেপ করতে ব্যর্থ হওয়ার অভিযোগ তোলেন।
এই অন্তর্বর্তীকালীন সময়ে মানবাধিকার সংক্রান্ত উদ্বেগের বিষয়গুলোর মধ্যে ছিল হিন্দু সম্প্রদায় ও তাদের উপাসনালয়ের ওপর হামলার খবর, নির্বিচারে গ্রেপ্তার ও পুলিশি হেফাজতে মৃত্যুর অভিযোগ এবং রাজনৈতিক সমর্থকদের প্রতি আচরণের বিষয়টি। মানবাধিকার সংগঠনগুলো বিভিন্ন অপকর্মের জন্য জবাবদিহির বিষয়টি নিয়েও উদ্বেগ প্রকাশ করেছিল। প্রতিটি ঘটনার প্রকৃতি ও ব্যাপ্তি সঠিকভাবে বোঝার জন্য নথিবদ্ধ তদন্ত ও প্রতিবেদনের ওপর ভিত্তি করে তা যাচাই করা প্রয়োজন।
২০২৬ সালের জানুয়ারিতে ইউনূসের জারি করা অধ্যাদেশ অনুযায়ী, ২০২৪ সালের জুলাই-আগস্টের গণ-অভ্যুত্থানে অংশগ্রহণকারীদের যেসব কর্মকাণ্ড ওই অধ্যাদেশের সুরক্ষার আওতাভুক্ত ছিল, সেগুলোর বিষয়ে পুলিশ বা অন্যান্য আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর নিয়মিত ফৌজদারি তদন্ত চালানো নিষিদ্ধ করা হয়। এর পরিবর্তে, পুলিশ সদস্য জড়িত থাকা ঘটনা-সহ হত্যাকাণ্ডের অভিযোগগুলো জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে পাঠানো হয়। এর উদ্দেশ্য ছিল- ওই কর্মকাণ্ডগুলো রাজনৈতিক প্রতিরোধ নাকি ফৌজদারি অপরাধ, তা নির্ধারণ করা। যার ফলে কার্যত এই মামলাগুলোকে সাধারণ ফৌজদারি বিচার প্রক্রিয়ার আওতা থেকে সরিয়ে নেওয়া হয়।
ইউনূসের দায়িত্ব পালনকালে ভারত-বাংলাদেশ সম্পর্কেরও অবনতি ঘটে। ভারতের উত্তর-পূর্বাঞ্চলীয় রাজ্যগুলো নিয়ে চীনে তাঁর দেওয়া (মার্চ, ২০২৫) বক্তব্য এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষা ও দ্বিপাক্ষিক বিভিন্ন অভিযোগ নিয়ে মন্তব্যের বিষয়টি ভারতে সমালোচিত হয়েছিল। রাজনৈতিক প্রতিপক্ষ ও সমালোচকরা ইউনূসের এই কর্মপদ্ধতিকে ‘বিপরীত ফলদায়ক জন-কূটনীতি’ হিসেবে অভিহিত করেন। অন্যদিকে, নয়াদিল্লি বারবার সংযত ভাষা ব্যবহারের এবং সংখ্যালঘু সুরক্ষার বিষয়ে অধিক মনোযোগ দেওয়ার আহ্বান জানায়।
মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে অবস্থানরত প্রবাসী বাংলাদেশিদের একাংশ যখন চিৎকার করে বলছিল, "আপনি জঙ্গি, আপনি এখানে কেন এসেছেন?"- তখন সেই উত্তপ্ত পরিস্থিতি প্রবাসে থাকা কিছু বাংলাদেশির মধ্যে ইউনূসের প্রতি জমে থাকা ক্ষোভের এক ছবিই তুলে ধরে। অথচ তিনিই এক উত্তাল ও পরিবর্তনশীল সময়ে দেশটির নেতৃত্ব দিয়েছিলেন।
