মোটরসাইকেলের সামনে হাতে তৈরি রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্লেট লাগানো বাধ্যতামূলক করার নির্দেশের আইনি ভিত্তি জানতে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ) ও সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের কাছে লিখিত ব্যাখ্যা চেয়েছেন আইনজীবী অপূর্ব মজুমদার শান্ত। একই সঙ্গে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সামনের নম্বর প্লেট না লাগালে আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার যে সতর্কতা দেয়া হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট আইনগত ভিত্তিও জানতে চাওয়া হয়েছে নোটিশে।
রবিবার পাঠানো চিঠিতে ঢাকা জেলা ও দায়রা জজ আদালতের আইনজীবী অপূর্ব মগুমদার বিআরটিএর চেয়ারম্যান এবং সড়ক পরিবহন ও মহাসড়ক বিভাগের সচিবের কাছে এ ব্যাখ্যা চান। চিঠিতে ৭ কর্মদিবসের মধ্যে লিখিত জবাব এবং সংশ্লিষ্ট আইনগত নথির অনুলিপি সরবরাহের অনুরোধ জানানো হয়েছে।
নোটিশে বলা হয়, গত ১৬ই অক্টোবর একটি পত্রিকার খবরে বলা হয়—সরকারের নির্দেশনা অনুযায়ী আগামী ১৫ই নভেম্বরের মধ্যে সব মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট লাগানো বাধ্যতামূলক করা হয়েছে। এতে আরও বলা হয়েছে, মোটরসাইকেলের সামনে নির্দিষ্ট মাপ ও অন্যান্য শর্ত অনুসরণ করে হাতে তৈরি রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্লেট প্রদর্শন করতে হবে। অন্যথায় আইনগত ব্যবস্থা নেয়া হবে। তবে আইনজীবী জানান, বিআরটিএর সরকারি ওয়েবসাইটে এ-সংক্রান্ত মূল গণবিজ্ঞপ্তি, জারির তারিখ, স্মারক নম্বর এবং নির্দেশনার ভিত্তি হিসেবে ব্যবহৃত আইনগত দলিল খুঁজে পাননি তিনি। এ কারণে প্রকাশিত সংবাদ প্রতিবেদনকে তথ্যের সূত্র হিসেবে উল্লেখ করে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে মূল বিজ্ঞপ্তি ও নির্দেশনার আইনি ভিত্তি জানতে চেয়েছেন।
নেটিশে বলা হয়, নম্বর প্লেটের প্রয়োজনীয়তা কিংবা সড়ক নিরাপত্তা ও যানবাহন শনাক্তকরণের গুরুত্ব নিয়ে তার কোনো আপত্তি নেই। প্রশ্ন হলো, বিদ্যমান আইন ও বিধিমালায় মোটরসাইকেলের সামনে নম্বর প্লেট প্রদর্শনের ক্ষেত্রে যে ছাড় রয়েছে, তার সঙ্গে নতুন নির্দেশনাটি কীভাবে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
এ প্রসঙ্গে সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ৩৬-এর উপবিধি (১০)-এর উল্লেখ করে চিঠিতে বলা হয়, উপবিধি (৮)-এর বিধান সত্ত্বেও মোটরসাইকেল ও প্রতিবন্ধীবান্ধব মোটরযানকে সামনে রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্রদর্শন থেকে অব্যাহতি দেয়া হয়েছে। ফলে সামনে হাতে তৈরি নম্বর প্লেট লাগানোর নির্দেশ কীভাবে কার্যকর করা হচ্ছে, তা স্পষ্ট করা প্রয়োজন।
চিঠিতে আরও বলা হয়, সরকার যদি পরবর্তী সময়ে কোনো বৈধ আদেশ, প্রজ্ঞাপন, নীতিমালা বা সংশোধনীর মাধ্যমে ওই অব্যাহতির পরিবর্তন করে থাকে, তাহলে সংশ্লিষ্ট দলিল ও এর আইনগত প্রভাব জনসমক্ষে প্রকাশ করা উচিত।
আইনজীবী অপূর্ব মজুমদার নোটিশে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১২২, ১২৩ ও ১২৪ ধারার উল্লেখ করেন। তার বক্তব্য, ১২২ ধারায় সরকারি গেজেটে প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে বিধি প্রণয়নের ক্ষমতা, ১২৩ ধারায় নির্ধারিত আইনগত শর্তসাপেক্ষে কর্তৃপক্ষের প্রবিধান প্রণয়নের ক্ষমতা এবং ১২৪ ধারায় জনস্বার্থে নিরাপদ সড়ক পরিবহন ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করতে নির্দিষ্ট বিষয়ে সরকারের আদেশ জারি বা নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষমতা রয়েছে।
এ অবস্থায় মোটরসাইকেলের সামনে হাতে তৈরি নম্বর প্লেট লাগানোর নির্দেশটি ১২৪ ধারার অধীনে, আইনের অন্য কোনো বিধানের ভিত্তিতে, বিদ্যমান বিধিমালার সংশোধন করে, নাকি অন্য কোনো বৈধ আইনগত দলিলের মাধ্যমে জারি করা হয়েছে, তা জানতে চেয়েছেন তিনি। নির্দেশটি সরকারি আদেশ বা নীতিমালার ভিত্তিতে জারি করা হলে এর অনুলিপি, তারিখ, স্মারক নম্বর, ক্ষমতা প্রদানকারী আইনি বিধান এবং প্রকাশসংক্রান্ত তথ্যও চেয়েছেন তিনি।
চিঠিতে সরকারের আইনগত ব্যবস্থা নেয়ার হুঁশিয়ারি নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। এতে বলা হয়, সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর ১৬ ধারার উপধারা (৩)-এ রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্লেট সংযুক্ত ও প্রদর্শন ছাড়া মোটরযান চালানো নিষিদ্ধ করা হয়েছে। এ বিধান লঙ্ঘনের শাস্তি নির্ধারণ করা হয়েছে আইনের ৭২ ধারায়।
তবে কোনো মোটরসাইকেল যথাযথভাবে নিবন্ধিত থাকলে এবং বিআরটিএ অনুমোদিত আরএফআইডি রেজিস্ট্রেশন নম্বর প্লেট পেছনে যথাযথভাবে সংযুক্ত ও প্রদর্শিত থাকলে, শুধু সামনে অতিরিক্ত হাতে তৈরি নম্বর প্লেট না থাকার কারণে কীভাবে আইনের ১৬(৩) ধারা লঙ্ঘিত হবে, তা স্পষ্ট করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। বিশেষ করে সড়ক পরিবহন বিধিমালা, ২০২২-এর বিধি ৩৬(১০)-এ সামনের নম্বর প্রদর্শন থেকে অব্যাহতির বিষয়টি উল্লেখ থাকায় এ ব্যাখ্যা প্রয়োজন বলে চিঠিতে বলা হয়েছে।
আইনজীবীর নোটিশে উল্লেখ করা হয়, আইনের ৭২ ধারায় ১৬ ধারা লঙ্ঘনের জন্য শাস্তির বিধান রয়েছে। তবে শুধু সামনে হাতে তৈরি নম্বর প্লেট না লাগানোর অপরাধকে স্বতন্ত্রভাবে প্রতিষ্ঠিত করে না। এ কারণে এমন অনিয়মের জন্য কোন নির্দিষ্ট আইন বা বিধির অধীনে অপরাধ সংঘটিত হবে, কী শাস্তি প্রযোজ্য হবে এবং কোন কর্তৃপক্ষ আইনগতভাবে তা প্রয়োগ করতে পারবে, তা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করার অনুরোধ জানানো হয়েছে। নোটিশে বলা হয়, প্রযোজ্য আইনগত বিধান উল্লেখ না করে সাধারণভাবে ‘আইনগত ব্যবস্থা’ নেয়ার সতর্কতা দিলে নির্দেশ অমান্যের পরিণতি সম্পর্কে নাগরিকদের কাছে যথেষ্ট স্পষ্টতা থাকে না।
নোটিশে আরও বলা হয়, ৭ কর্মদিবসের মধ্যে সন্তোষজনক জবাব না পাওয়া গেলে অথবা প্রযোজ্য আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট না করেই শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেয়া হলে, সংবিধানের ১০২ অনুচ্ছেদের অধীনে উচ্চ আদালতে প্রতিকার চাওয়া কথা উল্লেখ করেন তিনি।
