পৃথিবীর খবরের কাগজ খুললে আজকাল মনে হয়, শান্তি বুঝি অভিধানে আছে, বাস্তবে তার ঠিকানা খুঁজে পাওয়া ভার। কোথাও যুদ্ধের দামামা, তেলের বাজারে আগুন, কোথাও অর্থনীতির অঙ্কে লাল কালি। আর সাধারণ মানুষ? তিনি সকালে বাজারে গিয়ে হিসাব মেলান, সন্ধ্যায় ঘরে ফিরে আবার হিসাব করেন। পার্থক্য শুধু এই যে, অর্থনীতিবিদদের হিসাব ভুল হলে প্রতিবেদন সংশোধিত হয়, গৃহস্থের হিসাব ভুল হলে মাসের শেষ সপ্তাহটি বেশ দীর্ঘ হয়ে যায়।
আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিলের সর্বশেষ পূর্বাভাসে বাংলাদেশের চলতি অর্থবছরে গড় মূল্যস্ফীতি ১০.৯ শতাংশে পৌঁছতে পারে এবং প্রবৃদ্ধি ৩.২ শতাংশে নেমে আসার আশঙ্কার কথা এসেছে। পূর্বাভাসটি সত্য হলে এটি অর্থনীতির জন্য কঠিন সতর্কবার্তা। প্রবৃদ্ধির হার কমা মানে অর্থনৈতিক কর্মকাণ্ডের গতি দুর্বল হওয়ার আশঙ্কা; আর মূল্যস্ফীতি বাড়লে সেই দুর্বলতার বোঝা সবার কাঁধে সমানভাবে পড়ে না। যাঁর আয় সীমিত, তাঁর বাজারের থলিতে তার প্রভাব বেশি। অর্থনীতির পরিভাষায় একে মূল্যস্ফীতি বলা হয়, সংসারের ভাষায় এর নাম—আগের টাকায় আগের বাজার আর হয় না। এই পরিস্থিতিতে জ্বালানি আমদানির ব্যয় বেড়ে গেলে চাপ আরও বাড়তে পারে। মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাতের কারণে তেলের দাম আরও বাড়ার আশঙ্কা এবং মুদ্রার ওপর চাপের প্রেক্ষাপটে ভর্তুকি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি দরিদ্র ও ঝুঁকিতে থাকা পরিবারকে সুনির্দিষ্ট নগদ সহায়তা দেওয়ার প্রস্তাবটি তাই গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা দরকার। সবার জন্য একই ওষুধ দিলে ওষুধের দোকান খুশি হতে পারে, রোগী যে সমানভাবে সেরে উঠবেন, তার নিশ্চয়তা নেই।
এর মধ্যেই নিউইয়র্কের জন এফ কেনেডি বিমানবন্দরে বাংলাদেশের সাবেক অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা অধ্যাপক মুহাম্মদ ইউনূসকে একদল মানুষের হেনস্তার ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়েছে। ভিডিওতে তাঁকে লক্ষ্য করে আক্রমণাত্মক স্লোগান দিতে দেখা যায়। বাংলাদেশ সরকার ঘটনার নিন্দা জানিয়ে জড়িতদের শনাক্ত করতে এবং স্থানীয় আইন প্রয়োগকারী সংস্থার মাধ্যমে ব্যবস্থা নিতে উদ্যোগের কথা জানিয়েছে। বিদেশের মাটিতে মতপ্রকাশের অধিকার আছে, প্রতিবাদের অধিকারও আছে; কিন্তু কাউকে ঘিরে অপমান ও ভীতি প্রদর্শনকে রাজনৈতিক মতপ্রকাশের অবাধ লাইসেন্স ভাবার কারণ নেই। সামাজিক মাধ্যমে ভিডিওটি ভাইরাল হওয়ার পর নিন্দা ও পাল্টা বক্তব্যের ঢেউ উঠেছে। তবে একটি বিষয় মনে রাখা দরকার—দেশের সম্মান রক্ষার দায় স্লোগানের জোরে নয়, আচরণের মানে প্রতিষ্ঠিত হয়। মতের বিরোধ থাকতেই পারে; সভ্যতার পরীক্ষা হয় বিরোধীর সঙ্গে আচরণে।
কূটনীতির টেবিলেও এখন বাংলাদেশের সামনে কঠিন পরীক্ষা। শেখ হাসিনার ভারতে অবস্থান, সীমান্তের অমীমাংসিত সমস্যা এবং ডিসেম্বরে মেয়াদ শেষ হতে যাওয়া গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি—সব মিলিয়ে ঢাকা-দিল্লি সম্পর্কের সামনে গুরুত্বপূর্ণ সময় এসেছে। ১৯৯৬ সালের পানিচুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে আলোচনা কেবল দুই সরকারের কূটনৈতিক সৌজন্যের বিষয় নয়; এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে উত্তর ও দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলের কৃষি, জীবিকা, নদীর প্রবাহ এবং পরিবেশ। কূটনীতিতে হাসিমুখে ছবি তোলা সহজ, কঠিন হলো আলোচনার টেবিল থেকে কৃষকের জমিতে ফল পৌঁছানো। বাংলাদেশের স্বার্থ রক্ষায় সংলাপ, তথ্যভিত্তিক আলোচনা ও ধারাবাহিক দর-কষাকষি দরকার। প্রতিবেশী বদলানো যায় না, কিন্তু প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্কের শর্ত নিয়ে কথা বলা যায়—সেই কথাটি হওয়া চাই দৃঢ়, সংযত ও ফলমুখী।
এদিকে সামাজিক মাধ্যমের আরেক আলোচনায় উঠে এসেছে যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের নেব্রাস্কার সমাবেশে পরা নীল স্যুট। বাংলাদেশি সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, যুক্তরাষ্ট্রের পোশাক ব্র্যান্ড জোস এ. ব্যাংকের স্যুটটি নারায়ণগঞ্জের আদমজী রপ্তানি প্রক্রিয়াকরণ অঞ্চলে তৈরি করেছে ইউনিভার্সাল মেনসওয়্যার। স্যুটটি নিয়ে সিএনএনের প্রতিবেদনে বাংলাদেশ বা চীনে উৎপাদনের সম্ভাবনার কথা উঠেছিল; পরে বাংলাদেশের কারখানার পক্ষ থেকেও উৎপাদনের দাবি এসেছে। পোশাকটি সত্যিই বাংলাদেশে তৈরি হয়ে থাকলে তাতে গর্বের কারণ আছে। তবে গর্বের সঙ্গে তথ্যের মিল থাকা চাই—ভাইরাল পোস্টের সেলাই যেন বাস্তবতার চেয়ে শক্ত না হয়। আমাদের পোশাকশিল্পের আসল পরিচয় কোনো রাষ্ট্রনেতার গায়ে থাকা স্যুটে সীমাবদ্ধ নয়; পরিচয় সেই শ্রমিকের হাতে, যিনি মজুরি, নিরাপত্তা ও মর্যাদা নিয়ে কাজ করেন এবং দেশের জন্য বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করেন।
বিশ্বের মানচিত্রে হরমুজ প্রণালী এখন যুদ্ধের উত্তাপে জ্বলছে। আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদন অনুযায়ী, বাণিজ্যিক জাহাজের ওপর হামলা ও চলাচলে বাধার ঘটনা বেড়েছে; ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের সংঘাতের বিস্তার নিয়ে উদ্বেগ বাড়ছে। একই সময়ে ইয়েমেনের রাজধানী সানায় হুথিদের লক্ষ্য করে সৌদি নেতৃত্বাধীন জোটের বিমান হামলার খবর এসেছে। পাল্টাপাল্টি হামলার এই চক্রে সামরিক লক্ষ্যবস্তু আর বেসামরিক মানুষের নিরাপত্তার সীমারেখা ক্রমেই উদ্বেগের বিষয় হয়ে উঠছে। দূরের যুদ্ধ বাংলাদেশের রান্নাঘরেও পৌঁছাতে পারে—জাহাজ চলাচল ব্যাহত হলে বাড়ে পরিবহন ব্যয়, তেলের দাম বাড়লে আমদানি ব্যয় বাড়ে, আর তার ঢেউ এসে পড়ে বাজারে। যুদ্ধের মানচিত্রে আমাদের নাম না থাকলেও তার বিলের কাগজে নাম উঠে যেতে পারে। তাই জ্বালানি সরবরাহের বিকল্প, অপচয় কমানো, বৈদেশিক মুদ্রার সাশ্রয় এবং দরিদ্র মানুষের জন্য লক্ষ্যভিত্তিক সহায়তা—এসব এখন কেবল অর্থনৈতিক নীতি নয়, আগাম প্রস্তুতির অংশ।
দিনশেষে প্রশ্নটি তাই খুব সাধারণ: রাষ্ট্র কত বড় ঘোষণা দিল, তার চেয়ে মানুষ কতটা স্বস্তি পেল? মূল্যস্ফীতি কমল কি না, প্রবাসী কর্মীর নিরাপত্তা বাড়ল কি না, নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা নিশ্চিত হলো কি না, শ্রমিকের ঘরে আয় পৌঁছাল কি না—এসবের উত্তরেই রাষ্ট্রের কাজের মূল্যায়ন হবে। বিশ্বরাজনীতি আমাদের নিয়ন্ত্রণে নেই, কিন্তু নিজেদের প্রস্তুতি, নীতি ও নাগরিকের প্রতি আচরণ আমাদের হাতেই। প্রভাতের আলোয় আশাবাদ রাখা ভালো; তবে জানালার পর্দা সরালেই সূর্য ওঠে না, দরজাটিও খুলতে হয়।
