দিনাজপুরের বীরগঞ্জে যুগ যুগ ধরে চলে আসা সাঁওতাল জনগোষ্ঠীর ঐতিহ্যবাহী মিলনমেলা অনুষ্ঠিত হয়েছে। শারদীয় দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর পরদিন প্রতিবছর বসে এ মেলা। একসময় জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার প্রথা প্রচলিত থাকায় মেলাটি ‘বউ মেলা’ নামেও পরিচিত ছিল। তবে সময়ের পরিবর্তন ও আধুনিকতার প্রভাবে সেই প্রথা এখন আর প্রচলিত নেই। বর্তমানে মেলাটি পরিণত হয়েছে আত্মীয়স্বজনের মিলন, আনন্দ ভাগাভাগি ও সাংস্কৃতিক উৎসবের আয়োজনে।
আজ শুক্রবার বীরগঞ্জের গোলাপগঞ্জ উচ্চবিদ্যালয় মাঠে আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির আয়োজনে এ মেলা অনুষ্ঠিত হয়। সকাল থেকেই প্রচলিত রীতি অনুযায়ী সাঁওতাল তরুণ-তরুণীরা পরিবারের বয়োজ্যেষ্ঠদের সঙ্গে নানা সাজে মেলায় আসতে থাকেন। মানুষের ভিড় বাড়তে থাকলেও মূল আয়োজন জমে বেলা ৩টার পর থেকে। সন্ধ্যা পর্যন্ত চলে উৎসবের আমেজ। মেলায় হাজার হাজার মানুষের সমাগম ঘটে।
মেলার নিরাপত্তায় বীরগঞ্জ থানা-পুলিশের নেতৃত্বে আনসার ও গ্রামপুলিশের সদস্যরা দায়িত্ব পালন করেন।
মিলনমেলার আয়োজক কমিটি আদিবাসী সমাজ উন্নয়ন সমিতির সভাপতি যোসেফ হেমরমের সভাপতিত্বে বিকেলে আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়। এতে বক্তব্য দেন বীরগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা সুমা খাতুন, দিনাজপুর জেলা বিএনপির উপদেষ্টা ও চেম্বার অব কমার্সের পরিচালক রেজওয়ানুল ইসলাম রিজু, পৌর বিএনপির সভাপতি আলহাজ মো. আমিরুল বাহার, আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা ও নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস, মোহনপুর ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান শাহিনুর রহমান চৌধুরী শাহিন এবং বীরগঞ্জ উপজেলা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নেতা শীতল মার্ডী।
আয়োজক কমিটির সভাপতি যোসেফ হেমরম বলেন, কেউ মনে করেন এ মেলার বয়স ২০০ বছরের বেশি, আবার কেউ বলেন, এটি বহুদিনের ঐতিহ্য। তবে ঠিক কবে মেলার শুরু হয়েছিল, তা কেউ নিশ্চিতভাবে বলতে পারে না।
তিনি বলেন, একসময় জীবনসঙ্গী খুঁজে নেওয়ার প্রথা থাকায় মেলাটি ‘বউ মেলা’ নামে পরিচিত ছিল। কিন্তু সময়ের পরিবর্তনে সেই প্রথা আর নেই। ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ছেলেমেয়েরা এখন শিক্ষিত হচ্ছে, বড় হচ্ছে এবং সামাজিকভাবে বিয়ে করছে। তাই আমরা এই দিনটিকে আত্মীয়স্বজনের সঙ্গে মিলিত হওয়া ও আনন্দ ভাগাভাগির উপলক্ষ হিসেবে উদ্যাপন করি।

সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠী সম্প্রদায়ের বিভিন্ন বয়সের মানুষের পাশাপাশি মেলায় হিন্দু ও মুসলিমসহ বিভিন্ন ধর্ম ও বর্ণের মানুষের অংশগ্রহণে মেলা প্রাণবন্ত হয়ে উঠেছে। ব্যাপক উৎসাহ উদ্দীপনায় উৎসব মুখর পরিবেশে অনুষ্ঠিত ব্যতিক্রম এই মেলা ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠীর সব বয়সী নারী-পুরুষের ভিড় চোখে পড়ার মতো। বাহারি সব কাচের চুড়ি, রঙিন ফিতা, লিপিস্টিক, কানের দুল, ঝিনুকের মালা, মাটির তৈরি খেলনা, গৃহস্থালির কাজে ব্যবহৃত দা, কুড়াল, হাঁড়ি, পাতিলসহ বিভিন্ন খাবারের দোকান নিয়ে দূরদূরান্ত হতে আসা দোকানিরা ব্যস্ত মালামাল বিক্রয় করা জন্য।
অন্যদিকে, বাদ্যযন্ত্রের তালে তালে চলে সাঁওতালদের ঐতিহ্যবাহী নাচ ও গানের আসর।
আয়োজক কমিটির উপদেষ্টা ও নিজপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আনিসুর রহমান আনিস বলেন, আগে এ মেলাকে ঘিরে জীবনসঙ্গী নির্বাচনসহ বিভিন্ন সামাজিক প্রথার প্রচলন ছিল। বর্তমানে অনেকে প্রচলিত সামাজিক রীতি ও রাষ্ট্রের আইন মেনে বিয়ে করছেন। এখন মেলাটি মূলত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আনন্দ-উৎসব ও পারস্পরিক মিলনমেলায় রূপ নিয়েছে।
ক্ষুদ্র নৃ-গোষ্ঠী নেতা শীতল মার্ডী, একসময় এ মেলার নাম ছিল বউ মেলা। এখন এটি আদিবাসীদের মিলনমেলা হিসেবে পরিচিত। পূর্বপুরুষেরা এ মেলার প্রচলন করেছিলেন। আমরা তাঁদের ঐতিহ্য ধরে রাখার চেষ্টা করছি। তবে ঠিক কবে থেকে মেলা শুরু হয়েছে, তা নিশ্চিতভাবে বলা সম্ভব নয়। বাপ-দাদার কাছে শুনেছি, যুগ যুগ ধরে এ মেলা চলে আসছে। আমরা তাঁদের ধারাবাহিকতায় প্রতিবছর এর আয়োজন করে যাচ্ছি।
