আদালতের ‘অনুমতি’ ছাড়া পুজোয় স্টল দেওয়া যাবে না। এই রায়, আমাদের শেখায়, গণতান্ত্রিক অধিকারের বিষয়টিকে ভারসাম্যময় করতে হবে। ফ্যাজল খান গঞ্জিকাসেবনে ব্যস্ত থাকে দিনভর। পাগলের মতো হিন্দি সিনেমা দেখে। অমিতাভের, শাহরুখের, সলমানের। আর, এলাকার ডানাকাটা পরি মহসিনা হামিদকে পাওয়ার স্বপ্ন দেখে। নেশার ঘোর তাকে তুরীয় স্তরে নিয়ে যায়। কিন্তু যখন হুঁশ ফেরে, মহসিনা অনেক দূরের দ্বীপ। তবে একবার সুযোগ এল। মহসিনার পাশে বসার। সেদিন কথা বলতে বলতে ফয়জলের খুব ইচ্ছা হল, একটিবার মহসিনার হাতে হাত রাখে। রাখল। অমনি বিস্ফোরণ। মহসিনা ফেটে পড়ল হম্ম-ক্রোধে। বলল, এ কী অসভ্যতা। না বলে হাতে হাত রাখহ কেন? ‘পারমিশন’ নেওয়া উচিত ছিল। ফয়জলের চোখে জল। এবার ছদ্ম-রাগ ঝেড়ে ফেলে মহসিনা। বলে, হাতে হাত রাখতে তো বারণ করিনি। তবে সবের নিয়ম আছে। অনুমতি। নিয়ে, তবে হাত রাখো। ফয়জলের খুব শিক্ষা হয়। তবে প্রেমটাও হয়ে যায় এরপর মহসিনার সঙ্গে। এই ব্যাজল ও মহসিনাকে আমরা পাব ‘খ্যাস অফ ওয়াসিপুর’ (২০১২) সিনেমায়, যা কিনা পরিচালক অনুরাগ কাশ্যপের ‘ম্যাগনাম ওপাস’। ধানবাদ সন্নিহিত এলাকা কেন্দ্র করে পল্লবিত মুসলিম জনসমাজের গল্প- যেখানে গুলি ও কদুকবাজি, অপরাধ ও রাহাজানি, খুন ও ধর্ষণ কোনও বিষয়ই নয়। কিন্তু শহরে শিষ্টাচার ও সহবতের দুনিয়া থেকে বহু দূরের এক পৃথিবী, এই ওয়াসিপুরে, মহসিনা হামিদের মতো একটি অতি সাধারণ মেয়ে যেন সভ্যতার এক আদিম পাঠ রাখে আকারজী পুরুষের সামনে জানায় জীবনে ‘অনুমতি’ শব্দটি জানা ও এর তাৎপর্য বোঝা পুরুষের দরকার। ‘অনুমতি’ যেখানে- যেখানে চাইতে হয়, তার কিছু ধারাবাহিক অনুশীলন অবশ্য সমাজে প্রচলিত রয়েছে। যেমন, ক্লাসে প্রবেশের আগে শিক্ষকের অনুমতি নিতে হয়। অফিস বা কর্মপ্রতিষ্ঠানের কাছে আগাম ছুটির অনুমতি চাইতে হয়। লোন নিতে হলে, বাড়তি কোনও সুবিধা পেতে হলেও একই নিয়ম: অনুমতি যাচনা।
প্রতিটি ঘটনা আমাদের বুঝিয়ে দেয়, শৃঙ্খলায় একটি তারতম্য রয়েছে। কেউ প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোয় উচ্চে অবস্থান করছে, কেউ নিজে। ফলে যে নিম্নে রয়েছে, তাকে অনুমতি চাইতে হয় উচ্চতর অবস্থানে থাকা মানুষটির থেকে। কেননা, তিনিই প্রতিষ্ঠানের মুখ, প্রতিনিধি, ভাল-মন্দর নিয়ন্ত্রক।
প্রেমের ক্ষেত্রে ‘অনুমতি’ কথাটায় ‘ক্ষমতা’ নয়, বাক্তিমানুষের ‘অস্তিত্ব’র সিকটি বেশি করে ক্রিয়াশীল। পুরুষ চাইলেই একজন নারীর প্রেম ও অনুভূতিমালা জয় করতে। পারে না। চাইলেই পারে না, নারীর শরীরে অধিকার কায়েম করতে। ‘অনুমতি’ প্রার্থনা করার প্রক্রিয়াটি পুরুষকে নিজের বৃত্ত ও অপর বৃত্ত সম্বন্ধে সচেতন করে।
আইন ও আদালতের অনুমতি প্রার্থনার বেলায় আবার ঔচিত্যবোধ প্রাধান্য পায়। একজনের গণতান্ত্রিক অধিকার অন্যজনের মনঃপীড়া ঘটাচ্ছে কি না, তা দেখে নেওয়ার সম্ভাবনায় জোর দেয়। পুজোয় স্টল দেওয়া নিয়ে আদালত তাই রায় দিয়েছে-অনুমতি ব্যতিরেকে কোনও স্টল দেওয়া যাবে না। রাজনীতি এবং ধর্মের চেয়েও এখানে আদালত বিশ্বাস রেখেছে ঔচিত্যের ভারসাম্যে। সাধু।
