কুড়িগ্রামের উলিপুরে আমন ধানের খেতে ছাতরা পোকার (মিলিবাগ) আক্রমণ দেখা দিয়েছে। উপজেলার বিভিন্ন এলাকার ধানখেতে এ পোকার বিস্তার বাড়ায় ফলন নিয়ে শঙ্কায় পড়েছেন কৃষকেরা। আক্রান্ত জমিতে বিভিন্ন ধরনের বালাইনাশক প্রয়োগ করেও কাঙ্ক্ষিত সুফল না পাওয়ার অভিযোগ তাঁদের। কোথাও কোথাও ধানগাছের পাতা হলুদ হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। এতে আমন ধানের উৎপাদন নিয়ে দুশ্চিন্তায় রয়েছেন কৃষকেরা।
সরেজমিনে উপজেলার বিভিন্ন এলাকার আমনখেত ঘুরে দেখা যায়, আক্রান্ত ধানগাছের কাণ্ড ও পাতার খোলে সাদা তুলা বা মোমের মতো আবরণ তৈরি হয়েছে। এর নিচে ছোট ছোট ছাতরা পোকা অবস্থান করছে। আক্রান্ত গাছের পাতা প্রথমে হলুদ হয়ে যাচ্ছে, পরে পোড়া পোড়া ভাব নিয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। কোনো কোনো জমিতে ধানগাছের বড় অংশ হলুদ হয়ে পড়েছে। এতে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হচ্ছে।
কৃষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, আগের বছরগুলোতে এলাকায় আমন ধানে এ পোকার আক্রমণ তেমন দেখা যায়নি। তবে চলতি মৌসুমে বিভিন্ন এলাকার জমিতে এর উপস্থিতি বেড়েছে। আক্রান্ত জমিতে বালাইনাশক প্রয়োগ করেও অনেক কৃষক উপকার পাচ্ছেন না। ফলে বাড়তি খরচের পাশাপাশি ফলন কমে যাওয়ার আশঙ্কাও তৈরি হয়েছে।
উপজেলা কৃষি অফিস সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর উলিপুরে ২৪ হাজার ৬৬০ হেক্টর জমিতে আমন ধান চাষের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে হাইব্রিড জাতের ১ হাজার ৫৭০ হেক্টর, উচ্চ ফলনশীল (উফশী) জাতের ২১ হাজার ৮৭৫ হেক্টর এবং স্থানীয় জাতের ১ হাজার ২১৫ হেক্টর জমিতে ধান রোপণ করা হয়েছে।
উলিপুর পৌরসভার নারিকেলবাড়ি গ্রামের কৃষক সিরাজুল ইসলামের ৪০ শতক জমির প্রায় অর্ধেকের ধান হলুদ হয়ে শুকিয়ে যাচ্ছে। তিনি বলেন, “বাজার থেকে বিভিন্ন ধরনের ওষুধ কিনে স্প্রে করেছি। কিন্তু কোনো সুফল পাচ্ছি না। এভাবে চলতে থাকলে ধানের ফলন কমে যাবে। এ নিয়ে খুব দুশ্চিন্তায় আছি।”
ধামশ্রেণী ইউনিয়নের খাওনারদরগা এলাকার কৃষক আকবর আলী বলেন, “এবার এক একর ৭৫ শতাংশ জমিতে আমন ধান লাগাইছি। এর মধ্যে প্রায় ৪০ শতাংশ জমিতে ছাতরা পোকা ধরেছে। অনেক ওষুধ দিছি, তেমন কাজ হয় নাই। এবার তো পুরো লস হওয়ার মতো অবস্থা।”
ওই ইউনিয়নের কাশিয়াগাড়ী গ্রামের কৃষক লাল মিয়ার ২০ শতক এবং ধরণীবাড়ী ইউনিয়নের সাতকুড়ার পাড় গ্রামের কৃষক মজিদ মিয়ার ২৫ শতক জমিতেও একই ধরনের আক্রমণ দেখা দিয়েছে।
গুনাইগাছ ইউনিয়নের গাবেরতল এলাকার কৃষক আব্দুর রহমানের প্রায় ২৫ শতক জমির ধানও এ পোকার আক্রমণে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি বলেন, “বিভিন্ন ধরনের বালাইনাশক প্রয়োগ করেও তেমন ফল পাওয়া যায়নি। আক্রান্ত ধানগাছগুলো শুকিয়ে পুড়ে যাওয়ার মতো দেখাচ্ছে।”
উপসহকারী কৃষি কর্মকর্তা মাসুদ রানা বলেন, ছাতরা পোকা কোনো রোগ নয়; এটি ধানগাছের রস শোষণকারী ক্ষতিকর পোকা। এর আক্রমণে গাছের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হয় এবং পাতা হলুদ হয়ে যায়। আক্রমণ তীব্র হলে গাছ শুকিয়েও যেতে পারে। আগের বছরগুলোতে এ এলাকায় আমন ধানের খেতে এ পোকার উপস্থিতি তেমন দেখা যায়নি বলে জানান তিনি।
এ ব্যাপারে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা ও কৃষিবিদ শহীদুল ইসলাম বলেন, খরা ও জমিতে পানির স্বল্পতার কারণে ছাতরা পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে। আক্রান্ত গাছ তুলে ধ্বংস করা, জমিতে সেচ দেওয়া এবং অনুমোদিত বালাইনাশক সঠিক মাত্রায় প্রয়োগের পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে কুড়িগ্রাম কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক আবু ফাত্তাহ মো. রওশন কবির বলেন, খরার কারণে জমিতে ছাতরা পোকার আক্রমণ বাড়তে পারে। এ পোকা দমনে মাঠপর্যায়ে কৃষকদের প্রয়োজনীয় পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে। পাশাপাশি কৃষকদের সচেতন করতে লিফলেট বিতরণসহ বিভিন্ন কার্যক্রম চলছে। কৃষি কর্মকর্তাদের পরামর্শ অনুযায়ী সঠিক সময়ে অনুমোদিত বালাইনাশক প্রয়োগ করলে এ পোকা দমন করা সম্ভব বলে জানান তিনি।
