পাকিস্তানের খাইবার পাখতুনখাওয়া প্রদেশের নিয়ন্ত্রণ নেওয়ার কেন্দ্রীয় সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে আদালতে যাচ্ছে কারাবন্দি সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খানের দল পাকিস্তান তেহরিক-ই-ইনসাফ (পিটিআই)।
বিজ্ঞাপন
মঙ্গলবার জরুরি অবস্থা জারি ও গভর্নরের শাসন আরোপের সিদ্ধান্ত চ্যালেঞ্জ করে আবেদন করবে দলটি। রোববার প্রদেশের পিটিআই সরকারকে স্থগিত করে কেন্দ্রীয় সরকার। এ পদক্ষেপ ঘিরে পাকিস্তানে নতুন রাজনৈতিক সংঘাত তৈরি হয়েছে।
পিটিআইয়ের কেন্দ্রীয় তথ্য সম্পাদক শেখ ওয়াকাস আকরাম আল-জাজিরাকে বলেন, জরুরি আইন জারি করে নাগরিক স্বাধীনতা স্থগিত এবং গভর্নরের শাসন আরোপের বিরুদ্ধে আদালতে যাবে দলটি। পিটিআইয়ের মহাসচিব সালমান আকরাম রাজার নেতৃত্বাধীন আইনি কমিটি আবেদনের খসড়া তৈরি করেছে। তবে আবেদনটি সুপ্রিম কোর্টে, নাকি ফেডারেল সাংবিধানিক আদালতে করা হবে, তা জানাননি তিনি।
ইমরান খানকে মুক্ত করার দাবিতে পিটিআইয়ের ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রার মধ্যেই কেন্দ্রের এ পদক্ষেপ এল। তিন বছরের বেশি সময় ধরে কারাবন্দি রয়েছেন ইমরান। তাকে মুক্তি দিতে সরকারের ওপর চাপ সৃষ্টি করাই ছিল পদযাত্রার লক্ষ্য। প্রাদেশিক সরকার স্থগিত ও দলের নেতাদের আটকের পরও কর্মসূচি চালিয়ে যাওয়ার ঘোষণা দিয়েছে পিটিআই।
কেন্দ্রীয় সরকার বলছে, সন্ত্রাসবাদ দমনে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় কেন্দ্রের সরাসরি শাসন প্রয়োজন। আফগানিস্তানের সঙ্গে অরক্ষিত সীমান্ত থাকা এই প্রদেশে সশস্ত্র গোষ্ঠীগুলোর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে প্রাদেশিক সরকার যথাযথ নেতৃত্ব দিচ্ছে না বলে অভিযোগ ইসলামাবাদের।
সোমবার পেশোয়ারে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী মহসিন নকভি বলেন, ‘আপনি যত সম্পদই আনুন, যা-ই করুন, সেখানকার সরকার নেতৃত্ব না দিলে কোনো যুদ্ধে জয়ী হওয়া সম্ভব নয়।’
রোববার প্রেসিডেন্ট আসিফ আলী জারদারি প্রদেশটিতে জরুরি অবস্থা ও গভর্নরের শাসন জারি করেন। ২০১৩ সাল থেকে খাইবার পাখতুনখাওয়া শাসন করে আসছে পিটিআই।
স্থগিত হওয়া সরকারের মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদি এবং তার মন্ত্রিসভার কয়েকজন সদস্যকে আগাম সতর্কতামূলক আটক করা হয়েছে বলে সোমবার জানান স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী তালাল চৌধুরী। ইমরানকে মুক্ত করার দাবিতে ইসলামাবাদ অভিমুখে পদযাত্রায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন আফ্রিদি।
শেখ ওয়াকাস আকরাম বলেন, ‘দীর্ঘ পদযাত্রা শেষ হয়নি। তবে দলের বিরুদ্ধে ঐতিহাসিক দমন-পীড়ন শুরু হয়েছে।’
কেন্দ্রীয় সরকারের এই হস্তক্ষেপের সাংবিধানিক ভিত্তি নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। রোববারের ঘোষণাপত্রে বলা হয়েছে, সন্ত্রাসবাদের হুমকি মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় সদিচ্ছা ও উদ্যোগ দেখাতে ব্যর্থ হয়েছে প্রাদেশিক সরকার।
স্বাধীন রাজনৈতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাকিস্তান ইনস্টিটিউট অব লেজিসলেটিভ ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড ট্রান্সপারেন্সির (পিলড্যাট) যুগ্ম পরিচালক আসিয়া রিয়াজ বলেন, সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে লড়াই থেকে প্রাদেশিক সরকারের ‘ইচ্ছাকৃতভাবে সরে আসার’ অভিযোগকে জরুরি অবস্থা জারির সাংবিধানিক ভিত্তি হিসেবে দেখাচ্ছে কেন্দ্র।
তবে লাহোর ইউনিভার্সিটি অব ম্যানেজমেন্ট সায়েন্সেসের শিক্ষক ও আইনজীবী হাসান আবদুল্লাহ নিয়াজি এ যুক্তি প্রত্যাখ্যান করেছেন। তিনি বলেন, খাইবার পাখতুনখাওয়ায় কার্যকর আইনসভা ও নির্বাহী বিভাগ ছিল এবং তাদের প্রতি জনগণের আস্থা ছিল।
তার মতে, কেন্দ্রের এই পদক্ষেপ প্রাদেশিক স্বায়ত্তশাসনের বিরুদ্ধে অসাংবিধানিক হস্তক্ষেপ।
গত মাসে ক্ষমতাসীন পাকিস্তান মুসলিম লিগ-নওয়াজের (পিএমএল-এন) নেতা ও প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফের রাজনৈতিক উপদেষ্টা ইখতিয়ার ওয়ালি খান ১৪ পৃষ্ঠার একটি শ্বেতপত্র প্রকাশ করেন। এতে প্রদেশে পুলিশের প্রাণহানি বৃদ্ধি, সন্ত্রাসবিরোধী বিভাগের জনবল ও সরঞ্জামের ঘাটতি এবং সরকারি ব্যয়ের অগ্রাধিকার নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়।
পিটিআই সন্ত্রাসবাদ দমনে ব্যর্থ—কেন্দ্রের এই অভিযোগও প্রত্যাখ্যান করেছেন আকরাম। তার দাবি, সশস্ত্র গোষ্ঠীর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে নিহত ৯০০-এর বেশি সেনা, পুলিশ ও আধা সামরিক বাহিনীর সদস্যের পরিবারের জন্য প্রাদেশিক সরকার নিজস্ব তহবিল থেকে ১৮৩ কোটি পাকিস্তানি রুপি (৬৬ লাখ মার্কিন ডলার) দিয়েছে। অন্য কোনো প্রদেশ এমন অবদান রাখেনি বলেও দাবি করেন তিনি।
কেন্দ্র ও পিটিআইয়ের বিরোধ শুধু নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে নয়, আলোচনার বিষয়বস্তু নিয়েও দুই পক্ষের বক্তব্যে বড় ফারাক রয়েছে।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নকভি বলেন, ইমরান খানের মুক্তির দাবিতে পিটিআইয়ের প্রস্তাবিত অবস্থান কর্মসূচি নিয়ে সরকারের সঙ্গে আলোচনা চলছিল। অবস্থান কর্মসূচিতে সরকারের আপত্তি নেই। তবে সন্ত্রাসবাদ দমনে পিটিআইয়ের সহযোগিতা চায় কেন্দ্র।
পিটিআই নেতা ও সাবেক প্রাদেশিক অর্থমন্ত্রী তৈমুর ঝাগরা বলেন, ইমরান খানকে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী চিকিৎসা ও স্বজনদের সঙ্গে সাক্ষাতের অধিকার নিশ্চিত করার দাবিতে আন্দোলন নিয়ে আলোচনা করতে রাজি হয়েছিল দলটি। সেই আলোচনা সন্ত্রাসবাদ মোকাবিলার কৌশল নিয়ে আলোচনায় পরিণত হওয়াকে তিনি অযৌক্তিক বলে মন্তব্য করেন।
নকভির দাবি, আলোচনায় প্রদেশের ১২টি জেলায় জরুরি শাসন জারির বিষয়ে পিটিআই সম্মতি দিয়েছিল।
তবে আকরাম এ দাবি নাকচ করে বলেন, দলটি প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করেছিল। কারণ, সামরিক অভিযানের খেসারত দিতে হতে পারে স্থানীয় বাসিন্দাদের।
আকরাম বলেন, ‘আমরা বলেছিলাম, এটা হতে পারে না। আপনারা তাদের সঙ্গে যা খুশি করতে পারেন না। তাদের ভোটেই আমরা নির্বাচিত হয়েছি। আগামীকাল তারা আমাদের বলবে, আপনারা আমাদের মৃত্যুর মুখে ঠেলে দিয়েছেন।’
আকরাম জানান, পিটিআইয়ের আলোচকেরা কেন্দ্রের প্রস্তাবটি মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির কাছে পাঠিয়েছিলেন। আফ্রিদি তা প্রত্যাখ্যান করেন।
কেন্দ্রীয় তথ্যমন্ত্রী আত্তাউল্লাহ তারার আরো অভিযোগ করেন, পিটিআইয়ের প্রাদেশিক সরকার খাইবার পাখতুনখাওয়ার হাজারো নাগরিকের মৃত্যুর জন্য দায়ী।
তার দাবি, আফ্রিদির সরকার তেহরিক-ই-তালেবান পাকিস্তান (টিটিপি), অর্থাৎ পাকিস্তানি তালেবান, এবং আফগান তালেবানের সঙ্গে যোগসাজশে ছিল। তবে এসব যোগসাজশের পক্ষে প্রকাশ্যে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
নিরাপত্তা পরিস্থিতির অবনতির বিষয়টি অবশ্য সরকারি ও স্বাধীন—দুই ধরনের পরিসংখ্যানেই উঠে এসেছে। কেন্দ্রীয় সরকারের শ্বেতপত্র অনুযায়ী, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে খাইবার পাখতুনখাওয়ায় ১২২ জন পুলিশ সদস্য নিহত হয়েছেন। গত বছরের একই সময়ে এ সংখ্যা ছিল ৬৩।
ইসলামাবাদভিত্তিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর রিসার্চ অ্যান্ড সিকিউরিটি স্টাডিজের (সিআরএসএস) হিসাবে, চলতি বছরের জুলাই থেকে সেপ্টেম্বর পর্যন্ত প্রদেশটিতে সহিংসতাসংশ্লিষ্ট ঘটনায় ৫৫৬ জন নিহত হয়েছেন। এর আগের প্রান্তিকে নিহতের সংখ্যা ছিল ৪৭৫; তার আগের প্রান্তিকে ৩১১।
তবে সহিংসতায় আরো বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বেলুচিস্তান। সিআরএসএসের তথ্য অনুযায়ী, সেখানে নিহতের সংখ্যা ২১৩ শতাংশ বেড়ে ৮২৯ জনে দাঁড়িয়েছে। এ হিসাবে পাকিস্তানের সবচেয়ে বেশি সহিংসতাপ্রবণ প্রদেশ বেলুচিস্তান।
কেন্দ্র বলছে, সন্ত্রাসবাদ দমনে প্রাদেশিক সরকারের ব্যর্থতার কারণেই হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। কিন্তু বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, নিরাপত্তার যুক্তির আড়ালে রাজনৈতিক উদ্দেশ্যও রয়েছে।
ইসলামাবাদভিত্তিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক জাইগাম খান মনে করেন, কেন্দ্রের সিদ্ধান্তে রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা—তিনটি বিষয়ই কাজ করেছে।
তবে খাইবার পাখতুনখাওয়ার দীর্ঘদিনের পর্যবেক্ষক আলি আরকামের মতে, এটি মূলত রাজনৈতিক পদক্ষেপ, যাকে প্রশাসনিক প্রয়োজন হিসেবে তুলে ধরা হচ্ছে।
পিটিআই নেতা তৈমুর ঝাগরার দাবি, কেন্দ্র মনে করছে, প্রাদেশিক সরকারের নিয়ন্ত্রণ নেওয়া গেলে দলটিকে দুর্বল করা সম্ভব হবে।
কিন্তু তার মতে, পাকিস্তানের বিভিন্ন অঞ্চলের মানুষ এখনো ইমরান খানকেই নিজেদের নেতা মনে করেন।
তার ভাষায়, সরকার মূলত জনসমর্থন ও বৈধতার সংকট কাটানোর চেষ্টা করছে।
অন্যদিকে, কেন্দ্রীয় আইনমন্ত্রী আজম নাজির তারার বলেছেন, প্রদেশে কেন্দ্রের হস্তক্ষেপ পুরোপুরি সাংবিধানিক পদক্ষেপ।
সরকার স্থগিত হওয়ার পর পিটিআইয়ের তাৎক্ষণিক উদ্বেগ এখন দলের নেতাদের অবস্থান ও আদালতের লড়াই ঘিরে। আকরাম জানিয়েছেন, মুখ্যমন্ত্রী সোহেল আফ্রিদির সঙ্গে দলের কারো যোগাযোগ নেই।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী নকভি সোমবার বলেন, সন্ত্রাসবাদবিরোধী অভিযানে এক দিনে ফল পাওয়া যাবে না। এ পথে উত্থান-পতন থাকবে এবং সামনে আরো কঠিন সময় আসতে পারে।
তবে আলি আরকামের মতে, কেন্দ্রীয় সরকারের সাফল্যও একই মানদণ্ডে বিচার করতে হবে। নিরাপত্তা পরিস্থিতির উন্নতি হচ্ছে কি না, মৌলিক সেবা বাড়ছে কি না এবং প্রতিশ্রুত অর্থ ও সম্পদ শেষ পর্যন্ত প্রদেশে পৌঁছাচ্ছে কি না—এসব বিষয়ই হবে সরকারের কার্যকারিতা যাচাইয়ের প্রধান মাপকাঠি।
এএম
