সিলেট ভয়েস ডেস্ক · ১২ অক্টোবর, ২০২৬ ৯:২৬ অপরাহ্ন
যুক্তরাজ্য সরকারের কঠোর ভিসা নীতির কারণে আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে নতুন সংকট তৈরি হয়েছে। ভিসা প্রত্যাখ্যানের নির্ধারিত সীমা অতিক্রম করে ভর্তি করানোর লাইসেন্স হারানোর আশঙ্কায় বাংলাদেশ, পাকিস্তান, নাইজেরিয়াসহ বিভিন্ন দেশের শিক্ষার্থীদের দেওয়া ভর্তির অফার বাতিল করছে দেশটির বিশ্ববিদ্যালয়গুলো।
ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ফাইন্যান্সিয়াল টাইমসের (এফটি) এক প্রতিবেদনে এ তথ্য উঠে এসেছে।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যে শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন প্রত্যাহারের হার বেড়ে ১০ দশমিক ৫ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ২ দশমিক ৩ শতাংশ। ২০২৩ সালে তা ছিল মাত্র শূন্য দশমিক ৪ শতাংশ।
যুক্তরাজ্যের স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় (হোম অফিস) থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস জানায়, চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদন প্রত্যাহারের হার বেড়ে ৪০ দশমিক ৯ শতাংশে দাঁড়িয়েছে। গত বছরের একই সময়ে এ হার ছিল ৩ শতাংশ। বাংলাদেশি আবেদনকারীদের ক্ষেত্রে হার ৭ দশমিক ১ শতাংশ থেকে বেড়ে ২৩ দশমিক ৫ শতাংশ হয়েছে। অন্যদিকে ভারতীয় শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে এ হার ১ দশমিক ২ শতাংশ থেকে বেড়ে ৫ দশমিক ২ শতাংশে দাঁড়িয়েছে।
ভিসা প্রত্যাখ্যানে কঠোর নিয়ম
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তি করানোর ক্ষেত্রে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর ওপর নজরদারি বাড়িয়েছে যুক্তরাজ্য সরকার। নতুন নিয়ম অনুযায়ী, কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ের সুপারিশ করা বিদেশি শিক্ষার্থীদের ৫ শতাংশের বেশি ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যাত হলে প্রতিষ্ঠানটির আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির স্পনসর লাইসেন্স বাতিল হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হবে। আগে এ ক্ষেত্রে সীমা ছিল ১০ শতাংশ।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি, সম্প্রতি শিক্ষার্থী ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বেড়ে যাওয়ায় লাইসেন্স হারানোর ঝুঁকি এড়াতে তারা আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা হিসেবে অনেক শিক্ষার্থীর ভর্তির অফার বাতিল করছে। এর ফলে সংশ্লিষ্ট শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদনও প্রত্যাহার হয়ে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থীরা বিশ্ববিদ্যালয়ের অফার লেটার পাওয়ার পর শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন করতে পারেন। পরে বিশ্ববিদ্যালয় সেই অফার প্রত্যাহার করলে সংশ্লিষ্ট ভিসার আবেদনও প্রত্যাহার করতে হয়।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি, ২০২৬ সালের প্রথম ছয় মাসে যুক্তরাজ্যের হোম অফিস আগের বছরের একই সময়ের তুলনায় দ্বিগুণসংখ্যক শিক্ষার্থী ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যান করেছে।
পরিসংখ্যান অনুযায়ী, চলতি বছর প্রায় ১৫টি বিশ্ববিদ্যালয় পাকিস্তানি শিক্ষার্থীদের ভর্তি কার্যক্রম পুরোপুরি স্থগিত করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে নাইজেরীয় শিক্ষার্থীদের ভিসার আবেদন প্রত্যাহারের হারও উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়েছে। চলতি বছরের প্রথম ছয় মাসে দেশটির শিক্ষার্থীদের আবেদন প্রত্যাহারের হার দাঁড়িয়েছে ২২ দশমিক ৭ শতাংশে। ২০২৫ সালের একই সময়ে এ হার ছিল ৪ দশমিক ৫ শতাংশ।
ভিসা আবেদন প্রক্রিয়াকরণকারী সংস্থা এনরোলির তথ্য অনুযায়ী, যুক্তরাজ্যের প্রায় অর্ধেক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নির্ধারিত ৫ শতাংশের সীমা ছাড়িয়ে গেছে। এতে এসব প্রতিষ্ঠানের আন্তর্জাতিক শিক্ষার্থী ভর্তির লাইসেন্স হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
যুক্তরাজ্য সরকার বলছে, শিক্ষার্থী ভিসার অপব্যবহার ঠেকানোই কঠোর নীতির মূল উদ্দেশ্য। বিশেষ করে শিক্ষার্থী ভিসায় দেশটিতে প্রবেশের পর আশ্রয়ের আবেদন করা কিংবা অবৈধ কাজে যুক্ত হওয়ার প্রবণতা রোধ করতে চায় সরকার।
তবে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর দাবি, কিছু শিক্ষার্থীর ভিসা প্রত্যাখ্যানের পেছনে যথাযথ যুক্তি নেই। কোনো কোনো ক্ষেত্রে শিক্ষার্থীরা আগে অন্য দেশে পড়াশোনার কথা বিবেচনা করেছিলেন—এমন কারণেও তাঁদের ভিসা প্রত্যাখ্যান করা হয়েছে। আবার কিছু পিএইচডি আবেদনকারীকে তাঁদের গবেষণাসংশ্লিষ্ট কোর্সের বিষয় বা নির্দিষ্ট মডিউল সম্পর্কে প্রশ্নের উত্তর দিতে না পারার কারণে প্রত্যাখ্যানের মুখে পড়তে হয়েছে।
বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর উদ্বেগ
বিদেশি শিক্ষার্থী ভর্তি করানো বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর প্রতিনিধিত্বকারী সংগঠন ইউনিভার্সিটিজ ইউকে ইন্টারন্যাশনালের পরিচালক জেমি অ্যারোস্মিথ অভিবাসনব্যবস্থার ওপর আস্থা বজায় রাখার প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করেছেন। তিনি বলেন, ‘ভিসা প্রক্রিয়াকরণ এখন আগের তুলনায় অনেক বেশি অনিশ্চিত হয়ে পড়েছে। অনেক ভিসার আবেদন প্রত্যাখ্যানের পেছনে রয়েছে ত্রুটিপূর্ণ, অসংগতিপূর্ণ যুক্তি। ফলে নির্ধারিত সীমা লঙ্ঘনের ঝুঁকি এড়াতে বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে ব্যাপক হারে ভর্তির অফার বাতিল করতে হচ্ছে।’
ইউনিভার্সিটি অব ইস্ট অ্যাংলিয়ার উপ-উপাচার্য অধ্যাপক স্টিভেন ম্যাকগুয়ার জানান, এ নীতির ফলে বিশ্ববিদ্যালয়গুলো চীন ও ভারতের শিক্ষার্থীদের ওপর আরও বেশি নির্ভরশীল হয়ে পড়তে পারে। কারণ, এসব দেশের শিক্ষার্থীদের ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার তুলনামূলকভাবে কম।
ইউনিভার্সিটি অব দ্য ওয়েস্ট অব স্কটল্যান্ডের উপাচার্য অধ্যাপক জেমস মিলার বলেন, ‘কিছু ভিসা প্রত্যাখ্যানের সিদ্ধান্তের পেছনে অত্যন্ত দুর্বল ও অযৌক্তিক যুক্তি দেওয়া হয়েছে।’
তার দাবি, আশ্রয়ের আবেদন করা শিক্ষার্থীদের সংখ্যা নিয়ে উদ্বেগের কথা বলা হলেও ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার বৃদ্ধির বিষয়ে হোম অফিস কোনো বাস্তবসম্মত ব্যাখ্যা দেয়নি।
ভিসা প্রত্যাখ্যানের হার নির্ধারিত ৫ শতাংশের নিচে রাখতে গিয়ে কিছু বিশ্ববিদ্যালয় বিশ্বের নির্দিষ্ট অঞ্চল থেকে শিক্ষার্থী নিয়োগ বন্ধ করে দিয়েছে। এতে বাংলাদেশ, পাকিস্তান ও নাইজেরিয়ার মতো দেশের শিক্ষার্থীদের যুক্তরাজ্যে উচ্চশিক্ষার সুযোগ আরও সংকুচিত হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
গুগলে আমাদের খবর পেতে
