আমরা এখন অনেক ক্ষেত্রে বিলাসবহুল ও পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ করছি এবং সেগুলোর জন্য বিভিন্ন সার্টিফিকেশনও নিচ্ছি। কিন্তু সেই ভবন যদি ভুল জায়গায় নির্মিত হয়, তাহলে যাতায়াতের কারণে এর সঙ্গে যুক্ত কার্বন ফুটপ্রিন্ট অনেক বেড়ে যেতে পারে।
গত ৫০-৬০ বছরে একটি যুদ্ধবিধ্বস্ত দেশ জাপান কিংবা সিউল ও সিঙ্গাপুরের মতো শহর একেবারে শূন্য থেকে আজকের অবস্থানে এসেছে মাত্র পাঁচ-ছয় দশকে। এ প্রেক্ষাপট মাথায় রেখে আমরা যদি বাংলাদেশের শহরগুলোর কথা চিন্তা করি তাহলে এসব দেশ বা শহরের অভিজ্ঞতা আমাদের জন্য অনুপ্রেরণা হতে পারে। তবে সেই অনুপ্রেরণা কাজে লাগাতে হলে আমাদের বাস্তবতাও বুঝতে হবে।
দেশের সম্পদের সীমাবদ্ধতা রয়েছে, অর্থনীতির বর্তমান অবস্থাও একটি বাস্তবতা। ফলে আমাদের বাস্তববাদী হতে হবে। সামর্থ্যের মধ্যে থেকে কী করা সম্ভব, কীভাবে এগোনো সম্ভব, তা নিয়ে বাস্তবসম্মত পরিকল্পনা করতে হবে।
স্মার্ট আবাসন ও টেকসই নগরায়ণ নিয়ে আমরা দশকের পর দশক ধরে কথা বলছি। কিন্তু বাস্তবে আমরা যেখানে ছিলাম, অনেক ক্ষেত্রে সেখানেই আছি। বরং বলা যায়, কিছু কিছু ক্ষেত্রে পরিস্থিতি আরো খারাপের দিকে যাচ্ছে।
আমাদের কিছু বড় কাঠামোগত চ্যালেঞ্জ রয়েছে। স্মার্ট সিটি কিংবা নগরায়ণ নিয়ে চিন্তা করার ক্ষেত্রে সেগুলো বিবেচনায় নিতে হবে। প্রথমত, আমাদের আবাসন সংকট রয়েছে। ঢাকা শহরের বড় সংকটগুলোর একটি হলো আবাসন। আবাসনের চাহিদা রয়েছে, কিন্তু সেই চাহিদা অনুযায়ী সরবরাহ নেই। বিশ্বব্যাংকের তথ্যও বলছে, বাংলাদেশে প্রতি বছর প্রায় আড়াই-তিন লাখ আবাসনের ঘাটতি তৈরি হচ্ছে। অর্থাৎ এ ঘাটতি প্রতি বছর বাড়ছে।
এখন প্রশ্ন হলো ক্রমবর্ধমান আবাসন ঘাটতি কীভাবে পূরণ এবং আবাসন ব্যবস্থাকে কীভাবে স্মার্ট করা হবে? প্রথমে আমাদের আবাসনের সরবরাহ নিশ্চিত করতে হবে। এরপর সেই আবাসনকে ভবিষ্যতের উপযোগী, স্মার্ট ও টেকসই করে গড়ে তুলতে হবে। চাহিদা অনুযায়ী আবাসন সরবরাহ করতে না পারলে শুধু স্মার্ট আবাসনের ধারণা নিয়ে আলোচনা করে খুব বেশি দূর এগোনো সম্ভব হবে না।
এ প্রসঙ্গে আমি দুটি তথ্য তুলে ধরতে চাই। প্রথম তথ্যটি জ্বালানি নিয়ে। আমাদের দেশে উৎপাদিত মোট জ্বালানির প্রায় এক-তৃতীয়াংশ আবাসিক খাতে ব্যবহৃত হয়। জ্বালানি খাতসংশ্লিষ্টরা বিষয়টি স্বীকার করবেন। অর্থাৎ আমাদের উৎপাদিত জ্বালানির একটি বড় অংশ আবাসিক খাতে ব্যয় হচ্ছে।
সুতরাং যদি আবাসন খাতকে স্মার্ট ও পরিবেশবান্ধব করা যায় এবং জ্বালানির ব্যবহার কমাতে পারি, তাহলে এ খাত থেকেই বিপুল পরিমাণ জ্বালানি সাশ্রয় সম্ভব। কাজেই স্মার্ট আবাসন শুধু বসবাসের পরিবেশ উন্নত করার বিষয় নয়; এর সঙ্গে দেশের সামগ্রিক জ্বালানি ব্যবহার ও অর্থনৈতিক সাশ্রয়েরও সম্পর্ক রয়েছে।
দ্বিতীয় তথ্যটি অর্থায়ন নিয়ে। স্মার্ট সিটি ও নগর উন্নয়নের আলোচনায় অর্থায়নের বিষয়টি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। এক্ষেত্রে বিভিন্ন ধরনের আর্থিক পণ্য তৈরি করা যেতে পারে। কিন্তু দেশে আবাসন অর্থায়নের পরিস্থিতি কতটা সীমিত, তা একটি তথ্য থেকেই বোঝা যায়।
বাংলাদেশে জিডিপির মাত্র ২ শতাংশেরও কম হলো মর্টগেজ ফাইন্যান্সের পরিমাণ। অন্যদিকে চীনে এ হার প্রায় ৩০ শতাংশ এবং মালয়েশিয়ায় জিডিপির ৫০ শতাংশেরও বেশি মর্টগেজ ফাইন্যান্সের আওতায় রয়েছে। এ তুলনা থেকে বোঝা যায়, দেশে আবাসন অর্থায়নের পরিসর কতটা সীমিত। অথচ অর্থায়নের সঙ্গে নগর উন্নয়নকে টেকসই করা এবং স্মার্ট সিটি গড়ে তোলার সম্পর্ক অত্যন্ত ঘনিষ্ঠ।
আমরা যখন স্মার্ট সিটি নিয়ে কথা বলি, তখন অর্থায়নের বিষয়টিকে সেভাবে গুরুত্ব দিই না। অথচ এক্ষেত্রে গুরুত্ব না দিলে কীভাবে বর্তমান পরিস্থিতি থেকে উত্তরণ ঘটাব? তাই আমাদের এ বিষয়ে গুরুত্বের সঙ্গে চিন্তা করতে হবে এবং অর্থায়নের বাস্তবসম্মত পথ খুঁজে বের করতে হবে।
স্মার্ট সিটি কিংবা স্মার্ট আবাসন বলতে আমরা অনেক সময় অত্যাধুনিক প্রযুক্তি, ছাদে সৌরবিদ্যুতের ব্যবস্থা কিংবা বিভিন্ন ধরনের স্মার্ট যন্ত্রপাতিকে বুঝি। কিন্তু স্মার্ট সিটি বা স্মার্ট আবাসনের ধারণা শুধু এসব প্রযুক্তি কিংবা গ্যাজেটের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়।
একটি স্মার্ট বাড়ি হলো এমন বাড়ি, যেখানে স্বাভাবিকভাবেই প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচল করতে পারে। ভবনের নকশা এমন হবে, যাতে দিনের বেলায় যথাসম্ভব প্রাকৃতিক আলো ব্যবহার করা যায় এবং বাতাস চলাচলের ব্যবস্থা থাকে। অবশ্যই সৌরবিদ্যুতের প্রয়োজন রয়েছে, এনার্জি অডিট করতে হবে এবং নির্মাণসামগ্রীর ব্যয় ও ভবনের পুরো জীবনচক্রের ব্যয় কমানোর দিকে নজর দিতে হবে। অর্থাৎ শুধু নির্মাণের সময় কত টাকা খরচ হলো সেটি বিবেচনা করলেই হবে না; ভবনটি ব্যবহার করতে গিয়ে দীর্ঘমেয়াদে কত ব্যয় হবে সেটিও বিবেচনায় নিতে হবে।
আমাদের দেশে এ ধরনের কিছু উদ্যোগ এরই মধ্যে শুরু হয়েছে। জ্বালানির বিল কমানো, পানির ব্যবহার কমানো এবং ভবনের সামগ্রিক ব্যয় হ্রাস করার বিষয়গুলোকে গুরুত্ব দিতে হবে। যে বাড়িতে জ্বালানি ব্যবহার কম হবে, বিদ্যুতের বিল কম হবে এবং পানির চাহিদা কম থাকবে সেই বাড়িকে আমরা স্মার্ট আবাসনের উদাহরণ হিসেবে বিবেচনা করতে পারি। এসব ব্যবস্থা বাস্তবায়নের জন্য সব সময় খুব জটিল প্রযুক্তির প্রয়োজন হয় না। বরং কিছু বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমেই অনেক উন্নতি সম্ভব।
আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো আবাসন, অবকাঠামো ও পরিবহনের মধ্যে সম্পর্ক। পরিবারের যাতায়াত ব্যয় কত হচ্ছে, বাড়ি থেকে প্রয়োজনীয় সেবা কতটা কাছে রয়েছে, কর্মস্থল কিংবা অন্যান্য গন্তব্যে যেতে কতটা পথ পাড়ি দিতে হচ্ছে—এসব বিষয়ও আবাসন পরিকল্পনার সঙ্গে সম্পর্কিত।
ধরা যাক আমরা একটি বাড়িকে খুব পরিবেশবান্ধবভাবে নির্মাণ করলাম। বাড়িটিতে সবুজ প্রযুক্তি ব্যবহার করা হলো, জ্বালানি সাশ্রয়ের ব্যবস্থাও রাখা হলো। কিন্তু বাড়িটি যদি এমন জায়গায় নির্মাণ করা হয়, যেখান থেকে কর্মস্থল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান কিংবা দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবায় পৌঁছতে অনেক দূর যাতায়াত করতে হয়, তাহলে সেই যাতায়াতের কারণে কার্বন নিঃসরণ অনেক বেড়ে যেতে পারে। অর্থাৎ একটি ভবন নিজে পরিবেশবান্ধব হলেই সেটি সামগ্রিকভাবে পরিবেশের জন্য ভালো হবে, এমন নয়।
আমরা এখন অনেক ক্ষেত্রে বিলাসবহুল ও পরিবেশবান্ধব ভবন নির্মাণ করছি এবং সেগুলোর জন্য বিভিন্ন সার্টিফিকেশনও নিচ্ছি। কিন্তু সেই ভবন যদি ভুল জায়গায় নির্মিত হয়, তাহলে যাতায়াতের কারণে এর সঙ্গে যুক্ত কার্বন ফুটপ্রিন্ট অনেক বেড়ে যেতে পারে। তাই পরিবহন ব্যবস্থা, অবকাঠামো ও আবাসনের মধ্যে সমন্বয় থাকতে হবে। আমাদের এমন নগর পরিকল্পনা করতে হবে, যেখানে মানুষ সহজে হেঁটে চলাচল করতে পারবে এবং দৈনন্দিন প্রয়োজনীয় সেবাগুলো কাছাকাছি পাবে। এতে পরিবারের যাতায়াত ব্যয় কমবে, সময় বাঁচবে এবং পরিবেশের ওপর চাপও কমবে।
এগুলো বাস্তবায়নের জন্য আমাদের সব সময় বিপুল পরিমাণ সম্পদ প্রয়োজন হবে না। জাপান, সিউল কিংবা সিঙ্গাপুরের উদাহরণ দেখলে বোঝা যায়, পরিকল্পিত নীতি ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপের মাধ্যমে শহরকে সুন্দর ও বাসযোগ্য করে তোলা সম্ভব। এজন্য শুধু বিপুল পরিমাণ সম্পদ সংগ্রহ করাই মুখ্য নয়; বরং বিদ্যমান সম্পদের যথাযথ ব্যবহার, কার্যকর পরিকল্পনা এবং নীতির বাস্তবায়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।
প্রতি বছর আমাদের দেশে বিপুলসংখ্যক বাড়ি নির্মিত হচ্ছে। এখন প্রশ্ন হলো যেসব বাড়ি নির্মিত হচ্ছে, সেগুলোকে কি আমরা পরিবেশবান্ধব করে তুলব না? নতুন বাড়ি নির্মাণের সময় থেকেই কি সবুজ নকশা অনুসরণ করা হবে, নাকি নির্মাণের পর এ বিষয়ে চিন্তা করা হবে?
বাস্তবতা হলো বাড়ি নির্মাণের পর সেটিকে পরিবেশবান্ধব করে তোলা অনেক কঠিন। তাই নির্মাণের শুরু থেকেই পরিকল্পনা করতে হবে। এরই মধ্যে যেসব বাড়ি নির্মিত হয়েছে সেগুলোকে পরিবেশবান্ধব করে তোলার ক্ষেত্রেও কৌশলগত ও বাস্তবসম্মত পদক্ষেপ প্রয়োজন।
এক্ষেত্রে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষসহ (রাজউক) বিভিন্ন উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ এবং সংশ্লিষ্ট পেশাজীবীদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রয়েছে। তারা এমন কিছু ব্যবস্থা বাধ্যতামূলক করতে পারেন, যাতে প্রতিটি বাড়িতে প্রাকৃতিক আলো-বাতাস চলাচলের উপযুক্ত ব্যবস্থা থাকে এবং ভবনের অভিমুখ সঠিকভাবে নির্ধারণ করা হয়। এগুলোকে আমরা প্যাসিভ ডিজাইন স্ট্র্যাটেজি বলি।
প্যাসিভ ডিজাইনের এসব কৌশল বাধ্যতামূলক করা গেলে ভবনের জ্বালানি ব্যবহার কমানো সম্ভব। এজন্য সব সময় বাড়তি প্রযুক্তি স্থাপন করতে হবে, এমন নয়। ভবনের নকশা ও নির্মাণের শুরুতেই কিছু বিষয় নিশ্চিত করা গেলে পরবর্তী সময়ে জ্বালানির ব্যবহার কমানো যায়। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ও অংশীজনদের দায়িত্ব হলো এসব নির্দেশনা বাস্তবে অনুসরণ করা হচ্ছে কিনা তা নিশ্চিত করা।
আমাদের বাংলাদেশ ন্যাশনাল বিল্ডিং কোড বা বিএনবিসি রয়েছে। জ্বালানি দক্ষতা বাড়ানোর জন্যও বিভিন্ন নীতিমালা ও নির্দেশনা রয়েছে। বক্তা হিসেবে আমি এখানে যে ‘শ্রেড’-এর কথা উল্লেখ করছি, সেটিসহ জ্বালানি মন্ত্রণালয়সংশ্লিষ্ট ব্যবস্থাগুলোর মধ্যেও এ ধরনের উদ্যোগ বাস্তবায়নের সুযোগ রয়েছে। আমাদের এমন কিছু কৌশল রয়েছে, যেগুলো প্রয়োগ করা এবং বৃহৎ পরিসরে বাস্তবায়ন করা সম্ভব।
একইভাবে প্যারিস চুক্তির আওতায় বাংলাদেশের জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান বা এনডিসির তৃতীয় সংস্করণ (এনডিসি-৩) নিয়েও পরিবেশবান্ধব উন্নয়নের জন্য বিভিন্ন কৌশল ও লক্ষ্য প্রস্তাব করা হয়েছে। অর্থাৎ পরিবেশবান্ধব ভবন ও নগর উন্নয়নের জন্য আমাদের প্রয়োজনীয় নীতি, নির্দেশনা এবং কৌশলগত কাঠামো একেবারে অনুপস্থিত নয়।
তাহলে সমস্যা কোথায়? সমস্যা হলো বাস্তবায়নে, বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগে ও অর্থায়নে। নীতিমালা তৈরি করলেই হবে না; সেগুলো কার্যকরভাবে বাস্তবায়ন করতে হবে, প্রয়োজন অনুযায়ী বৃহৎ পরিসরে প্রয়োগ করতে হবে এবং এজন্য অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে। আমরা যদি এগুলো অনুধাবন পারি এবং বাস্তবায়নের দিকে মনোযোগ দিই, তাহলে স্মার্ট আবাসন ও টেকসই নগরায়ণের ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি সম্ভব।
মোহাম্মদ ফয়েজ উল্লাহ: এমডি
স্পেসজিরো লিমিটেড
[বণিক বার্তা আয়োজিত স্মার্ট সিটি কনক্লেভ
২০২৬-এ প্যানেল আলোচকের বক্তব্যে]
