সোনালি ধানের শিষে দুলছে বাতাস। কোথাও কাস্তে হাতে ধান কাটছেন কৃষক, কোথাও চলছে ধানের আঁটি বাঁধার কাজ। পাকা ধান ঘরে তোলার ব্যস্ততার মধ্যেই পরবর্তী ফসলের পরিকল্পনা করছেন তারা। ধান কাটার পর জমিতে লাগাবেন ফুলকপি, গাজর, বেগুন ও ধনিয়াপাতা। শীতকালীন সবজি ঘরে তুলে সেই জমিতেই আবার বোরো ধানের আবাদ করবেন। একই জমিতে একের পর এক ফসল ফলিয়ে সচ্ছলতার স্বপ্ন দেখছেন রংপুর অঞ্চলের কৃষকেরা। উঁচু জমিতে শুরু হয়েছে আগাম জাতের আমন ধান কাটা। এ বছর অনেক এলাকায় ফলন আশানুরূপ হয়েছে। মাঠে ফলনের হাসি থাকলেও লাভের হিসাব মেলাতে হিমশিম খাচ্ছেন অনেকেই।
ফলন ভালো, বেড়েছে খরচ
রংপুরের মহিপুর তিস্তার চর এলাকার কৃষক শফিয়ার রহমান পাঁচ বিঘা জমিতে আগাম আমন ধান চাষ করেছেন। এর মধ্যে তিন বিঘা জমির ধান কেটে পেয়েছেন ৪৭ মণ। বাকি দুই বিঘার ধান এক সপ্তাহের মধ্যে কাটার আশা করছেন তিনি। ধান কাটার পর জমিতে ফুলকপি, গাজর, বেগুন ও ধনিয়াপাতা চাষ করবেন শফিয়ার। সবজি তোলার পর আবার বোরো ধানের আবাদ করবেন। এভাবেই একই জমিতে একের পর এক ফসল ফলিয়ে বাড়তি আয় করতে চান তিনি। শফিয়ার রহমান জানান, প্রতি বিঘা জমিতে ১৬ থেকে ১৮ মণ ধান পাওয়া যায়। এ বছর বিঘাপ্রতি উৎপাদন খরচ হয়েছে প্রায় ১৪ হাজার টাকা, যা গত বছর ছিল ১২ হাজার টাকা। অর্থাৎ, এক বিঘা জমিতে খরচ বেড়েছে দুই হাজার টাকা। তার ভাষায়, আগাম আমন ধান কাটার পরই জমিতে শীতকালীন সবজি চাষের প্রস্তুতি নিচ্ছেন তিনি। সবজি তুলে এরপর বোরো ধান লাগাবেন। লালমনিরহাট সদর উপজেলার কুলাঘাট গ্রামের কৃষক আদিলুর রহমানও ছয় বিঘা জমিতে আগাম আমন চাষ করেছেন। তার খরচ হয়েছে ৮৭ হাজার টাকা। গত বছর একই জমিতে খরচ হয়েছিল ৭১ হাজার টাকা। আদিলুর রহমান বলেন, ‘এবার ধানের ফলন ভালো হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় হতাশায় আছি।’
ধান কাটার পর নতুন স্বপ্ন
কুড়িগ্রামের কালীগঞ্জের কাকিনা চর রুদ্রেশ্বর এলাকার কৃষক হোসেন আলী জানান, তাদের এলাকায় চলতি সপ্তাহ থেকে আগাম আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। তিন বিঘা জমি থেকে তিনি পেয়েছেন ৫২ মণ ধান। এখন জমিতে ফুলকপি লাগাচ্ছেন। তিনি বলেন, ‘এ বছর ধানে তেমন রোগবালাই দেখা দেয়নি। ফলনও আশানুরূপ হয়েছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় লাভের অঙ্ক কমেছে।’ হাতীবান্ধার চর গড্ডিমারী এলাকার কৃষক রওশন আলম জানান, বন্যা না হওয়ায় এবার তাদের এলাকায় আগাম আমন ধানের ক্ষতি হয়নি। তার চার বিঘা জমির ধান পেকে গেছে। দুই-তিন দিনের মধ্যে কাটা শুরু করবেন।
লক্ষাধিক কৃষকের প্রত্যাশা
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্রে জানা গেছে, চলতি বছর রংপুর অঞ্চলের কুড়িগ্রাম, লালমনিরহাট, রংপুর, গাইবান্ধা ও নীলফামারীতে ৬ লাখ ২১ হাজার ৫৫০ হেক্টর জমিতে আমন ধানের চাষ হয়েছে। উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে ২০ লাখ ১ হাজার ৩৯১ টন চাল। এর মধ্যে আগাম জাতের আমন আবাদ হয়েছে ৩৩ হাজার হেক্টর জমিতে। রংপুর আঞ্চলিক কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত পরিচালক আবু বকর সাইফুল ইসলাম বলেন, উঁচু জমিতে আগাম আমন ধান কাটা শুরু হয়েছে। বন্যার প্রভাব কম থাকায় এ বছর উৎপাদন আশানুরূপ হয়েছে। ধান কাটার পর কৃষকেরা ভুট্টা, আলু ও বিভিন্ন ধরনের শীতকালীন ফসল চাষ করবেন। এক জমিতে তিন ফসল ফলানোর এই পরিকল্পনা কৃষকের সামনে বাড়তি আয়ের সম্ভাবনা তৈরি করছে। তবে উৎপাদন খরচ বেড়ে যাওয়ায় সেই সম্ভাবনা অনেকটাই চাপে পড়েছে। কৃষকদের প্রত্যাশা, ফসলের ন্যায্যমূল্য নিশ্চিত হবে, কমবে চাষাবাদের ব্যয়। মাঠের সোনালি ধানের হাসি তখনই সত্যিকারের স্বস্তি হয়ে উঠবে, যখন পরিশ্রমের যথাযথ দাম পাবেন তারা।
