ভারতের ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় সংশোধন (এসআইআর) প্রক্রিয়া এবং নির্বাচন কমিশনের বিভিন্ন সিদ্ধান্তের বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে সুপ্রিম কোর্টে যৌথ রিট আবেদন করেছেন লোকসভার বিরোধীদলীয় নেতা রাহুল গান্ধীসহ বিরোধী জোটের নেতারা। আবেদনে চলমান এসআইআর স্থগিত, ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের তথ্য প্রকাশ এবং পুরো প্রক্রিয়ার স্বাধীন তদন্তসহ ১০ দফা প্রতিকার চাওয়া হয়েছে।
টাইমস টুডের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সোমবার (১২ অক্টোবর) রাহুল গান্ধী সুপ্রিম কোর্টে পৌঁছানোর আগেই তাঁর আইনজীবী এস প্রসাসনার মাধ্যমে আবেদনটি দাখিল করা হয়। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে রাহুল নিজে উপস্থিত হতে না পারায় তাঁর আইনজীবীরা আবেদন জমা দেন। সুপ্রিম কোর্টের ওয়েবসাইটে মামলাটি ‘রাহুল গান্ধী বনাম নির্বাচন কমিশন অব ইন্ডিয়া’ নামে তালিকাভুক্ত হয়েছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর আগে প্রধান বিচারপতি সূর্য কান্ত মামলাটি বিচারাধীন থাকায় রাহুল গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে অস্বীকৃতি জানান বলে প্রতিবেদনে বলা হয়েছে। এরপর বিরোধী দলগুলোর পক্ষ থেকে যৌথভাবে আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হয়। একই সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিও তুলেছেন বিরোধীরা।
বিরোধী জোটের এই কর্মসূচিতে রাহুল গান্ধীর সঙ্গে কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, সমাজবাদী পার্টির প্রধান অখিলেশ যাদব, তৃণমূল কংগ্রেসের প্রধান মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় এবং রাষ্ট্রীয় জনতা দলের নেতা তেজস্বী যাদবসহ অন্য নেতারা অংশ নেন।
আবেদনে উত্থাপিত ১০ দফা দাবির মধ্যে রয়েছে
প্রথমত, এসআইআর-সংক্রান্ত সব নথি, বৈঠকের কার্যবিবরণী, সিদ্ধান্ত গ্রহণের রেকর্ড, আপত্তির কাগজপত্র এবং সংশ্লিষ্ট ডিজিটাল ব্যবস্থার প্রবেশ ও পরিবর্তনের লগ আদালতে জমা দিতে নির্বাচন কমিশনকে নির্দেশ দেওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। সংবিধানের ১৪, ১৯ ও ২১ অনুচ্ছেদ এবং ৩২৫ অনুচ্ছেদে সুরক্ষিত অধিকার বিবেচনায় এসব নথি তলবের দাবি করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এসআইআর-সংক্রান্ত সিদ্ধান্তগুলোর সাংবিধানিক ও আইনগত বৈধতা যাচাইয়ের আবেদন জানানো হয়েছে। সংবিধানের ৩২৫ অনুচ্ছেদ, ২০২৩ সালের প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্যান্য নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ-সংক্রান্ত আইনের ১৮ ধারা এবং সুপ্রিম কোর্টের প্রাসঙ্গিক নির্দেশনার আলোকে সিদ্ধান্তগুলো পরীক্ষা করার দাবি তোলা হয়েছে। যথাযথ আইনি কর্তৃত্ব ছাড়া কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়ে থাকলে তা বাতিলেরও আবেদন রয়েছে।
তৃতীয়ত, ভোটার তালিকা প্রস্তুত ও সংশোধনের ক্ষেত্রে সাংবিধানিক বা আইনি বিধান লঙ্ঘনের জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়েছে। প্রয়োজনে ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ৩২ ধারা অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও আবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
চতুর্থত, আবেদনকারীদের উত্থাপিত অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কমিশনকে যথাযথ সিদ্ধান্ত নিতে এবং এসআইআর-সংক্রান্ত প্রতিটি সিদ্ধান্ত আইন অনুযায়ী নথিবদ্ধ করার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে।
পঞ্চমত, অনলাইনে ব্যবহৃত ফর্ম-৬ যেন ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন বিধিমালায় নির্ধারিত ফর্মের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ থাকে, তা নিশ্চিত করার দাবি জানানো হয়েছে। যথাযথ নিয়ম অনুসরণ ছাড়া নির্ধারিত ফর্মে পরিবর্তন না আনার নির্দেশও চাওয়া হয়েছে।
ষষ্ঠত, এসআইআর চলাকালে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়া ও সংশোধনের বিষয়গুলো খতিয়ে দেখতে সুপ্রিম কোর্টের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতির নেতৃত্বে স্বাধীন কমিটি গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। ওই কমিটিতে প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ও বিশিষ্ট নাগরিকদের রাখার কথা বলা হয়েছে। ভোটার ডেটাবেসে প্রবেশাধিকার, ইসিনেট ও এরোনেট ব্যবস্থায় পরিবর্তন এবং ইভিএমের প্রযুক্তিগত নকশা ও নীতিমালা পর্যালোচনার দাবিও রয়েছে।
সপ্তমত, এসআইআর প্রক্রিয়ায় ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়া ব্যক্তিদের নাম বুথভিত্তিক প্রকাশের নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। পাশাপাশি নাম বাদ দেওয়ার কারণ এবং বয়স ও লিঙ্গভিত্তিক পরিসংখ্যান প্রকাশের পাশাপাশি যোগ্য ভোটারদের নাম পুনরায় অন্তর্ভুক্তির কার্যকর ব্যবস্থা চালুর দাবি জানানো হয়েছে।
অষ্টমত, আইন অনুযায়ী নোটিশ ও যুক্তিসংগত শুনানির সুযোগ না দিয়ে কোনো ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ না দেওয়ার নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। পাঞ্জাবসহ যেসব রাজ্যে নির্বাচন আসন্ন, সেখানে আইননির্ধারিত শেষ তারিখ পর্যন্ত যোগ্য ব্যক্তিদের ভোটার তালিকায় নাম অন্তর্ভুক্তির সুযোগ দেওয়ার দাবিও রয়েছে।
নবমত, মামলার বিষয়গুলোর নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত বিভিন্ন রাজ্যে চলমান এসআইআর প্রক্রিয়া স্থগিত রাখার অন্তর্বর্তীকালীন নির্দেশ চাওয়া হয়েছে। আবেদনকারীদের দাবি, এতে যোগ্য ভোটারদের অধিকার সুরক্ষা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা সম্ভব হবে।
দশমত, মামলার তথ্য ও পরিস্থিতি বিবেচনায় ভোটাধিকার এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সততা রক্ষায় প্রয়োজনীয় অন্য যেকোনো আদেশ দেওয়ার জন্যও আদালতের কাছে আবেদন জানানো হয়েছে।
এমএ
