Published on
:
2 min read
এই সময়, তমলুক: চারশো বছরের প্রাচীন তমলুকের কেলোমালের সরকার বাড়ির পুজো। দেবীর আরাধনা হলেও ভোগ নিবেদন করা হয় না। নেই কুমারীপুজোর চলও। বংশপরম্পরায় এমনই নিয়ম মেনে পুজো হচ্ছে সরকার বাড়িতে। পুজোর কয়েকটা দিন বাড়িতে হাজির হন পরিবারের সদস্যরাও। হুল্লোড় করেই কেটে যায় পুজো। আশেপাশের এলাকা থেকেও সরকার বাড়ির পুজো দেখতে আসেন সকলে। পরিবারের সদস্য পার্থসারথি সরকার জানিয়েছেন, প্রায় ৪০০ বছর আগে তাঁদের পূর্বপুরুষ রামধনু সরকার এই পুজোর সূচনা করেছিলেন। সেই থেকে নিষ্ঠার সঙ্গে এই নিয়ম মেনে পুজো হয়। মহালয়ার পরের দিন থেকেই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি ও আচার-অনুষ্ঠান। প্রতিপদ থেকে ষষ্ঠী পর্যন্ত চলে বিভিন্ন পর্বের পুজো ও অধিবাস। বেলতলায় পুজোর পরে সপ্তমীতে কলাবউকে স্নান করিয়ে শুরু হয় মূল কাঠামোয় দেবীর আরাধনা।
এই পুজোর অন্যতম বিশেষ রীতি হলো যজ্ঞের হোমের আগুন। সপ্তমীতে জাগ প্রদীপ জ্বালানোর পাশাপাশি শুরু হয় হোম। সপ্তমী থেকে নবমী পর্যন্ত একটানা চলে সেই যজ্ঞ। নবমীর দিন মহাযজ্ঞের পূর্ণাহুতির পরেই হোমকুণ্ডের আগুন নেভে। নৈবেদ্য নিবেদনের ক্ষেত্রেও রয়েছে নির্দিষ্ট রীতি। পরিবারের সদস্যের দাবি, অষ্টমীতে ২৮ কেজি, সন্ধিপুজোয় ৩২ কেজি, নবমীতে ৩১ কেজি এবং আর এক পর্বে ২৬ কেজি চালের নৈবেদ্য অর্পণ করা হয়। তবে এই পুজোর ইতিহাসে বড় পরিবর্তন এসেছিল বলিপ্রথা বন্ধের সিদ্ধান্তে। পার্থসারথি বলেন, ‘১৯৪২ বা ১৯৪৩–এ তাঁর ঠাকুর্দা বিষ্ণুপদ সরকার বলিদান বন্ধ করে দেন। আগে পুজোয় মহিষ ও ছাগ বলি দেওয়া হতো। কিন্তু সেই প্রথা বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নেওয়ায় পুরোহিত ক্ষতির আশঙ্কা প্রকাশ করেছিলেন। তাতেও সিদ্ধান্ত থেকে সরে আসেননি বিষ্ণুপদ। বংশধরদের উদ্দেশে তাঁর নির্দেশ ছিল, বলিপ্রথার মাংস যেন তাঁরা কখনও গ্রহণ না করেন। পরবর্তী প্রজন্মও সেই নির্দেশ মেনে চলেছে।’ পরিবারের সদস্যদের দাবি, বলিপ্রথা বন্ধ করার পর থেকে পুজোর রীতিতে আর কোনও নতুন সংযোজন করা হয়নি। সরকার বাড়ির পুজোয় আরও একটি বিশেষ নিয়ম রয়েছে। মহালয়ার পরের দিন থেকে বাড়িতে মাংস ও ডিম প্রবেশ করে না। মাছ খাওয়ার চল থাকলেও অষ্টমীতে নিরামিষ আহার করেন পরিবারের সদস্যেরা। নবমীতে গোটা পাড়ার পাশাপাশি গ্রামের মানুষকেও অন্নভোগ খাওয়ানো হয়। তবে তা ভোগ হিসেবে নিবেদন করা হয় না।
কর্মসূত্রে কলকাতায় বা রাজ্যের বাইরে এবং বিদেশে থাকা পরিবারের সদস্যেরাও এই সময়ে বাড়িতে ফিরে আসেন। সপ্তমী থেকে দশমী পর্যন্ত একসঙ্গে কাটানো, পুজোর আচার পালন এবং বিসর্জনের পরে আবার কর্মস্থলে ফিরে যাওয়া—এই নিয়মেই বাঁধা তাঁদের শারদোৎসব। পার্থসারথির কথায়, ‘পুজোর সময়ে পরিবারের সবাই একসঙ্গে হওয়ার আনন্দ আরও বেড়ে যায়।’ তিনিই জানিয়েছেন, সাংসদ মালা রায়ের বাপের বাড়ি এই সরকার বাড়ি। প্রতি বছর সপ্তমীতে বাবার বাড়ির পুজোয় যোগ দিতে আসেন তিনি। পুরনো রীতির ধারাবাহিকতা, পূর্বপুরুষের নির্দেশের প্রতি আনুগত্য এবং পরিবারের মিলনোৎসব—এই তিনের মেলবন্ধনেই আজও স্বতন্ত্র এই পুজো।
