আজকাল ওয়েবডেস্ক: নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে রুদ্ধশ্বাস জয় ছিনিয়ে নিল ভারত। পাঁচ ম্যাচের সিরিজের প্রথম ম্যাচে কিউয়িদের করা ২২৫ রান তাড়া করতে নেমে শেষ ওভারে জয়ের জন্য ভারতের প্রয়োজন ছিল ৮ রান। চাপের মুখে ঠান্ডা মাথায় ব্যাট করে নমন ধীর ও নীতীশ কুমার রেড্ডি দলকে জয় এনে দেন। এই জয়ের ফলে পাঁচ ম্যাচের টি-টোয়েন্টি সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে গেল ভারত। বিদেশের মাটিতে খেলতে এসে ২২৫ রান তাড়া করতে নেমে জেতা একপ্রকার দাদাগিরিই বলা চলে।
টস জিতে প্রথমে বল করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল ভারত। প্রথমে ব্যাট করতে নেমে নির্ধারিত ২০ ওভারে ৪ উইকেট হারিয়ে ২২৫ রান তোলে নিউজিল্যান্ড। জবাবে ভারতীয় ব্যাটারদের আগ্রাসী মেজাজে ম্যাচের শুরু থেকেই চাপে পড়ে যায় কিউয়ি বোলিং বিভাগ। শেষ পর্যন্ত দুই বল বাকি থাকতে ম্যাচ জিতে নেয় ভারত।
বড় রান তাড়া করতে নেমে শুরু থেকেই ঝোড়ো ব্যাটিং করেন ভারতের দুই ওপেনার সঞ্জু স্যামসন ও অভিষেক শর্মা। পাওয়ার প্লেতেই চার-ছক্কার বন্যা বইয়ে দিয়ে নিউজিল্যান্ডের বোলারদের চাপে ফেলে দেন তাঁরা। বিশেষ করে সঞ্জু স্যামসন ছিলেন দুরন্ত ছন্দে। মাত্র ৩৩ বলে ৬৭ রান করেন তিনি। তাঁর ইনিংসে ছিল ৮টি চার ও ৪টি ছক্কা।
অন্যদিকে, অভিষেক শর্মাও দ্রুত রান তুলতে থাকেন। তবে মাইকেল ব্রেসওয়েলের বলে ক্যাচ দিয়ে ২৯ রানে ফিরে যান তিনি। তখন ভারতের রান ৯৩। এরপর সঞ্জু স্যামসনকে বোল্ড করে ফিরিয়ে দেন মিচেল স্যান্টনার। সঞ্জুর বিদায়ের সময় ভারতের স্কোর ছিল ২ উইকেটে ১১৫ রান।
এরপর তিলক ভার্মা ও ঈশান কিষাণ বড় ইনিংস খেলতে ব্যর্থ হন। তিলক করেন মাত্র ৬ রান, আর ঈশান ফেরেন ১ রান করে। পরপর উইকেট হারিয়ে কিছুটা চাপে পড়ে যায় ভারত।
চাপের মুখে দলের হাল ধরেন শ্রেয়স আইয়ার ও অক্ষর প্যাটেল। দু’জনে মিলে ৪৫ রানের গুরুত্বপূর্ণ জুটি গড়ে ভারতকে লড়াইয়ে ফিরিয়ে আনেন। অক্ষর আক্রমণাত্মক ব্যাটিং করে ২৪ রান করেন। তবে লকি ফার্গুসনের বলে আউট হয়ে তাঁকে সাজঘরে ফিরতে হয়।
এরপর ক্রিজে এসে শ্রেয়সের সঙ্গে যোগ দেন নমন ধীর। শুরু থেকেই আগ্রাসী ব্যাটিং করেন নমন। মিচেল স্যান্টনারের ওভারে চার ও ছক্কা হাঁকিয়ে ম্যাচের মোড় ঘুরিয়ে দেন তিনি। অন্যদিকে, শ্রেয়সও ভারতের জয়ের আশা জিইয়ে রাখেন।
একসময় মনে হচ্ছিল, শ্রেয়স আইয়ারই ভারতকে জিতিয়ে মাঠ ছাড়বেন। কিন্তু ৪২ রানে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ইনিংসের সমাপ্তি ঘটে। ফলে শেষ মুহূর্তে ফের চাপে পড়ে ভারতীয় শিবির।
শ্রেয়সের বিদায়ের পর জয়ের দায়িত্ব নিজেদের কাঁধে তুলে নেন নমন ধীর ও নীতীশ কুমার রেড্ডি। শেষ দিকে নাথান স্মিথের ওভারেও গুরুত্বপূর্ণ বাউন্ডারি হাঁকিয়ে ভারতকে লক্ষ্যের আরও কাছে নিয়ে যান নমন। নিউজিল্যান্ডের ফিল্ডিংয়ের কিছু ভুল ও ক্যাচ মিসও ভারতের রান তোলার ক্ষেত্রে সাহায্য করে।
শেষ ওভারে জয়ের জন্য যখন ভারতের প্রয়োজন ছিল ৮ রান, তখনও চাপের মুখে বিচলিত হননি নমন ও নীতীশ। ঠান্ডা মাথায় ব্যাট করে প্রয়োজনীয় রান তুলে নেন তাঁরা। ফলে দুই বল বাকি থাকতেই জয় নিশ্চিত করে ভারত।
২২৫ রানের বিশাল লক্ষ্য তাড়া করে ভারতের এই জয় নিঃসন্দেহে দলের আত্মবিশ্বাস বাড়াবে। একদিকে সঞ্জু স্যামসনের বিধ্বংসী ব্যাটিং, অন্যদিকে শ্রেয়স আইয়ার ও অক্ষর প্যাটেলের গুরুত্বপূর্ণ অবদান এবং শেষ দিকে নমন ধীর ও নীতীশ রেড্ডির দায়িত্বশীল ব্যাটিং,সব মিলিয়ে দুর্দান্ত লড়াই উপহার দিল ভারতীয় দল।
এর আগে ঘরের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে টি-টোয়েন্টি সিরিজ ২-২ ব্যবধানে শেষ হয়েছিল। বেঙ্গালুরুর শেষ ম্যাচ বৃষ্টির জন্য আর হয়নি। সেই হতাশা কাটিয়ে নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম ম্যাচেই জয় তুলে নিয়ে ঘুরে দাঁড়াল ভারত। পাঁচ ম্যাচের সিরিজে ১-০ ব্যবধানে এগিয়ে যাওয়ায় পরের ম্যাচগুলিতে বাড়তি আত্মবিশ্বাস নিয়ে মাঠে নামতে পারবেন ভারতীয় ক্রিকেটাররা।
কিউয়ি ইনিংসের মূল কারিগর ছিলেন গ্লেন ফিলিপস। মাত্র ৪০ বলে ৮২ রানে অপরাজিত থাকেন তিনি। নিউজিল্যান্ডের বিরুদ্ধে প্রথম টি-টোয়েন্টি ম্যাচে ভারতীয় দলে ছিল জোড়া পরিবর্তন। শিবম দুবে ও প্রিন্স যাদবের পরিবর্তে দলে ফেরেন নীতিশ কুমার রেড্ডি এবং মায়াঙ্ক যাদব। চার বছর পর ভারতীয় দলে প্রত্যাবর্তন ঘটে ভুবনেশ্বর কুমারের। তবে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিরুদ্ধে শেষ টি-টোয়েন্টি ম্যাচ বৃষ্টিতে ভেস্তে যাওয়ায় বল হাতে নামার সুযোগ হয়নি তাঁর। বৃহস্পতিবার ক্রাইস্টচার্চে প্রত্যাবর্তনের শুরুটা ভাল হলেও পরে কঠিন পরীক্ষার মুখে পড়তে হয় অভিজ্ঞ পেসারকে।
টসে জিতে প্রথমে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেন শ্রেয়স আইয়ার। ভারতীয় বোলিংয়ের সূচনা করেন ভুবনেশ্বর কুমার। প্রথম ওভারে মাত্র ৪ রান দিয়ে আশার আলো দেখালেও দ্বিতীয় ওভারেই ১৭ রান খরচ করেন তিনি। সেই ওভার থেকেই আক্রমণাত্মক মেজাজে ধরা দেন কিউয়ি ব্যাটাররা। তৃতীয় ও চতুর্থ ওভারেও রান ওঠে দ্রুত। পাওয়ার প্লে শেষ হওয়ার সময় এক উইকেট হারিয়ে নিউজিল্যান্ডের সংগ্রহ দাঁড়ায় ৬৫ রান।
আইপিএলে কলকাতা নাইট রাইডার্সের হয়ে দুরন্ত শতরান করা ফিন অ্যালেন এদিনও শুরু থেকেই আগ্রাসী ব্যাটিং করেন। ওপেনিং জুটিতে অ্যালেন ও টিম সেইফার্ট ভারতীয় বোলারদের উপর চাপ তৈরি করেন। ভুবনেশ্বর ও অর্শদীপ সিংকে আক্রমণ করে দ্রুত রান তোলেন তাঁরা। শেষ পর্যন্ত শ্রেয়স পরিকল্পনায় পরিবর্তন এনে বিপজ্জনক জুটি ভাঙতে সক্ষম হয় ভারত। ৪৯ রানে প্রথম উইকেট হারায় নিউজিল্যান্ড। ১৭ বলে ২৪ রান করে মায়াঙ্ক যাদবের বলে উইকেটের পিছনে সঞ্জু স্যামসনের হাতে ধরা পড়েন সেইফার্ট।
এরপরও অবশ্য রানের গতি কমেনি। ফিন অ্যালেনকে বেশ ভয়ঙ্কর দেখাচ্ছিল। কিন্তু ২৪ বলে ৪৫ রান করে সাজঘরে ফেরেন তিনি। মিচেলও শুরুটা ভাল করেছিলেন। তবে ২৮ রানে তাঁর ইনিংস শেষ হয়। এর আগে মায়াঙ্ক যাদবের বলে মিচেলের ক্যাচ ফেলার সুযোগ হাতছাড়া করেন অভিষেক শর্মা। সেই ভুলের খেসারতও দিতে হয়েছে ভারতকে।
মাঝের ওভারগুলিতে নিউজিল্যান্ডের ইনিংসকে আরও শক্তিশালী করে তোলেন গ্লেন ফিলিপস। মাত্র ২৭ বলে অর্ধশতরান পূর্ণ করেন তিনি। ভারতীয় বোলারদের বিরুদ্ধে কার্যত পাল্টা আক্রমণ চালিয়ে যান এই কিউয়ি ব্যাটার। এক উইকেট পেলেও এদিন রান আটকাতে ব্যর্থ হন অক্ষর প্যাটেল। বাকি বোলাররাও নিয়মিত রান দিয়েছেন। ফলে বড় স্কোরের দিকে এগিয়ে যেতে কোনও অসুবিধা হয়নি নিউজিল্যান্ডের।
চতুর্থ উইকেটে গ্লেন ফিলিপস ও বেভন জ্যাকবসের জুটি যোগ করে ৭৩ রান। ৩১ রান করে আউট হন বেভন। অন্যদিকে, শেষ পর্যন্ত ক্রিজে থেকে ভারতীয় বোলিংকে চাপে রাখেন ফিলিপস। ৪০ বলে ৮২ রানের অপরাজিত ইনিংসে তিনি মারেন ৮টি চার ও ৩টি ছয়। তাঁর বিধ্বংসী ব্যাটিংয়ের সৌজন্যে নির্ধারিত ২০ ওভারে ২২৫ রানের বিশাল পুঁজি গড়ে নিউজিল্যান্ড। কিন্তু সেই রানও ভারতীয় ব্যাটাররা দাদাগিরি দেখিয়ে জিতে নেয়।
