ঢাকা, ১২ অক্টোবর – মধ্যপ্রাচ্যের উত্তপ্ত আকাশে হঠাৎই যেন নেমে এলো ভয়াবহ এক দুর্যোগ। সৌদি আরবের রাজধানী রিয়াদের অত্যন্ত ব্যস্ত ও স্পর্শকাতর ‘কিং খালেদ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর’-এ আকস্মিক ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় কেঁপে উঠেছে পুরো অঞ্চল। গত শনিবার দিবাগত রাত আনুমানিক ৩টা ১৫ মিনিটে বিমানবন্দরের টার্মিনাল-৩-এর ওপর সরাসরি একটি ক্ষেপণাস্ত্র আছড়ে পড়ে। বিকট বিস্ফোরণ আর ধোঁয়ার কুণ্ডলীতে মুহূর্তের মধ্যেই লণ্ডভণ্ড হয়ে যায় স্পর্শকাতর এই বেসামরিক স্থাপনাটি।
সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, এই হামলায় বিভিন্ন দেশের মোট ১২ জন নিহত এবং ৩০৯ জন আহত হয়েছেন। তবে সবচেয়ে বেদনার ও উদ্বেগের বিষয় হলো—পরবাসের এই ভয়াবহ ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন ২ জন বাংলাদেশি এবং গুরুতর আহত হয়েছেন অন্তত ২৪ জন। রোববার (১১ অক্টোবর) রাতে রিয়াদে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাস সংবাদমাধ্যমকে এই তথ্য নিশ্চিত করেছে।
ভয়াবহ সেই মুহূর্ত ও আহতদের বর্তমান পরিস্থিতি
দূতাবাস জানায়, আহত ২৪ জনের মধ্যে ১১ জন প্রবাসী শ্রমিক এবং ১৩ জন পবিত্র ওমরাহ পালনের উদ্দেশ্যে যাওয়া পুণ্যার্থী। রিয়াদ থেকে জেদ্দায় যাওয়ার উদ্দেশ্যে তারা সবাই টার্মিনালে ট্রানজিটে অপেক্ষা করছিলেন। কিন্তু আকস্মিক এই হামলায় নিমিষেই তাদের ভ্রমণ রূপ নেয় রক্তক্ষয়ী ট্র্যাজেডিতে।
বর্তমানে রিয়াদের বিভিন্ন হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছেন আহত প্রবাসীরা:
- আইসিইউতে প্রবাসীরা: কিং আব্দুল্লাহ হাসপাতালের নিবিড় পরিচর্যা কেন্দ্রে (আইসিইউ) চিকিৎসাধীন ঢাকার হাফেজ হাসান, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কাজী নুরুল্লাহ এবং প্রবাসী কর্মী মো. ওমর ফারুক। বাংলাদেশ দূতাবাসের প্রতিনিধি দল তাদের দেখে এসেছে এবং বর্তমানে তাদের অবস্থা স্থিতিশীল।
- আশঙ্কাজনক অবস্থায় তরুণ: নওগাঁর সাফকাত রহমান রিয়াদের ন্যাশনাল গার্ড হাসপাতালে মারাত্মক আশঙ্কাজনক ও অচেতন অবস্থায় ভর্তি আছেন। একই হাসপাতালে রয়েছেন কুমিল্লার মো. দাউদুল ইসলাম।
- অন্যান্য হাসপাতালে চিকিৎসাধীন: রিয়াদ মেডিক্যাল হাসপাতালে ঢাকার সাইমুল ইসলাম সৌরভ ও আবুল মনসুর মো. রিয়াজ উদ্দীন; প্রিন্স মোহাম্মদ বিন আব্দুল আজিজ হাসপাতালে সালমা আক্তার, শাহাদাত হোসেন, মোশাহিদ আহমেদ সৈকত, জাহিদ আহমেদ ও শাহজাহান সরকার। এছাড়া প্রিন্স সুলতান মিলিটারি হাসপাতাল, সুলাইমান আলহাবিব, কিংডম হাসপাতাল, কিং খালেদ মেডিক্যাল সিটি, এজতাহ সনদ ও সুলাইমান ফকিহ হাসপাতালেও অনেক আহত প্রবাসীদের চিকিৎসা চলছে।
আটকে পড়া ৫০০ প্রবাসীর পাশে বাংলাদেশ দূতাবাস
হামলার পর বিমানবন্দরজুড়ে ফ্লাইট চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশ থেকে আসা এবং বিভিন্ন গন্তব্যে যাওয়ার অপেক্ষায় থাকা প্রায় ৫০০ বাংলাদেশি যাত্রী মারাত্মক অনিশ্চয়তায় পড়েন।
এমন পরিস্থিতিতে রিয়াদে নিযুক্ত বাংলাদেশ দূতাবাস দ্রুত মানবিক সহায়তায় এগিয়ে এসেছে:
- আটকে পড়া ১০০ যাত্রী: মেরিয়ট হোটেল, রেডিসন হোটেল ও প্রিন্সেস নূরা বিশ্ববিদ্যালয়ের ডরমিটরিতে থাকা ও খাবারের ব্যবস্থা।
- ৬৭ জন ওমরাহ যাত্রী: ইহরাম পরা অবস্থায় আটকে থাকা পুণ্যার্থীদের বিশেষ বাসে রিয়াদ থেকে সরাসরি জেদ্দায় পাঠানোর ব্যবস্থা।
- ঢাকাগামী ৪০০ যাত্রী: বাতিল হওয়া সৌদিয়া এয়ারলাইনসের (SV-804) যাত্রীদের বিকল্প হিসেবে দাম্মামের কিং ফাহাদ বিমানবন্দর থেকে দেশে পাঠানোর প্রক্রিয়া।
- অন্যান্য গন্তব্যের যাত্রী: বাহরাইনগামী দুই কর্মীকে আলখোবার স্থলবন্দর দিয়ে পৌঁছাতে দূতাবাসের সরাসরি সহায়তা।
আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা ও প্রবাসীদের জীবনঝুঁকি
একটি আন্তর্জাতিক যাত্রীবাহী বিমানবন্দরে এভাবে সরাসরি ক্ষেপণাস্ত্র হামলা আন্তর্জাতিক আকাশপথের নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে বড় ধরনের প্রশ্নচিহ্নের মুখে ফেলে দিয়েছে। সাধারণ যাত্রী কিংবা ধর্মপ্রাণ ওমরাহ যাত্রীরা কোন রাজনৈতিক বা সামরিক দ্বন্দ্বে জড়িত নন; অথচ পরবাসে গিয়ে তাদের এমন ভয়াবহ হামলার মুখোমুখি হওয়া চরম উদ্বেগজনক।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক সচলতার অন্যতম মূল চালিকাশক্তি হলেন এই মধ্যপ্রাচ্যের প্রবাসীরা। পরবাসে রক্ত ঘাম ঝরিয়ে দেশের চাকা সচল রাখা এই মানুষেরা আজ জীবনের ঝুঁকিতে। আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের উচিত আন্তর্জাতিক বেসামরিক বিমান চলাচলের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে দ্রুত কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া। অন্যদিকে, দুর্যোগ মুহূর্তে কূটনৈতিক তৎপরতার পাশাপাশি প্রবাসীদের নিরাপত্তায় রিয়াদ বাংলাদেশ দূতাবাসের এই ঝটপট প্রতিক্রিয়া নিঃসন্দেহে প্রশংসার দাবি রাখে।
জরুরি আহ্বান: আকস্মিক এই হামলায় ক্ষতিগ্রস্ত প্রবাসীদের পরিবারকে সার্বিক সহযোগিতা এবং আহতদের সর্বোচ্চ চিকিৎসা নিশ্চিত করতে নজরদারি জোরদার রাখা হয়েছে।
এনএন/ ১২ অক্টোবর ২০২৬
সম্পুর্ন খবরটি পড়ার জন্য এই লিঙ্কে ক্লিক করুন ::সৌদিতে রক্তক্ষয়ী ক্ষেপণাস্ত্র হামলা: ঝরল ২ বাংলাদেশির প্রাণ, আহত ২৪! স্তব্ধ শত শত যাত্রী first appeared on DesheBideshe.