কলেজে পড়ুয়ার সংখ্যা হাতে গোনা, অথচ শিক্ষকের অভাব নেই। কোথাও ছবিটা ঠিক উল্টো।
স্কুলের মতো রাজ্যের অনেক কলেজেও পড়ুয়া-শিক্ষক অনুপাতের সামঞ্জস্য নেই। সরকারি ও সরকারপোষিত কলেজগুলির হাল ফেরাতে এ ক্ষেত্রে সামঞ্জস্য বিধান আশু প্রয়োজন। এমনই মনে করছে ১৪ সদস্যের বিশেষ কমিটি।
সূত্রের খবর, গত ১৪ অক্টোবর উচ্চশিক্ষা দফতরে রিপোর্ট পেশ করেছে ‘স্টেট লেভেল অ্যাডভাইসারি অ্যান্ড মনিটরিং কমিটি ফর এনআইআরএফ’। এই বিশেষ কমিটিতে মেন্টর রয়েছেন ১১ জন। বিকাশ ভবন সূত্রের খবর, সার্বিক ভাবে ওই রিপোর্টে গোটা রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এই ১০০টি কলেজের চিত্র তুলে ধরা হয়েছে।
সূত্রের খবর, ২০২৪ সালে সর্বভারতীয় ক্রম তালিকায় (এনআইআরএফ) রাজ্যের ৩৭২টি কলেজের মধ্যে মাত্র ৮টি কলেজ প্রথম ১০০-য় ঠাঁই পেয়েছিল। পরের বছর সেই সংখ্যা নেমে আসে ৬-এ। নতুন সরকার চাইছে ২০২৭ সালের তালিকায় রাজ্যের আরও বেশি কলেজের নাম থাক। এই লক্ষ্যে ‘মিশন-২০’ স্থির করেছে সরকার। তাই গঠন করা হয় এই বিশেষ কমিটি। গত ৩১ জুলাই এই বিষয়ে বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করে বিকাশ ভবন।
এর পরই প্রথম সারিতে থাকা প্রায় ১০০টি কলেজেকে বেছে নেন ওই কমিটির সদস্যেরা। সেই অনুযায়ী নথি খতিয়ে দেখার কাজ করা হয়। শুরু হয় সরাসরি পরিদর্শন। গত ৫ অক্টোবর তা শেষ হয়। দুর্গাপুজোর মধ্যেই রিপোর্ট পেশ করা হয় উচ্চশিক্ষা দফতরে।
সূত্রের খবর, উত্তরবঙ্গ থেকে দক্ষিণবঙ্গের ১১০টি কলেজে পরিদর্শনের দায়িত্ব ওই ১১ জন মেন্টরদের মধ্যে ভাগ করে দেওয়া হয়েছিল। তাঁরা দেখেন কোথাও ১০ কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি কলেজ রয়েছে। ফলে তুলনামূলক পুরনো কলেজে ছাত্রছাত্রীরা বেশি ভর্তি হয়েছেন। বাকিগুলির অধিকাংশ আসন ফাঁকা পড়ে থাকছে। অথচ ওই সব কলেজে রয়েছে উন্নত পরিকাঠামো। বিজ্ঞান থেকে কলা বিভাগের সব বিষয়েই পর্যাপ্ত শিক্ষক রয়েছেন। কিন্তু পড়ুয়া নেই। তাঁদের পর্যবেক্ষণ কোনও রকম সমীক্ষা না করেই একের পর এক কলেজ তৈরি করা হয়েছে। ১০ কিলোমিটারের মধ্যে তিনটি কলেজের বদলে একটি কলেজকেই উন্নতমানের গড়ে তুললে এই পরিস্থিতি হত না।
ওই কমিটির এক সদস্যের কথায়, দেখা গিয়েছে ২০১৪ সালে প্রয়োজনের থেকে অতিরিক্ত আসনসংখ্যা বৃদ্ধি করা হয়েছিল। আসনসংখ্যা বৃদ্ধি করার আগে কত জন পরীক্ষার্থী উচ্চমাধ্যমিক পাশ করছেন, আশপাশে কতগুলি একই বিষয়ের কলেজ রয়েছে, সেগুলি বিচার করা প্রয়োজন ছিল। ধরা যাক, কোনও কলেজের একটি বিষয়ে ১০০ জন ছাত্রছাত্রী ভর্তি হতে পারবেন। পাশের একটি কলেজে একই বিষয়ে ১০০টি আসন রয়েছে। দু’টি কলেজে ৫০ জন করে ভর্তি হলেন। সে ক্ষেত্রে সর্বভারতীয় ক্রম তালিকায় দু’টি কলেজের ক্ষেত্রেই অর্ধেক আসন শূন্য হিসেবে ফুটে উঠছে। সেখানেই নম্বর কমছে রাজ্যের।
এই একই সংখ্যার ছাত্রছাত্রী যদি একটি কলেজে পড়তেন সেখানে মোট শূন্য আসনের সব ক’টিতেই ভর্তি হয়েছে দেখানো যেত। সে ক্ষেত্রে ‘ফুলমার্কস’ পেত ওই কলেজ। তথ্য বিচার করে আগেই এই পরিস্থিতি বুঝতে পেরেছিলেন তাঁরা। এ বার সরাসরি পরিদর্শন করে হাতে নাতে ওই চিত্র ফুটে উঠল। আবার অনেক কলেজে শিক্ষকের সংখ্যাও কম রয়েছে। সার্বিক ভাবে কোনও সামঞ্জস্য নেই।
দেখা গিয়েছে ১০০টির মধ্যে ৫০টি বেশ খারাপ অবস্থায় রয়েছে। ছাত্রসংখ্যা, প্লেসমেন্ট, শিক্ষকদের গবেষণা-সহ বিভিন্ন দিক খতিয়ে দেখা হয়। ২০টি কলেজের অবস্থা বেশ দুর্বল। তার মধ্যে মাত্র ১০টি কলেজ বেশ ভাল অবস্থানে রয়েছে।
ওই কমিটির এক সদস্যের কথায়, ‘‘আমরা কখনওই বলতে পারি না যে কলেজ বন্ধ করে দেওয়া প্রয়োজন। কিন্তু এ ভাবে চললে সর্বভারতীয় ক্ষেত্রে রাজ্যের উচ্চশিক্ষা সম্পর্কে খারাপ বার্তা যাবে এবং ছাত্রছাত্রীদেরও কোনও লাভ হবে না। পরিকাঠামো যথেষ্ট ভাল রয়েছে, কিন্তু সেগুলিকে ব্যবহার করার জন্য পড়ুয়া নেই। এই চিত্র ভাবা যায় না।’’
বিকাশ ভবন সূত্রের খবর, সরকারপোষিত স্কুলের ক্ষেত্রেও দেখা গিয়েছে এই চিত্র। যে কারণে উদ্বৃত্ত শিক্ষকদের বদলি চালু করতে চেয়েছিল সরকার। কিন্তু ওই বদলির পদ্ধতি বা এসওপি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, আদালতের নির্দেশে ওই এসওপি বাতিল করতে হয়েছে। এ বারে কলেজেও এই বদলির প্রস্তাব দেওয়া হল।
