কক্সবাজার সমুদ্রসৈকতে গোসলে নেমে প্রাণ হারানোর ঘটনা নিয়মিত ঘটছে। গত ১২ বছরের পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, সমুদ্রে ডুবে ৮৫ জন পর্যটকের মৃত্যু হয়েছে। একই সময়ে সাগরে ভেসে যাওয়ার সময় ১ হাজার ২০০ পর্যটককে জীবিত উদ্ধার করেছেন লাইফগার্ড ও স্বেচ্ছাসেবকরা। পর্যটকদের অসতর্কতা এবং অরক্ষিত সৈকত এলাকা এসব দুর্ঘটনার অন্যতম বড় কারণ হিসেবে চিহ্নিত হয়েছে। কেউ টিউবে ভেসে ঢেউয়ের সঙ্গে খেলছিলেন, কেউ আবার জেটস্কিতে চড়ে গভীর সাগরের দিকে যাচ্ছিলেন। শুক্রবার সাগরে ভেসে যাওয়ার সময় অন্তত ৩০ জনকে উদ্ধার করা হয়েছে। ঢেউয়ের ধাক্কায় টিউব থেকে ছিটকে পড়তে দেখা যায় অনেককে। ওই দিন এসব পয়েন্টে হতাহতের ঘটনা ঘটেনি। সবাই গোসলে নামার জন্য হুমড়ি খেয়ে পড়ে। জোয়ার-ভাটার সময় ও আবহাওয়া না জেনেই অনেকে সমুদ্রে নেমে যান। এমন অবস্থায় কেউ স্রোতের টানে ভেসে গেলে তাঁদের বাঁচানো কঠিন হয়ে পড়ে।
সৈকতে ঝুঁকি এড়াতে এবং পর্যটকদের সচেতন করতে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে ১০টি নির্দিষ্ট নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে সাঁতার না জানলে লাইফ জ্যাকেট ব্যবহার করা, লাল নিশানা থাকা এলাকায় না নামা, বিকেল ৫টার পর সমুদ্রে না যাওয়া এবং জোয়ার-ভাটার সময় সম্পর্কে ধারণা রাখা। এছাড়া একা শিশুকে পানিতে না নামানো, অসুস্থ শরীর নিয়ে গভীরে না যাওয়া এবং লাইফগার্ডের পরামর্শ মেনে চলার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে। এসব প্রচারণায় লিফলেট, বিলবোর্ড ও ডিজিটাল মাধ্যমের সহায়তা নেওয়া হচ্ছে। সাঁতার না জানা পর্যটকেরাও লাইফ জ্যাকেট ছাড়া পানিতে নামেন; যার কারণে দুর্ঘটনার মুখে পড়তে হচ্ছে তাঁদের। তাঁরা জানাচ্ছিলেন, লাল নিশানা চিহ্নিত এলাকায় পানির নিচে গুপ্তখাল রয়েছে। তাঁদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।
সর্বশেষ ২১ অক্টোবর বিকেলে হিমছড়ি সৈকতের ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় গোসলে নেমে পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে।
চলতি বছরের আগস্ট ও সেপ্টেম্বর মাসেও আরও পাঁচজন পর্যটক একই ধরনের দুর্ঘটনায় প্রাণ হারিয়েছেন। সি-সেফ লাইফগার্ডের প্রকল্প ব্যবস্থাপক ইমতিয়াজ আহমেদের মতে, সাম্প্রতিক ভারী বর্ষণ ও পাহাড় থেকে নেমে আসা ঢলের কারণে সৈকতের কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত পাঁচ কিলোমিটার এলাকায় ১২ থেকে ১৫টি গুপ্তখাল ও বড় গর্তের সৃষ্টি হয়েছে। জোয়ারের সময় পানি বেড়ে এগুলো ঢেকে যাওয়ায় পর্যটকরা বিপদে পড়ছেন। সেখানে আটকা পড়লে বিপদের আশঙ্কা থাকে। প্রাণহানি ঘটলে তখন হুঁশ হয়, ততক্ষণে করার কিছু থাকে না। কিন্তু সৈকতের বিভিন্ন স্থানে গুপ্তখাল ও গর্ত থাকায় গোসল করতে গিয়ে ঝুঁকিতে পড়ছেন পর্যটকেরা। ফলে পর্যটকেরা এগুলোর অবস্থান বুঝতে পারেন না।
সৈকতের নিরাপত্তা পরিস্থিতি নিয়ে হতাশা প্রকাশ করে কক্সবাজার সিভিল সোসাইটিজ ফোরামের সভাপতি ফজলুল কাদের চৌধুরী বলেন, পর্যটন ব্যবসায়ীরা কেবল মুনাফা অর্জনে ব্যস্ত থাকলেও পর্যটকদের নিরাপত্তার বিষয়ে উদাসীন। সৈকতের ২০০ থেকে ৫০০ মিটার এলাকা জাল দিয়ে ঘিরে ‘সুইমিং জোন’ তৈরির দীর্ঘদিনের দাবি পূরণ হয়নি এবং চার দশকেও এখানে কোনো পেশাদার ডুবুরি নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হয়নি। দীর্ঘ চার যুগেও একজন ডুবুরি নিয়োগ দেওয়া যাচ্ছে না।
গত শুক্রবার সুগন্ধা পয়েন্টে পর্যটকদের উপচে পড়া ভিড় ছিল। দুপুরে ৫০ হাজার এবং বিকেলে ৯০ হাজার পর্যটকের সমাগম দেখা যায়। অনেক পর্যটকই কোনো ধরনের নিরাপত্তা সরঞ্জাম ছাড়াই গভীর সাগরে নামছিলেন। যদিও বালুচরে একাধিক লাল নিশানা উড়িয়ে রাখা হয়েছিল এবং লাইফগার্ডরা বাঁশি বাজিয়ে সতর্ক করছিলেন, তবুও পর্যটকদের সিংহভাগই তা উপেক্ষা করেছেন। শুক্রবার সন্ধ্যা পর্যন্ত কলাতলী থেকে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত বিস্তৃত পাঁচ কিলোমিটার সৈকতে অন্তত দেড় লাখ পর্যটক পানিতে নেমেছিলেন। বিকেলে এ সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় ৯০ হাজারে। সুগন্ধার দক্ষিণে কলাতলী এবং উত্তরে লাবণী পয়েন্ট পর্যন্ত আরও চার কিলোমিটার এলাকায় জড়ো হয়েছিলেন ৫০ থেকে ৬০ হাজার পর্যটক। সৈকতের বালুচরে স্থাপিত তিনটি ওয়াচ টাওয়ারে বসে হলুদ টি-শার্ট পরা সাতজন লাইফগার্ড পানিতে নামা পর্যটকদের নজরে রাখছিলেন। ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, ‘এক কিলোমিটার সৈকতে যখন ৬০-৭০ হাজার মানুষ নামে, তখন লাল নিশানা বা পতাকার দিকে কারও নজর যায় না। এর আগের কয়েক দিনে নেমেছেন আরও অন্তত ছয় লাখ পর্যটক।
লাইফগার্ড ও বিচের কর্মীদের দেওয়া তথ্যমতে, নির্দেশনা না মানার কারণে প্রতিদিন গড়ে ২০ থেকে ২৫ জন পর্যটক দুর্ঘটনার কবলে পড়েন। পর্যটকদের উদ্ধারে কেবল শহরের পাঁচ কিলোমিটার অংশে সি-সেফের ২৭ জন কর্মী নিয়োজিত রয়েছেন। কিন্তু ইনানী, হিমছড়ি, দরিয়ানগর ও টেকনাফের মতো অরক্ষিত এলাকাগুলোতে পর্যটকদের উদ্ধারের জন্য কোনো স্থায়ী ব্যবস্থা নেই। অথচ এসব এলাকাতেও প্রতিনিয়ত পর্যটকদের যাতায়াত ও গোসল অব্যাহত রয়েছে।
ভ্রমণপিপাসুদের অভিযোগ, হোটেলে ওঠার সময় যদি তাদের গোসলের ঝুঁকি ও গাইডলাইন সম্পর্কে আগে থেকে সচেতন করা হতো, তবে দুর্ঘটনা কমানো সম্ভব হতো। ঢাকা থেকে আসা পর্যটক সালাহ উদ্দিন আহমদ বলেন, পর্যটকদের নিবন্ধনের পাশাপাশি তাদের ঝুঁকির বিষয়ে মেসেজ বা নির্দেশনার ব্যবস্থা থাকলে তা কার্যকর হতে পারতো। হোটেল মালিক সমিতির হিসাব অনুযায়ী, দুর্গাপূজার ছুটিতে অন্তত ছয় লাখ পর্যটক কক্সবাজারে সমবেত হয়েছিলেন, যাদের অধিকাংশই সমুদ্রে নেমেছিলেন। পর্যটক হারুন অর রশিদ বলেন, ‘দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে মানুষ কক্সবাজারে বেড়াতে আসেন। পর্যটকদের হোটেল ওঠার সময় অনলাইন নিবন্ধন এবং নিবন্ধিত পর্যটকদের ঝুঁকির বিষয়টি ম্যাসেজে জানানোর সিস্টেম চালু হলে কাজে আসত।’।
পরিস্থিতি নিয়ে জেলা প্রশাসক মো. আ. মান্নান জানান, পর্যটকদের সচেতন করার সব ধরনের চেষ্টা চলছে। কিন্তু একসঙ্গে কয়েক লাখ পর্যটক সৈকতে নামলে নিয়ন্ত্রণ করা অত্যন্ত কঠিন হয়ে পড়ে। শহরের বাইরে অরক্ষিত সৈকতের পয়েন্টগুলোতে উদ্ধারকারী লাইফগার্ডের সংখ্যা বাড়ানোর জন্য প্রশাসন কাজ করছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।
The post কক্সবাজার সৈকতে গোসলের মৃত্যুমিছিল: বাড়ছে ঝুঁকি, মিলছে না সমাধান appeared first on Daily Sangbad Chorcha.
