বিষয়টি ভুলভাবে বুঝলে মনে হতে পারে, ইসলাম ভিন্ন ধর্মের প্রতিবেশীর সঙ্গে দূরত্ব তৈরি করতে চায়। কিন্তু কোরআন ও রাসুল (সা.)-এর জীবন তা বলে না। ইসলামের শিক্ষা হলো নিজের বিশ্বাসে অটল থাকা এবং সবার সঙ্গে ন্যায় ও সদাচরণ করা।
কোরআন কী বলে?
১. ভিন্ন ধর্মের শান্তিপ্রিয় মানুষের প্রতি সদাচরণ
দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের ঘরবাড়ি থেকে বের করে দেয়নি, তাদের প্রতি সদাচরণ ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদের নিষেধ করেন না। (সূরা আল-মুমতাহিনা, ৮)
২. অন্যের বিশ্বাসকে অসম্মান না করা
আল্লাহ ছাড়া তারা যাদের ডাকে, তাদের তোমরা গালি দিয়ো না। (সুরা আল-আনআম, ১০৮)। অন্য ধর্মের বিশ্বাস ও প্রতীকের প্রতি অশ্রদ্ধা দেখানো ইসলামসম্মত নয়।
৩. ধর্মে জবরদস্তি নেই
দ্বীনের ব্যাপারে কোনো জবরদস্তি নেই। (সুরা আল-বাকারা, ২৫৬)
৪. শত্রুতার মধ্যেও ন্যায়বিচার
কোনো সম্প্রদায়ের প্রতি শত্রুতা যেন তোমাদের ন্যায়বিচার থেকে বিরত না রাখে। (সুরা আল-মায়িদা, ৮)
৫. প্রতিবেশীর অধিকার
সুরা আন-নিসার ৩৬ নম্বর আয়াতে নিকট ও দূরের প্রতিবেশীর প্রতি সদ্ব্যবহারের নির্দেশ এসেছে। এতে প্রতিবেশীর ধর্ম বা পরিচয়ের কোনো শর্ত নেই।
রাসুল (সা.)-এর জীবনে সম্প্রীতির দৃষ্টান্ত তার মদিনা সনদে অনন্য ভাবে উল্লেখ করেছেন: মদিনায় মুসলিম, ইহুদি ও অন্যান্য গোষ্ঠীকে নিয়ে একটি যৌথ সামাজিক চুক্তি করা হয়েছিল। এতে সবার নিরাপত্তা, ধর্মীয় স্বাধীনতা ও পারস্পরিক সহযোগিতা নিশ্চিত করা হয়। নাজরানের খ্রিষ্টানদের সঙ্গে চুক্তিতে তাদের জানমাল ও উপাসনার স্বাধীনতার নিরাপত্তা দেওয়া হয়। আর প্রতিবেশীর অধিকার আদায়ে রাসুল (সা.) বলেছেন, জিবরাইল (আ.) প্রতিবেশীর অধিকার নিয়ে এত বেশি তাগিদ দিতেন যে তার মনে হয়েছিল প্রতিবেশীকে উত্তরাধিকারীই করে দেওয়া হবে। (বুখারি,৬০১৪)
নীতিগত অবস্থান ও বিদ্বেষ এক জিনিস নয়
ভিন্ন ধর্মের আচার অনুষ্ঠানে অংশ না নেওয়া উত্তম। এটি নিজের বিশ্বাসের প্রতি আনুগত্যের প্রমাণ। কোরআনের ভাষায়, তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীন, আমার জন্য আমার দ্বীন। (সুরা আল-কাফিরূন, ৬)। প্রতিটি ধর্মের অনুসারীরই নিজ বিশ্বাস অনুযায়ী চলার অধিকার আছে। একে সম্মান করাই প্রকৃত সহাবস্থান। আচারে অংশ না নিয়েও প্রতিবেশীর প্রতি সদাচরণ, ন্যায়বিচার ও সহযোগিতা পুরোপুরি সম্ভব।
সম্প্রীতি জোরদার করার বৈধ ও কার্যকর পথ
মুসলিম ব্যক্তি সংগঠন ও ধর্মীয় আচারে যুক্ত না হয়েও সম্প্রীতি মজবুত করতে পারে। মানবিক সহায়তা করা যেমন: অসুস্থতা, দুর্যোগ, দুর্ঘটনা বা দারিদ্র্যে ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে সবার পাশে দাঁড়ানো। তাদের উৎসবের সময় এলাকায় শান্তি বজায় রাখা এবং কেউ যেন হামলা বা উসকানির শিকার না হয় তা নিশ্চিত করা। এটি নাগরিক ও নৈতিক দায়িত্ব। ভদ্র ও সৌজন্যমূলক আচরণ, যা আকিদার বিরোধী নয়। যৌথ সমাজকল্যাণ প্রকল্পে রাস্তা মেরামত, পরিচ্ছন্নতা, স্বাস্থ্যশিবির বা শিক্ষা কার্যক্রমে সবাইকে নিয়ে কাজ করা।
ইসলাম বিশ্বাসে দৃঢ় থাকতে শেখায়, আবার আচরণে উদার হতে বলে। মুসলিমের পরিচয় শুধু ইবাদতে নয়, প্রতিবেশীর নিরাপত্তা, ন্যায়বিচার ও মানবিকতার মধ্য দিয়েও ফুটে ওঠে। সম্প্রীতির এই পথই ইসলামের সুমহান আদর্শের বাস্তব প্রতিফলন।
লেখক: আলেম ও সাংবাদিক
