Published on
:
2 min read
সৌমিত্র ঘোষ, বালি
একটা সময় ছিল, যখন বাংলায় সে অর্থে কোনও প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা ব্যবস্থা ছিল না। ছিল না কোনও স্কুল-কলেজ ও বিশ্ববিদ্যালয়। শিক্ষালাভের একমাত্র জায়গা ছিল সংস্কৃত টোল। সে দিক থেকে দেখলে বালির চৈতলপাড়া ছিল শিক্ষার অন্যতম পীঠস্থান। বালির চৈতলপাড়া এলাকাতেই টোল প্রতিষ্ঠা করেছিলেন তখনকার নামকরা সংস্কৃত পণ্ডিত রামগোবিন্দ ভট্টাচার্য। ছাত্ররা বসতেন মাটির আটচালায়। আজ থেকে আড়াইশো বছর আগে সেখানেই দুর্গাপুজো চালু করেন রামগোবিন্দ। সেই দুর্গাই পরবর্তীকালে পরিচিত হয়ে ওঠে 'বুড়িমা' নামে।
স্থানীয় সূত্রে জানা গিয়েছে, বালির এই তল্লাটে চৈতল বংশীয় ব্রাহ্মণদের বসবাস ছিল। সম্ভবত, সেই কারণেই এই জায়গাটির নাম হয়েছে চৈতলপাড়া। 'বালির সেকাল থেকে একাল' গ্রন্থ থেকে জানা যায়, চৈতলবংশীয় চন্দ্রশেখর বিদ্যালঙ্কারের পৌত্র রামভদ্র ন্যায়ালঙ্কার আওরঙ্গজেবের কাছ থেকে চকবালি গ্রামে জমির সনদ পান। এই পরিবারে সদস্যরা বংশ পরম্পরায় সংস্কৃত পণ্ডিত ছিলেন। তাঁদের মধ্যে অন্যতম রামগোবিন্দ। তিনি যে আটচালায় বসে ছাত্রদের শিক্ষা দিতেন, সেখানেই প্রথম দুর্গাপুজো শুরু করেন। প্রাচীনত্বের কারণেই এখানকার দেবী দুর্গা 'বুড়িমা' নামে পরিচিতি পেয়েছে। তারপর থেকে দশকের পর দশক ধরে 'বুড়িমার আটচালায়' পুজো হচ্ছে। তবে নামটা আটচালা থেকে গেলেও বাস্তবে এখন তারা কোনও অস্তিত্বই নেই। সেখানেই এখন গড়ে উঠেছে পাকাপোক্ত মন্দির। বুড়িমার বাহন সাদা রঙের ঘোড়ামুখ সিংহ। এই প্রতিমা শতাধিক বছর ধরে বংশানুক্রমিক ভাবে একই শিল্পী পরিবারের মানুষরা তৈরি করে আসছেন।
এক সময়ে এটি পারিবারিক পুজো হিসেবে শুরু হলেও ধীরে ধীরে সেটি সর্বজনীন পুজোয় পরিণত হয়। বালির চৈতলপাড়া এলাকার সর্বস্তরের মানুষ এই পুজোয় অংশ নিয়ে থাকেন। বাইরে থেকেও অনেকে বুড়িমার পুজো দেখতে আসেন। পুজোর উদ্যোক্তারা জানাচ্ছেন, পুরোনো রীতি-নীতি মেনে বছরের পর বছর এখানে পুজো হয়ে আসছে। সম্পূর্ণ শাস্ত্রমতে এখানে পুজো করা হয়।
চারদিনের পুজো হলেও পুজোর মূল অনুষ্ঠান চলে ন'দিন ধরে। এই পুজোয় কুমারীপুজোর গুরুত্ব অপরিসীম। কুমারীকে ৬ দিন ধরে ভোগ নিবেদন করা হয়। সপ্তমীর সকালে অনুষ্ঠিত হয় কুমারীপুজো। পুজোর আসনে উপবিষ্ট কুমারীর আনুষ্ঠানিক অনুমতি নিয়ে পুরোহিত পুজোর অনুষ্ঠান শুরু করেন। এর আগে মন্দির প্রাঙ্গণে নবপত্রিকাকে স্নান করিয়ে গণেশের পাশে স্থাপন করা হয়।
মহাষ্টমীতে কাম্যপূজা একটি বিশেষ অনুষ্ঠান। অনেকে বিশ্বাস করেন, দেবীর পদতলে কোনও মনোবাসনা জানালে, বুড়িয়া তাঁর ইচ্ছা পূরণ করেন। দেবীর উদ্দেশে অনেকে সোনা ও রুপোর অলঙ্কার ও কাপড় উৎসর্গ করে থাকেন। বুড়িমার সমস্ত অলঙ্কার ও অস্ত্র সোনার। কামাপুজোর সময় অনেকে বুক চিরে রক্তদান করেন এবং ধুনো পোড়ানো এখানকার একটা ধর্মীয় রীতি। পুজোর দিনগুলিতে প্রতি দিন সকালে পুষ্পাঞ্জলি দিতে ও রাতে আরতি দেখতে রীতিমতো ভিড় লেগে যায় আটচালার মন্দিরে। মহাষ্টমীর পুষ্পাঞ্জলিতেও ভিড় উপচে পড়ে।
দশমীর সকালে বুড়িমাকে কেন্দ্র করে অনুষ্ঠিত হয় বেড়াঞ্জলি। ঘরের মেয়েকে বিদায় জানানোর আগে নিবেদন করা হয় ইলিশ ও পান্তাভাত। ইলিশ সহযোগে পান্তা খেয়েই কৈলাসের পথে রওনা দেন উমা। এর পরে ভক্তরাই কাঁধে চাপিয়ে প্রতিমাকে গঙ্গার ঘাটে নিয়ে যান নিরঞ্জনের জন্য। তার আগে মন্দির চত্বরে সিঁদুর খেলায় মেতে ওঠেন মহিলারা। বুড়িমার প্রতিমা নিরঞ্জনের পদ্ধতিটাও আলাদা। দু'টি নৌকো জুড়ে তার মধ্যে প্রতিমাকে বসানো হয়। গঙ্গার বিভিন্ন ঘাটে ঘুরিয়ে তারপরে মাঝগঙ্গায় প্রতিমা বিসর্জন দেওয়া হয়। পুজো কমিটির সভাপতি অমিতাভগঙ্গোপাধ্যায় ও সম্পাদক সুদীপকুমার ঘোষ বললেন, 'আমরা ঐকান্তিক ভাবে পুজোর এই সুদীর্ঘ ঐতিহ্যকে বজায় রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছি। ভক্তদের আন্তরিক সহযোগিতা ও মায়ের আশীর্বাদই আমাদের পাথেয়।'