বিশ্ব ইজতেমা ২০২৭-এর তারিখ ও আয়োজন নিয়ে বিভ্রান্তিকর বক্তব্যের প্রতিবাদ জানিয়েছে ওলামা মাশায়েখ বাংলাদেশ। একই সঙ্গে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে ২০১৮ ও ২০২৪ সালে হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর দ্রুত তদন্ত শেষ করে চার্জশিট দেওয়ার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি। এসব দাবিতে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে তারা পাঁচ দফা দাবি তুলে ধরে।
সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পাঠ করেন মুফতি কেফায়তুল্লাহ আজহারী। বক্তব্যে বলা হয়, বিশ্ব ইজতেমার মতো বড় ধর্মীয় আয়োজনে সরকার সহযোগিতামূলক ভূমিকা রাখছে। এ জন্য সরকারপ্রধান, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী, ধর্মমন্ত্রী ও ধর্ম প্রতিমন্ত্রীর প্রতি কৃতজ্ঞতা জানানো হয়।
বক্তারা জানান, গত ১৮ আগস্ট অনুষ্ঠিত সভার কার্যবিবরণী অনুযায়ী, ২০২৭ সালের বিশ্ব ইজতেমা তাবলিগ জামাত বাংলাদেশের শুরায়ী নেজামের অধীনে, বাংলাদেশের ওলামায়ে কেরামের তত্ত্বাবধানে দুই ধাপে হবে। প্রথম ধাপ ৮ থেকে ১০ জানুয়ারি এবং দ্বিতীয় ধাপ ১৫ থেকে ১৭ জানুয়ারি।
তাদের অভিযোগ, গত ৯ অক্টোবর কালের কণ্ঠ অনলাইনে প্রচারিত একটি ভিডিও বার্তায় মুফতি ওসামা ইসলাম দাবি করেন, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তাদের আশ্বাস দিয়েছেন যে ২০২৭ সালের ২৯ ও ৩০ জানুয়ারি টঙ্গীতে সাদপন্থীদের ইজতেমা হবে এবং ভারতের নিজামুদ্দিন থেকে মাওলানা সাদ কান্ধলভী তাতে অংশ নেবেন।
বক্তারা বলেন, সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে জনমনে বিভ্রান্তি তৈরি করতে পারে—এমন বক্তব্যের সত্যতা কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে যাচাই করা জরুরি। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এ ধরনের কোনো আশ্বাস দিয়েছেন কি না, তা সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করার আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা অভিযোগ করেন, ২০১৮ ও ২০২৪ সালে টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে সাদপন্থীদের দ্বারা সংঘটিত সহিংসতার আগে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে প্রচারিত বিভিন্ন বক্তব্য ও নির্দেশনা পরিস্থিতি উত্তেজনাপূর্ণ করে তুলেছিল। এসব ঘটনার মামলার তদন্ত দ্রুত শেষ করে দায়ীদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তাঁরা। একই সঙ্গে নিরপেক্ষ তদন্ত ও আইনি প্রক্রিয়ার মাধ্যমেই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বলেন।
সংবাদ সম্মেলনে ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিনে প্রকাশিত পহেলা বৈশাখ ও শবে মেরাজ প্রসঙ্গে ওসামা ইসলামের একটি বক্তব্যের কথাও তোলা হয়। বক্তারা ওই বক্তব্যের ধর্মীয় যথার্থতা নিয়ে আপত্তি জানান। তাদের দাবি, এ নিয়ে বিতর্কের পর তিনি ধানমন্ডির তাকওয়া মসজিদের দায়িত্ব থেকে অব্যাহতি পান। এ বিষয়ে কোনো আইনগত অভিযোগ থাকলে তা প্রচলিত আইনে নিষ্পত্তির আহ্বান জানান তারা।
বক্তারা বলেন, বিশ্ব ইজতেমা মুসলিম উম্মাহর ঐক্য, দ্বীনি পরিবেশ ও দেশের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় ভাবমূর্তির সঙ্গে জড়িত। তারা এ আয়োজন নিয়ে বিভ্রান্তি, উসকানি বা সংঘাত চান না। সবাইকে সরকারি সিদ্ধান্তের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকা, দায়িত্বশীল বক্তব্য দেওয়া এবং আইনশৃঙ্খলা স্বাভাবিক রাখতে সচেতন ভূমিকা পালনের আহ্বান জানান।
পাঁচ দফা দাবি
১. ২০১৮ সালের ১ ডিসেম্বর ও ২০২৪ সালের ১৮ ডিসেম্বর টঙ্গীর ইজতেমা ময়দানে হামলা ও প্রাণহানির ঘটনায় দায়ের করা মামলাগুলোর তদন্ত দ্রুত শেষ করে চার্জশিট দিতে হবে এবং দায়ীদের বিচার করতে হবে।
২. বিশ্ব ইজতেমা ২০২৭ ও সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভ্রান্তিকর ভিডিও বার্তা প্রচারের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে যাচাই করতে হবে। সাদপন্থী নেতা ওয়াসিফুল ইসলাম ও তার ছেলে ওসামা ইসলামের আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে প্রচলিত আইনে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৩. সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে উসকানিমূলক বক্তব্য, সহিংসতার আহ্বান ও সরকারি সিদ্ধান্ত নিয়ে বিভ্রান্তিকর তথ্য প্রচারের অভিযোগ নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করতে হবে। আইন লঙ্ঘনের প্রমাণ মিললে ব্যবস্থা নিতে হবে।
৪. ২০১৮ ও ২০২৪ সালের ঘটনায় নিহতদের পরিবার ও গুরুতর আহতদের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে হবে এবং তাদের চিকিৎসা, পুনর্বাসন ও প্রয়োজনীয় সহায়তার বিষয়টি বিবেচনা করতে হবে।
৫. প্রধানমন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী ও ধর্ম মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত মন্ত্রীর মাধ্যমে সরকারের নীতিগত সিদ্ধান্ত সমন্বিত রাখতে হবে। অন্য কোনো মন্ত্রী, সংসদ সদস্য বা জনপ্রতিনিধির ব্যক্তিগত উদ্যোগে তাবলিগ জামাতের অভ্যন্তরীণ কার্যক্রমে হস্তক্ষেপ বন্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বক্তারা বলেন, এসব দাবি কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠীর প্রতি বিদ্বেষ থেকে নয়; বিশ্ব ইজতেমার সুষ্ঠু আয়োজন, সরকারি সিদ্ধান্তের বাস্তবায়ন, ধর্মীয় পরিবেশ রক্ষা এবং অতীতের সহিংসতায় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্যই তোলা হয়েছে। তারা বিষয়গুলো গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে পদক্ষেপ নিতে এবং ইজতেমা নিয়ে বিভ্রান্তি দূর করতে সরকারের পক্ষ থেকে সুস্পষ্ট বক্তব্য দিতে অনুরোধ করেন।
সংবাদ সম্মেলনে আরও উপস্থিত ছিলেন মাওলানা উবায়দুল্লাহ ফারুক, মাওলানা নাজমুল হাসান কাসেমী, মাওলানা লোকমান মাজহারী, মাওলানা সালাউদ্দিন, মাওলানা আনিসুর রহমান এবং মিডিয়া সমন্বয়ক হাবিবুল্লাহ রায়হান।
