জাফর আহমাদ
যে ব্যক্তি পৃথিবীর সর্বোত্তম ও পবিত্র কালাম তথা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ এর মাধ্যমে ঈমানের সবুজ অরণ্যে প্রবেশ করেছেন, তার মুখ থেকে শুধু মধুবাক্যই ঝরবে। অসৎ, অসুস্থ ও অপবিত্র কথা কখনো তার মুখ থেকে বের হবে না। তার সামগ্রীক জীবন ব্যবস্থা ভারসাম্য নীতির উপর প্রতিষ্ঠিত হবে। জীবনের কোথাও অমিল, অন্ধকার, অসংলগ্ন কথা বা কাজ থাকবে না। মনে রাখতে হবে, ঈমান ও অপবিত্র কথা সমান্তরালভাবে পাশাপাশি একজনের ভেতর বসবাস করতে পারে না। হয় সেখানে ঈমান থাকবে নয় তো সেখানে কেবল অপবিত্র, হিংসা-বিদ্বেষ ও বেফাঁস কথা ও কাজের রাজত্ব বিরাজ করবে। কারণ প্রথমেই বলা হয়েছে। ঈমানদার যেই কালিমার মাধ্যমে মু’মিন নাম ধারণ করেন, সেটি একটি পবিত্র কথা। সেখানে অপবিত্রতার লেশমাত্র নেই। এটি এমন একটি বাক্য যার মাধ্যমে মুসলিম মিল্লাত তাদের জীবনের ভিত রচনা করেন। যিনি কালিমা তাইয়্যেবার ভিত্তিত্বে নিজের জীবন ব্যবস্থাকে গড়ে তুলেন, তার চিন্তাধারায় পরিচ্ছন্নতা, স্বভাবে প্রশান্তি, মেজাজে ভারসাম্য, চরিত্রে পবিত্রতা, আচরণে মাধুর্যতা, ব্যবহারে নম্রতা, লেনদেনে সততা, কথাবার্তায় সত্যবাদিতা, ওয়াদা ও অংগীকারে দৃঢ়তা, সামাজিক জীবন যাপনে সদাচার, কথা-বার্তায় চিন্তার ছাপ, চেহেরায় পবিত্রতার ভাব ফুটে উঠবে। মোট কথা ব্যক্তির সামগ্রীক জীবন ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক একটা পরিবর্তন সুচিত হবে। যার জীবনধারার কোথাও কোন অসঙ্গতি থাকবে না। সর্বোপুরি একজন মুমিন আল-কুরআন অনুযায়ী কথা বলবে এবং আল কুরআন অনুযায়ী কথা পরিত্যাগ করবে। আল-কুরআনের নির্দেশনা অনুযায়ী জীবন চলার পথে কিছু জিনিসকে গ্রহণ করবে আবার কিছু জিনিসকে বর্জন করবে। একজন মুমিনই মুত্তাকী, একজন মুত্তাকীই মুমিন। আর এ মুমিন ও মুত্তাকীর জন্য আল্লাহ রাব্বুল আলামীনের পক্ষ থেকে অমূল্য উপহার হচ্ছে আল-কুরআন। আল্লাহ তা’আলা বললেন: ” আলিফ-লাম-মিম। (এই নাও) সেই কিতাব (আল-কুরআন) তাতে সন্দেহের কোন অবকাশ নাই, ইহা মুত্তাকী লোকদের পথ দেখাবে।” (সুরা বাকারা-১-২) আল কুরআন তাকওয়ার গুণ ও বৈশিষ্ট্যের অধিকারী মুমিন লোকদের ভালো-মন্দের পার্থক্য নিরূপণের জন্য এবং অন্ধকারে নিশ্চিন্তে পথ চলার শক্তি ও আলো যোগাবে। কুরআন বলবে এটি জান্নাতের পথ, আর এটি জাহান্নামের পথ। আল্লাহ তা’আলা বলেন: “আর এ কুরআন হচ্ছে মানব জাতির জন্য পথের দিশা। মানুষের জন্য (হক বাতিলের) পার্থক্যকারী।” (সুরা-বাকারা-১৮৫)
একজন মুমিন এমন কথা বলা উচিত নয়, যা একটি মারাত্মক বোমার চেয়েও ক্ষতিকর। একটি বোমা নির্দিষ্ট কিছু লোকের জান-মালের ক্ষতি করে থাকে। কিন্তু একটি খারাপ কথা সমাজ ভাঙনের কার্যকরী হাতিয়ার হিসাবে কাজ করে থাকে। সমাজকে বিভিষিকাময় পরিস্থিতির মুখোমুখী করে। সমাজে ভ্রাতৃত্ববোধের স্থান দখল করে নেয় হিংসা-হানাহানি, বিদ্বেষ আর অহংবোধ। আর এর ফলে মানুষ চরম দুঃখ-দূর্দশার সম্মুখিন হয়। অথচ একজন মুমিন কখনো অন্য একজন মু’মিনকে কষ্ট দিতে পারে না। সে কথাটি যদি আবার সঠিক না হয়, কিংবা সেটি লক্ষ লক্ষ মানুষের মনোকষ্টের কারণ হয়, তাহলে ব্যাপারটি আরো মারাত্মক। কারন আল্লাহ তা’আলা বলেছেনঃ “মু’মিনরা তো পরস্পর ভাই ভাই। অতএব তোমাদের ভাইদের মধ্যকার সম্পর্ক ঠিক করে দাও। আল্লাহকে ভয় করো, আশা করা যায় তোমাদের প্রতি মেহেরবাণী করা হবে।” (সুরা হুজরাত : ১০) “মানুষ খারাপ কথা বলে বেড়াক, তা আল্লাহ তা’আলা পছন্দ করেন না। তবে কারো জুলুম করা হলে তার কথা স্বতন্ত্র। আর আল্লাহ সবকিছু শোনেন ও জানেন।” (সুরা নিসা : ১৪৮) আল্লাহ তা’আলা আরো বলেন, “আর কোন নবী আসবেন না। কিন্তু নবী সা: এর মিশনকে এগিয়ে নেয়ার গুরুভার দায়িত্ব পালন করতে তাঁর উম্মত মু’মিন ও মুসলমানদেরকে। দাওয়াতী কাজের নিয়ম কানুন ও পারস্পরিক কথাবার্তার ধরন আল কুরআন নির্ধারণ করেছে। তাই একজন মু’মিন ও মুসলমান কথা বলবেন আল কুরআনের নির্দেশিত পন্থায়। কখন কার সাথে কিভাবে কোন ভাষায় কথা বলবে কুরআন একটি একটি করে বর্ণনা করেছে। নিচে এ ধরনের কিছু উদাহরণ পেশ করা হলো।
# মু’মিন কথা বলবে “সাদিদ” এর ভাষায়। আল কুরআন বলা হয়েছে,“হে ঈমানদারগণ! আল্লাহকে ভয় কর এবং সঠিক কথা বলো। আল্লাহ তোমাদের কার্যকলাপ ঠিকঠাক করে দিবেন এবং তোমাদের অপরাধসমূহ মাফ করে দিবেন। যে ব্যক্তি আল্লাহ ও রাসুলের আনুগত্য করে সে বড় সাফল্য অর্জন করে।”(সুরা আহযাব:৭০-৭১) আয়াতে ঈমানদারকে বলা হয়েছে আল্লাহকে ভয় করো, মুখে যা আসে তা বলে ফেলো না বরং ‘কাউলে সাদিদ’ প্রয়োগ করো। তাকওয়ার দাবী হচ্ছে সাদিদ-এর ভাষায় কথা বলা। সাদিদ হচ্ছে, এমন সঠিক ও সত্য কথা যার মধ্যে বিন্দুমাত্র অশুদ্ধতা থাকবে না এবং অসত্যের লেশমাত্রও থাকবে না।
এমন সোজা কথা যার মধ্যে কোন বক্রতা থাকবে না বা জঠিলতা থাকবে না। এমন কোমল কথা যার মধ্যে কর্কশতা থাকবে না। এমন গাম্ভীর্যপূর্ণ কথা যার মধ্যে হালকা, বেহুদা কথা থাকবে না। কাউলে সাদিদ হচ্ছে এমন কথা যার মধ্যে এই চারটি গুণ থাকতে হবে।
# মুমিন কথা বলবে কাউলান মাইছুরা অর্থাৎ সহজ, সহজবোধ্য পরিচ্ছন্ন ভাষায় : মাইছুরা হচ্ছে সহজ, সরল, সহজবোধ্য। অর্থাৎ এটি এমন ধরনের কথা যেমন কেউ আমার কাছে কোন কিছু চাইলেন, আমি তাকে নিরাশমূলক বা ধমক না দিয়ে তাকে আশার বাণী শোনানো। আজ পারছি না ইনশা’আল্লাহ পরে দিবো। এ ধরনের আশার বাণীকে কাউলাম মাইছুরা বলে। কথার ধরন হবে সহজ ও স্পষ্ট, তোমাকে এখন দিতে পারছি না পরে দিবো। যেমন আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যদি তাদেরকে থেকে (অর্থাৎ অভাবী, আত্মীয়-স্বজন, মিসকীন ও মুসাফির) তোমাকে মুখ ফিরিয়ে নিতে হয় এ জন্য যে, এখনো তুমি প্রত্যাশিত রহমতের সন্ধান করে ফিরছো,(অর্থাৎ তোমার দেয়ার মতো সক্ষমতা আসেনি) তাহলে তাদেরকে নরম জবাব দাও।” (সুরা বনী ইসরাঈল : ২৮) অর্থাৎ আমাদের ধন সম্পদে গরীব আত্মীয়-স্বজন, মিসকীন ও অসহায়দের অধিকার রয়েছে। যদি তারা আপনার কাছে প্রার্থী হয়, তখন তাদেরকে নিজের অভাবের কথা না বলে অত্যন্ত নরম ও কোমল ভাষায় প্রবোধ সহকারে বিদায় করতে হবে।
# কাউলান মারুফা বা সৎ কথা ও ভালো কথা বলতে হবে : মুমিনের কথা হবে সৎ ও ভালো ভাষায় ব্যবহারের মাধ্যমে। যেমন নিঃস্ব, ইয়াতীম, মিসকিন, অসহায়দের উদ্দেশ্যে কথার ধরণ হবে মারুফা। এটি সামাজিক কথা। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আর তোমরা যে ধন-সম্পদকে আল্লাহ তোমাদের জীবন ধারনের মাধ্যমে পরিণত করেছেন, তা নির্বোধদের হাতে তুলে দিয়ো না। তবে তাদের খাওয়া পরার ব্যবস্থা করো এবং সদুপদেশ দাও।” (সুরা নিসা : ৫)
# কাউলান কারীমা বা সম্মানজনক কথা : মুমিন কথা বলবে কারীমা বা সম্মান বজায় রেখে। মা বাবা অথবা সম¥ানিত ও শ্রদ্ধাভাজন ব্যক্তির সাথে দরদপূর্ণ ও সম্মানজনক কথা বলতে হবে। অশালীন ও অসম্মানজনক কথা পরিহার করতে হবে। তাদের সাথে ধমকের স্বরে কথা বলি যাবে না। কোন প্রকার বেয়াদবিমূলক কথা বা আচরণ করা যাবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন,“তাদেরকে ধমকের সুরে জবাব দিয়ো না বরং তাদের সাথে মর্যাদা সহকারে কথা বলো।”(সুরা বনী ইসরাঈল:২৩)
# কাউলান বালীগা বা জোরালো ও মর্মস্পর্শী ভাষায় কথা বলা: মুসলমানদের মধ্যে যদি সন্দেহ হয় যে সে বাতিল ফেরকা বা আকীদায় আক্রান্ত, তাদের উদ্দেশ্যে কথার ধরণ হবে বালীগা অর্থাৎ সদুপদেশের ভাষায়। অর্থাৎ তাদের কাছে কুরআন-হাদীসের দলিল সহকারে সুন্দর উপস্থাপনার মাধ্যমে কথা পৌঁছে দিতে হবে, যাতে তাদের অন্তর ছুঁয়ে যায়। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “আল্লাহ জানেন তাদের অন্তরে যা কিছু আছে। তাদের পেছনে লেগোনা, তাদেরকে বুঝাও এবং এমন উপদেশ দাও, যা তাদেরহৃদয়ের অভ্যন্তরে প্রবেশ করে যায়।” (সুরা নিসা : ৬৩)
কুরতুবি বলেছেন, ‘এবং তাদের সাথে নিজেদের বিষয়ে মর্মস্পর্শী ও জোরালো ভাষায় কথা বলো।’ বালিগ শব্দের অর্থ হলো, কোন বিষয়ের মূলে বা গভীরে প্রবেশ করা। যার কথা তার অন্তরের প্রকৃত ভাব বা গভীরতাকে যথাযথভাবে প্রকাশ করে। কিন্তু আমাদের দেশের দাওয়াতদানকারীর বৈশিষ্ট্য হলো, যাকে ধরবে তাকে একহাত নিয়ে নিবে অথবা তাকে ভালো করে ধূয়ে দিবে। কিন্তু এটি দাওয়াতের বৈশিষ্ট্য নয়।
# কাউলান লাইয়্যেনা বা মৃদু, কোমল ও নরম ভাষায় কথা বলা : লাইয়্যেনা শব্দের অর্থ হলো মৃদু ও কোমলতা। এটি এমন আলাপচারিতা যা কঠোরতামুক্ত এবং যা মমতা ও হিতোপদেশপূর্ণ। সমাজের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি, দাম্ভিক, উদ্ধতভাব প্রদর্শনকারী, অহংকারী। যেই ব্যক্তি কোন কিছুই মানতে রাজি নয়।
তার সাথে কথা বলতে হবে অত্যন্ত নরম, কোমল ও মিষ্টি ভাষায়। কোন প্রকার কড়া বা চড়া ভাষা প্রয়োগ করা যাবে না। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “যাও, তোমরা দু’জন ফেরাউনের কাছে, সে বিদ্রোহী হয়ে গেছে। তার সাথে কোমলভাবে কথা বলো, হয়তো সে উপদেশ গ্রহণ করবে অথবা ভীত হবে।” (সুরা ত্বাহা : ৪৩-৪৪) দাওয়াত দানকারীর বৈশিষ্ট্য হলো, সে মৃদু ও কোমল ভাষী হবে। তার চরিত্র মাধুর্যে কঠোরতা ও রূঢ়তা থাকবে না। বরং মমতা ও সৌহার্দ্য এবং যা প্রজ্ঞা ও হিতোপদেশ দ্বারা বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত।
যারা ইসলাম দরদী সেজে অন্যদলের বিরুদ্ধে বেফাঁস কথা বলছেন ও ফতোয়া দিচ্ছেন, তাদের এ কর্মনীতি সুস্পষ্টভাবে কুরআন বিরোধী এবং তারা মূলত: শয়তানের কর্মসূচিকেই বাস্তবায়িত করছেন। আল্লাহ তা’আলা বলেন, “(আর হে মুহাম্মাদ!) আমার বান্দাদেরকে বলে দাও, তারা যেন মুখে এমন কথা বলে যা সর্বোত্তম। আসলে শয়তান মানুষের মধ্যে বিভেদ সৃষ্টির চেষ্টা করে। প্রকৃতপক্ষে শয়তান হচ্ছে মানুষের প্রকাশ্য শত্রু।” (সুরা বনী ইসরাঈল : ৫৩)
লেখক : ব্যাংকার ও প্রাবন্ধিক।
