বাংলাদেশের দক্ষিণ-পশ্চিমের শেষ প্রান্ত ছুঁয়ে যেখানে বনভূমি গিয়ে মিশেছে বঙ্গোপসাগরের নোনা জলে, সেখানেই রয়েছে পৃথিবীর বৃহত্তম রূপসী ম্যানগ্রোভ সুন্দরবন। অসংখ্য নদ-নদী ও আঁকাবাঁকা খালের মোহনায় গড়ে ওঠা এই বন শুধু তার অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের জন্যই সমাদৃত নয়, বরং বন্যপ্রাণীর বৈশ্বিক অভয়ারণ্য হিসেবেও বিশ্বজুড়ে সুপরিচিত। বিশ্ব ঐতিহ্য বা ইউনেস্কো ওয়ার্ল্ড হেরিটেজ সাইটের মর্যাদা পাওয়া এই বনভূমি হলোÑ রাজকীয় রয়্যাল বেঙ্গল টাইগার, চিত্রা হরিণ, বিরল প্রজাতির লবণপানির ইরাবতী ডলফিন, বুনো শুশুক, মেছো বিড়াল ও কুমিরসহ অজস্র জলজ-স্থলজ প্রাণীর নিরাপদ নিবাস। যুগে যুগে এই বন রূপকথার মতো আকর্ষণ করে এসেছে পর্যটক, গবেষক ও অ্যাডভেঞ্চারপ্রেমীদের। একসময় সুন্দরবন ভ্রমণের ধারণাটি ছিল সম্পূর্ণ নদীকেন্দ্রিক এবং অত্যন্ত দুর্গম। কোনোমতে ভাসমান লঞ্চ, বড় জাহাজ কিংবা কাঠবাইন ট্রলারের সংকীর্ণ কেবিনে রাত কাটিয়ে নদীর বুকে ভেসে ভেসে বন পরিদর্শন করাই ছিল একমাত্র উপায়। সেই দীর্ঘ ও অনিশ্চিত নৌ-যাত্রা প্রায়শই ছিল শারীরিক ক্লান্তি ও ঝুঁকির কারণ। অবকাঠামোগত কাঠামোর অনুপস্থিতি, সুপেয় পানির তীব্র সংকট, আবাসন ব্যবস্থার সীমাবদ্ধতা এবং রুচিসম্মত খাবারের অভাব সুন্দরবনের সফরকে একপ্রকার কঠিন অভিযানে পরিণত করত। সাধারণ ভ্রমণকারীদের জন্য যা ছিল বেশ দুষ্কর। তবে কালের বিবর্তনে বাংলাদেশের পর্যটন খাতে এসেছে রূপান্তর। এখন আর সুন্দরবন দেখার অভিজ্ঞতা কেবল লঞ্চের কেবিন কিংবা বোটে সীমাবদ্ধ নেই। বনের সীমানা ঘেঁষে, পশুর কিংবা ঢাংমারি খালের তটে গড়ে উঠেছে বেশ কিছু দৃষ্টিনন্দন ও পরিবেশবান্ধব ইকো রিসোর্ট ও কটেজ। প্রকৃতির স্বাভাবিক ছন্দকে ব্যাহত না করে নির্মিত এসব কটেজ ভ্রমণকারীদের এনে দিচ্ছে নিবিড় প্রাকৃতিক পরিবেশের ভেতর পরম আরামদায়ক ও সুরক্ষিত অভিজ্ঞতা।
প্রকৃতির সঙ্গে সহাবস্থান
সুন্দরবনের রোমাঞ্চ উপভোগ করতে এখন আর কষ্টকর নৌ-ভ্রমণ কিংবা কাদা-পানিতে অস্থায়ী তাবু টাঙিয়ে রাত কাটানোর প্রয়োজন পড়ে না। আধুনিক পর্যটনের বৈচিত্র্যময় চাহিদা মেটাতে পশুর নদী ও ঢাংমারি খালের দুপাশে গড়ে উঠেছে পরিবেশবান্ধব নানা আবাসন ব্যবস্থা। কাঠ, বাঁশ, গোলপাতা ও ছনের বুননে তৈরি এসব কটেজে অবস্থান করে পর্যটকরা যেমন সরাসরি সুন্দরবনের রূপ-রস-গন্ধ উপভোগ করতে পারেন, তেমনি নিবিড়ভাবে মিশে যাওয়ার সুযোগ পান স্থানীয় বাউয়ালি, মাওয়ালি ও জেলে সম্প্রদায়ের বৈচিত্র্যময় জীবনযাত্রার সঙ্গে।
পর্যটকদের এই নতুন অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে গড়ে ওঠা তেমনই একটি জনপ্রিয় ঠিকানা বনলতা ইকো কটেজ। খুলনার দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নের বুড়ির ডাবর বাজারের সন্নিকটে, লাউডোব ফরেস্ট ক্যাম্পের কোল ঘেঁষে এই কটেজের অবস্থান। ভ্রমণগোষ্ঠী টিজিবি (ট্যুর গ্রুপ বিডি)-এর সার্বিক ব্যবস্থাপনায় পরিচালিত এই কটেজটি তার সম্পূর্ণ পরিবেশবান্ধব স্থাপত্যশৈলী ও নান্দনিক রুচির কারণে ভ্রমণপিপাসুদের মনে স্থান করে নিয়েছে। চারপাশে সুঘন গাছপালার ছায়া, রূপসী পাখির কলকাকলি এবং নৈশব্দ্যের মাঝে পাখির ডানার শব্দ মিলিয়ে শহুরে যান্ত্রিকতা ভুলে প্রকৃতির কোলে আশ্রয় নেওয়ার জন্য এটি এক অনন্য প্রান্তর।
দাকোপের অপর একটি চমৎকার প্রাকৃতিক আশ্রয় হলো ম্যানগ্রোভ হ্যাভেন রিসোর্ট। বিশাল বৃক্ষরাজিতে ঘেরা নিভৃত ও শান্ত পরিবেশে কয়েকটা দিন কাটাতে চাওয়া পর্যটকদের জন্য এটি ভালো পছন্দ। এই রিসোর্টটির বাড়তি একটি দিক হলো বিভিন্ন ঋতুভেদে এখানে ১০% থেকে ৪০% পর্যন্ত বিশেষ মূল্যছাড়ের ব্যবস্থা থাকে, যা মধ্যবিত্ত ভ্রমণকারীদের জন্য আকর্ষণীয়।
মোংলার নদীপথের খুব কাছে, রূপসী পশ্চিম ঢাংমারিতে বিস্তৃত ইরাবতী ইকো রিসোর্ট ও রিসার্চ সেন্টার। বিশ্বজুড়ে বিলুপ্তপ্রায় ইরাবতী ডলফিনের অভয়ারণ্যের একেবারে নিকটবর্তী হওয়ায় এর ভৌগোলিক গুরুত্ব বেশি। গোলপাতার ছাউনি ও কাঠের পাটাতনে তৈরি এই রিসোর্টের বারান্দায় বসে চায়ে চুমুক দিতে দিতেই চোখে পড়ে নদীর নোনা জলে জলকেনি করা খেলাধুলাপ্রিয় ইরাবতী ডলফিনের দৃশ্য। বন্যপ্রাণী পর্যবেক্ষণ ও গবেষণার জন্য এটি আদর্শ স্থান।
একই ঢাংমারি এলাকায় গড়ে উঠেছে বনবাস ইকো ভিলেজ। নামে গ্রাম হলেও এখানে রয়েছে ৫টি প্রিমিয়াম ক্যাটাগরির নিভৃত ভিলা। এসব ভিলার কাঠের জানালা খুললেই চোখে পড়ে সুন্দরবনের সবুজ ক্যানভাস। রিসোর্টটির নিজস্ব উন্মুক্ত রেস্তোরাঁয় খাঁটি স্থানীয় উপাদানে রান্না করা দেশি পদ পরিবেশন করা হয়। শুধু থাকা-খাওয়াই নয়, বরং স্থানীয় বনজীবীদের সংস্কৃতি ও লোকজ ঐতিহ্যের সঙ্গে পর্যটকদের নিবিড় পরিচয় করিয়ে দেওয়ার নান্দনিক পরিকল্পনা রয়েছে তাদের। ঢাংমারির নদীর তীরে শান্ত পরিবেশের আরও একটি পরিচিত নাম বনবিবি ফরেস্ট রিসোর্ট। লোকদেবী বনবিবির নামে নামাঙ্কিত এই রিসোর্টে কাপল ভিলা, প্রিমিয়াম কটেজ ও ফ্যামিলি ভিলার বৈচিত্র্যময় বিন্যাস রয়েছে। কটেজ প্রাঙ্গণেই রয়েছে একটি ছোট কিন্তু সমৃদ্ধ লাইব্রেরি। নদী ও বনের শব্দ শুনতে শুনতে বন্যপ্রাণী, সুন্দরবনের ইতিহাস ও পরিবেশ বিষয়ক বইয়ে ডুব দেওয়ার মতো স্নিগ্ধ অভিজ্ঞতা আর দ্বিতীয়টি হতে পারে না।
স্থানীয় উপাদানÑযেমন গোলপাতা, বাঁশ, কাঠ ও সুপারি গাছের কাঠ দিয়ে নির্মিত সুন্দরী ইকো রিসোর্ট প্রকৃতির সঙ্গে একদম মিশে থাকার অনুভূতি দেয়। কংক্রিটের ছোঁয়া এড়িয়ে তৈরি এই কটেজে থাকার অর্থ শুধু বন দেখা নয়; বরং বনের কোলঘেঁষে থাকা সহজ-সরল মানুষগুলোর জীবিকা, ধর্মীয় বিশ্বাস, বনবিবির পুঁথি পাঠ ও সংগ্রামী ঐতিহ্যকে কাছ থেকে জানা। এটি ভ্রমণকে কেবল বিনোদনে সীমাবদ্ধ না রেখে গভীর মানবিক ও অর্থবহ অভিজ্ঞতায় পরিণত করে।
যাওয়া-আসা
গত এক দশকে যোগাযোগ ব্যবস্থার আমূল পরিবর্তনের ফলে সুন্দরবন ভ্রমণ এখন আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে অনেক সহজ ও সাশ্রয়ী। পদ্মা সেতু চালু হওয়ার পর ঢাকা থেকে মাত্র ৪ থেকে ৫ ঘণ্টার সড়কযাত্রায় খুলনা বা মোংলা পৌঁছানো সম্ভব। মোংলা কিংবা জয়মনি ঘোল ঘাট থেকে নির্ধারিত ট্রলার বা স্পিডবোটে মাত্র ৩০ থেকে ৪৫ মিনিটের ব্যবধানে নিরাপদে পৌঁছে যাওয়া যায় এই ইকো রিসোর্টগুলোতে। রিসোর্টগুলোর সমন্বিত ট্যুর প্যাকেজ, অভিজ্ঞ স্থানীয় গাইডের সার্বিক দিকনির্দেশনা এবং নৌ-পরিবহনের আধুনিকায়ন পর্যটকদের যাতায়াতকে করেছে ঝামেলাহীন।
তবে প্রকৃতির মাঝে এই আধুনিকতার স্পর্শের পাশাপাশি কিছু প্রাকৃতিক চ্যালেঞ্জও বহাল রয়েছে। যেমন উপযুক্ত মৌসুম (বিশেষ করে নভেম্বর থেকে মার্চ) ব্যতিরেকে বর্ষার দিনে সফর করলে অতিবৃষ্টি, ঝড় কিংবা নদীর পানি অস্বাভাবিক বৃদ্ধির কারণে নদীযাত্রা বাধাগ্রস্ত হতে পারে। এ ছাড়া সুন্দরবনের গহিন লাগোয়া অঞ্চল হওয়ায় অনেক কটেজেই মোবাইল নেটওয়ার্ক বেশ দুর্বল বা অনুপস্থিত থাকে, যা যোগাযোগের ক্ষেত্রে সাময়িক বিচ্ছিন্নতা তৈরি করে। জাতীয় গ্রিডের বিদ্যুৎ সরবরাহ না থাকায় কটেজগুলোতে সৌরবিদ্যুৎ বা জেনারেটরের ওপর নির্ভর করতে হয়, ফলে শীতাতপ নিয়ন্ত্রণ বা উচ্চ ক্ষমতার বৈদ্যুতিক যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ সীমিত। তবে সুন্দরবনের প্রকৃত নির্যাস পেতে এই সামান্য প্রতিকূলতাকে মানিয়ে নেওয়ার মানসিকতা থাকা প্রয়োজন।
সব মিলিয়ে, ইট-পাথরের যান্ত্রিক জীবনের কোলাহল থেকে দূরে গিয়ে যারা ম্যানগ্রোভের নিবিড় রূপ, ম্যানগ্রোভের বাতাস ও বন্যপ্রাণীর ডাকের মাঝে নিজেদের নতুন করে আবিষ্কার করতে চান, তাদের জন্য সুন্দরবনের এই ইকো কটেজ ব্যবস্থা এক চমৎকার দুয়ার খুলে দিয়েছে। প্রাকৃতিক ভারসাম্য বজায় রেখে এই টেকসই পর্যটন বা ইকো-ট্যুরিজম কেবল পর্যটকদের মনকেই তৃপ্ত করছে না, বরং স্থানীয় বনজীবী মানুষের বিকল্প জীবিকা ও সুন্দরবন সুরক্ষায় এক যুগান্তকারী ভূমিকা রাখছে।
