মূল্যবান অলঙ্কারকে পরিবারের শ্রী ও সমৃদ্ধির প্রতীক মনে করার পাশাপাশি, সোনা-রুপোর মধ্যে স্বয়ং দেবী লক্ষ্মীর প্রত্যক্ষ অধিষ্ঠান দেখেন মানুষ। তাই গয়নার সঙ্গে যুক্ত হয়ে যায় সৌন্দর্য ও রুচির প্রশ্নও। গোঁপ হার, দড়ি হার, হেসো হার, পান হার, চাপকলি, ধুকধুক—এই সবই আজ শুনতে অচেনা লাগলেও, ডায়মন্ড কাটা চিক কিংবা জড়োয়া চিক-এর মতো সে কালের বনেদি পরিবারে কদর ছিল এই সব গলায় পরার গয়নার। হাতে পরার গয়নার নাম হত নকশা অনুসারে— চালদানা, মটরদানা, লবঙ্গকলি, লবঙ্গফুল, নারকেলফুল। এই সব অলঙ্কার যেন ঘরের লক্ষ্মীশ্রীকেই ধরে রাখত রূপকের মায়াজালে।
নিমতলার বিখ্যাত মিত্রবাড়ির বধূ, কিশোরীচাঁদ মিত্রের স্ত্রী কৈলাসবাসিনী দেবীর লেখা গয়নার ফর্দটি সে কালের গয়নার নাম ও নকশার বাইরে নানা খবরের আকর। কোনও আত্মীয়া পরার জন্য গয়না নিয়ে ফেরত দেওয়ার বদলে পঞ্চাশ টাকা পাঠানো, কিংবা রাঁধুনি বামুনের চুড়ি নিয়ে নেওয়ার মতো সোনা হারানোর ঘটনার পাশাপাশি জানা যায় নানা অনুষ্ঠানে নিজের গয়না উপহার হিসেবে ছোটদের দেওয়ার রীতি-রেওয়াজের কথাও। সে ভাবেই শাশুড়ির দেওয়া চল্লিশ ভরির লবঙ্গকলি বাউটি পেয়েছিলেন তিনি। সেই অলঙ্কার আবার হেম স্যাঁকরার কাছে ভাঙিয়ে পাঁচ ভরির তাগা ও পঁচিশ ভরির চুড়ি গড়ানোর কথা উল্লেখ রয়েছে, মূলত উপহার দেওয়ার জন্য। অন্য দিকে গয়না জামিন রেখে টাকা ধার দেওয়ার কথাও পাওয়া যায় সেই কেজো লেখায়— যেখানে অলঙ্কার অবধারিত ভাবে হয়ে ওঠে বাঙালির সংসারের আপদকালের ভরসা।
মূলত স্যাঁকরা বা অলঙ্কার শিল্পী-কারিগরেরা বাড়ি বাড়ি গিয়ে নকশা দেখিয়ে ফরমায়েশ অনুযায়ী গয়না গড়ে দিতেন। পুরুষ-নিয়ন্ত্রিত এই বাজারে ‘বিবিজি’ নামে এক মহিলা গয়না-বিক্রেতার কথা শুনিয়েছেন অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর। কানের দুল, নাকছাবি, মাথার সোনা-রুপোর ফুল— এমন ছোটখাটো গয়না ঠাকুরবাড়ির মহিলারা কিনতেন তাঁর কাছ থেকে। আবার গয়না পরার ক্ষেত্রেও এক সময় ছিল অনন্য এক স্বকীয়তা। কয়লাহাটার রমানাথ ঠাকুরের পুত্রবধূ নগেন্দ্রবালা ছিলেন সম্পর্কে অবনীন্দ্রনাথের দিদিমা। সেই বৃদ্ধা বলেছিলেন, তাঁদের সময়ে সম্ভ্রান্ত ঘরের মহিলারা বাইরে বেরোনোর সময় হাতের অলঙ্কারে মসলিনের পটি বেঁধে রাখতেন— যাতে মসলিনের আবছায়া ভেদ করে অলঙ্কারের কেবল মৃদু ঝিলিকটুকুই দেখা যায়। সোনা বা অলঙ্কারকে প্রকাশ্যে জাহির করা বা উন্মুক্ত রাখা মনে করা হত অশোভন।
সোনার সূত্রে লক্ষ্মীর সম্পর্ক শুধু অলঙ্কারের বাজারে ক্রেতা ও বিক্রেতাদের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকে না। অলঙ্কার তৈরির কারখানা যে সব পাড়ায় বেশি, সেখানকার গলির ধুলো ও নর্দমা পরিষ্কার করাও রীতিমতো আকর্ষণীয় এক ব্যবসা। ধুলোমাটির সঙ্গে মিশে থাকা সোনার গুঁড়ো উদ্ধার করেই রুটিরুজি জোটে, অর্থাৎ ‘লক্ষ্মী লাভ’ হয় আর এক শ্রেণির মানুষের। কোজাগরীর আলোয় কলকাতার স্বর্ণ-সংস্কৃতিকে দেখলে বোঝা যায় যে, সে কেবল বৈভবের গল্প নয়। অন্দরমহলের আভিজাত্য থেকে ধুলোয় মেশা সোনার সন্ধানেই ফুটে ওঠে তিলোত্তমার লক্ষ্মীশ্রী। ছবিতে বৌবাজার অঞ্চলে এক স্বর্ণকারের দৈনন্দিন জীবন।
লোক-দুর্গা
বাংলার লোকায়ত শিল্পচর্চার সমৃদ্ধ পরম্পরায় দুর্গাপ্রতিমাকে কেন্দ্র করে বিকশিত হয়েছে নানা আঙ্গিক। সময়ের ধারায় অনেক প্রাচীন শিল্প আজ হারিয়ে গেছে বা বিলুপ্তির পথে, আবার বহু লোকশিল্প প্রত্যন্তের গণ্ডি পেরিয়ে আন্তর্জাতিক ভাবে আদৃত। দুর্গোৎসবকে কেন্দ্র করে বাংলার লোকশিল্পের নানা অজানা দিকের সন্ধান দিয়েছে ‘টেরাকোটা’ পত্রিকার শারদ সঙ্কলন ‘লোকশিল্পে দুর্গা’। পাঁচমুড়ার পোড়ামাটির দুর্গা, কাঠখোদাই ও হাতির দাঁতের শিল্পে দুর্গা, ডোকরার দুর্গা, পটদুর্গা, লক্ষ্মীসরায় দুর্গা, নকশিকাঁথায় সেলাই করা দুর্গা, শোলা ও ডাকের সাজ, ছৌ নাচের মুখোশে ও শঙ্খশিল্পে দুর্গা নিয়ে লেখালিখি, শুশুনিয়ার প্রাচীন প্রস্তরভাস্কর্য ও বাংলার মন্দিরফলকে দেবীরূপের বিশ্লেষণ রয়েছে। কুমারটুলির চিরন্তন মৃন্ময়ী মাতৃরূপের নির্মাণগাথা, গ্রামবাংলার লোকজীবন থেকে কুড়িয়ে আনা শিল্পচর্চার নানা দিক তুলে ধরা হয়েছে। বাংলার লোকসংস্কৃতি ও প্রতিমাশিল্পের ঐতিহ্যকে নতুন করে চেনার এ-ই সুযোগ। ছবি, প্রচ্ছদ থেকে।
নতুন করে
বাকি ইতিহাস নাটক বাদল সরকার লিখেছিলেন নাইজিরিয়ায়, ১৯৬৫-তে। বহুরূপী নাট্যপত্রে প্রথম প্রকাশ, প্রথম মঞ্চায়নও ‘বহুরূপী’-র; পরে বাদল সরকার ‘শতাব্দী’ নাট্যদলে নব প্রযোজনা করেন থার্ড থিয়েটারের আলোয়। অস্তিত্বের প্রশ্ন এ-নাটকে মূল সুর, ব্যক্তিসত্তার ভাঙন ও জীবনসঙ্কট কী করে সমাজবিচ্ছিন্নতায় ওতপ্রোত, তার এষণা। শৈলীও অভিনব: ফর্ম ও কনটেন্ট মিলেমিশে তুলে ধরে প্রথাসিদ্ধ ইতিহাসের বাইরে ব্যক্তিগত অপ্রকাশিত ইতিহাসকে। নানা ভাষায় অনূদিত ও মঞ্চস্থ এই নাটক নতুন প্রাণ পেয়েছে নাটককারের জন্মশতবর্ষে। অশোক মুখোপাধ্যায়ের সম্পাদনা, সুরঞ্জনা দাশগুপ্তের নির্দেশনা ও অভিনয়ে ২৭ অক্টোবর সন্ধে সাড়ে ৬টায় ‘নির্বাক অভিনয় একাডেমী’-র প্রযোজনা অ্যাকাডেমি মঞ্চে।
শেষ নাহি যে
কলকাতায় রবীন্দ্রসঙ্গীত চর্চার আদি ও প্রধান দুই প্রতিষ্ঠানের একটি গীতবিতান, অপরটি দক্ষিণী। দু’টিরই জন্মলগ্নে শুভ গুহঠাকুরতার উদ্যোগ স্মরণীয়। রবীন্দ্রসঙ্গীত সম্মেলন-সহ নানান ধ্রুপদী অনুষ্ঠানের নিবেদনে গত কয়েক দশকে এবং এখনও দক্ষিণী-র ভূমিকা সুকীর্তিত। দক্ষিণী ভবনের সেবা মিত্র হলে আগামী ৩০ অক্টোবর সন্ধে সাড়ে ৬টায় ওঁদের অনুষ্ঠানের শিরোনাম ‘শেষ নাহি যে’, চিরন্তন রবীন্দ্রসৃষ্টির প্রতি শ্রদ্ধার্ঘ্য। নৃত্য, নাট্য ও অবশ্যই সঙ্গীতময় এই আয়োজনে একেবারে ছোটদের ‘আদ্য’ শ্রেণি থেকে পঞ্চম বর্ষের আপাত-আড়ালে থাকা ছাত্রছাত্রীরাই মুখ্য ভূমিকায়। কলা-সংস্কৃতির ইস্কুলে গুণে দড় ছাত্রদের দিকেই নজর থাকে সকলের। দক্ষিণী তাঁদের বরাবরের নিয়মেই ভেবেছেন অন্য রকম। সেই ব্যতিক্রমী ভাবনার উপচারে সেজে উঠবে সন্ধ্যা।
মাইলফলক
এর আগে ওঁরা বার করেছেন রশোমন, ব্যাটলশিপ পোটেমকিন নিয়ে সংখ্যা। ওঁরা মানে, চিত্রনাট্য পত্রিকা-কর্তৃপক্ষ। নামেই পরিষ্কার, ওঁরা চাইছেন বিশ্বখ্যাত ও ধ্রুপদী ছবিগুলির চিত্রনাট্য সিনেমাপ্রেমীদের সামনে তুলে ধরতে, এবং তা বাংলা অনুবাদে। জরুরি কাজ, সন্দেহ নেই। এই ধারাতেই সম্প্রতি বেরিয়েছে তৃতীয় সংখ্যা (সম্পা: তাপস পাল ও কাজলকুমার মিত্র), দ্য প্যাশন অব জোন অব আর্ক-এর সম্পূর্ণ অনূদিত চিত্রনাট্য ঘিরে। ১৯২৮ সালের, কার্ল থিয়োডোর ড্রেয়ার পরিচালিত এই নির্বাক ছবিটি বিশ্ব চলচ্চিত্রের এক অমূল্য মাইলফলক; বিষয় ও শৈলীর নিরিখে, ভাব ও চিত্রভাষার গভীরতায় উদাহরণীয়। চিত্রনাট্য ছাড়াও, ছবিটি নিয়ে ড্রেয়ারের নিজস্ব এক সন্দর্ভ, মাইকেল জি ম্যাকডানাহ-র একটি গুরুত্বপূর্ণ আলোচনাও পড়া যাবে, অনুবাদে। এমন চর্চা ছড়িয়ে পড়ুক।
সাহিত্য-রাত
ইউরোপের সাহিত্যবৈচিত্র উদ্যাপনে কলকাতায় ইউরোপীয় সাহিত্যের উৎসব, ‘দ্য লং নাইট অব লিটারেচারস’। ইউরোপিয়ান ইউনিয়নের সাংস্কৃতিক সংস্থাগুলির উদ্যোগে উৎসব এ বার চতুর্থ বছরে; আগামী ৩০ অক্টোবর সন্ধে ৬টায়, গ্যেটে-ইনস্টিটিউট/ম্যাক্সমুলার ভবন ও আলিয়ঁস ফ্রঁসেজ়-এ। জার্মানি সুইৎজ়ারল্যান্ড ইউক্রেন ফ্রান্স ব্রিটেন ইটালি পর্তুগাল পোল্যান্ড ও স্লোভেনিয়া— নয়টি দেশের লেখকেরা আসছেন। উৎসবে ধরাবাঁধা মঞ্চ নেই কোনও, দর্শক-শ্রোতারা ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে আলাদা আলাদা ঘরে যাবেন। প্রতি ঘরে এক জন লেখক কুড়ি মিনিট করে পড়বেন নিজের লেখা থেকে, ভাবনার বিনিময় হবে পাঠক-শ্রোতার সঙ্গে। নির্দিষ্ট সময় পর দর্শকেরা যাবেন অন্য লেখকের ঘরে। অন্যতর ভাবনা, আকর্ষণ করে।
জীবন্ত ঐতিহ্য
বাংলা ও ভারতের লোকসংস্কৃতি নিয়ে কাজ করে চলেছে ‘বাংলানাটক ডট কম’ প্রতিষ্ঠানটি; লোকশিল্প যে সংস্কৃতিচর্চার ‘মূলধারা’র বাইরের অস্তিত্ব নয় কোনও, বরং সেটিই আবহমান মূলস্রোত, বোঝাচ্ছে সনিষ্ঠ আয়োজনে। তারই একটি ‘লিভিং হেরিটেজ ফেস্টিভ্যাল’, কোরাপুট আর পালঘর-নাসিকে হয়ে গেল এ মাসের প্রথমার্ধে, অচিরেই হবে ঝাড়খণ্ডে, বাংলার বননবগ্রামে, ওড়িশার ময়ূরভঞ্জে। বইয়ের পাতাতেও ওঁরা ধরে রাখেন লোক-ঐতিহ্য, ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য। সেই ধারাতেই সম্প্রতি প্রকাশিত হল জার্নিজ় থ্রু দ্য লিভিং হেরিটেজ অব পালঘর অ্যান্ড নাসিক বইটি, মহারাষ্ট্র সরকারের পর্যটন দফতরের প্রকল্পের অধীনে, ‘বাংলানাটক ডট কম’ ও ‘কনট্যাক্ট বেস’-এর গ্রন্থনায়। দু’মলাটে এই অপরূপ অঞ্চলটির প্রকৃতি, বন্যপ্রাণ, মানুষ, শিল্প, জীবনের লোকায়ত রূপটি ধরা। এমন কাজ হওয়া দরকার এ বঙ্গেও, এবং বাংলা ভাষায়! ছবিতে মরাঠি লোক-মুখোশ, বই থেকে।
ধান্যলক্ষ্মী
কোজাগরী পূর্ণিমায় প্রতিমার পাশাপাশি বা তার বিকল্প হিসেবে বহু গৃহস্থবাড়িতে পুজো করা হয় ধান ভরা বেতের ছোট চুপড়ি বা ‘আড়ি লক্ষ্মী’। কোথাও আসনে রাখা হয় নতুন ধানের ছড়া বা শিষ। সুন্দর করে বিনুনি বুনে নান্দনিক রূপ দেওয়া হয় সেই ধানের ছড়াকে (ছবি)। লোকসংস্কৃতি ও শাস্ত্রে বর্ণিত অষ্টলক্ষ্মী রূপের অন্যতম ‘ধান্যলক্ষ্মী’। শস্যকে দেবী হিসেবে আরাধনার এই রীতি মূলত জীবনে খাদ্যের গুরুত্বকে স্বীকৃতি দিয়ে শস্যের সুরক্ষার প্রতি সমাজকে সচেতন করে। তার সঙ্গে অপচয় রোধ ও সঠিক পদ্ধতিতে সঞ্চয়ের মাধ্যমে খাদ্যাভাব দূর করারও বার্তা দেয় তা। শহরে কৃষির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত মানুষের সংখ্যা কম, দিন দিন তা আরও কমছে। তবু কৃষিব্যবস্থাভিত্তিক সমাজের এই ঐতিহ্য আমাদের সামাজিক শিকড় ভুলতে দেয় না। আলপনা, আরতি ও অঞ্জলির আচার-অনুষ্ঠান ছাপিয়ে আধুনিক নাগরিককে এমনই সব কথা মনে করিয়ে যায় পালা-পার্বণগুলি।
রূপের বিবর্তন
কলাবৌ কি গণেশের বৌ? সন্ধিপূজার আলাদা গুরুত্ব কেন? ঘট বিসর্জনের পর অপরাজিতা পূজাই বা কী? ঠাকুর দেখা, অঞ্জলি দেওয়া, প্রসাদ নেওয়া আর উৎসবের আনন্দে ভেসে ক’টা দিন কেটে গেল। কিন্তু উদ্যাপনের কেন্দ্রে থাকা নানা আচার, রীতি ও ইতিহাসের খোঁজ নেওয়া? এশিয়াটিক সোসাইটির হেরিটেজ বিল্ডিংয়ে চলছে প্রদর্শনী, ‘দেবী দুর্গা: ফ্রম আর্কাইভস টু ফেস্টিভ্যালস’। দুর্গাপূজার নানা আচার ও রীতির শাস্ত্রীয় কাঠামোর সঙ্গে দর্শকদের পরিচয় করানোর পাশাপাশি, দেশের নানা স্থান থেকে পাওয়া নানা যুগের দেবীপ্রতিমার ছবি ও ব্যাখ্যায় তুলে ধরা হয়েছে দুর্গার রূপের বিবর্তনেরধারা। দেখানো হয়েছে জমিদারবাড়ির ঠাকুরদালানে শুরু হওয়া বাংলার এই দুর্গোৎসবের যাত্রাপথ। নানা বাঁক পেরিয়ে, বারোয়ারি মণ্ডপ ঘুরে আজকের সর্বজনীনতায় থিতু হওয়ার গল্পও কম আকর্ষণীয় নয়। অবারিত এ আয়োজন আগামী ১৩ নভেম্বর পর্যন্ত।
